সর্বজনীন পেনশন
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ জুলাই ২০২৪ ১০:১৯ এএম
আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪ ১০:২৩ এএম
সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিম বাতিলের দাবিতে টানা তিন দিন দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে কর্মবিরতি। শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই কর্মবিরতিতে বন্ধ রয়েছে ক্লাস, পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম। শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করায় অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছেন শিক্ষকরা। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করে তার পদত্যাগ দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা। তারা আবারও জানিয়েছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা আন্দোলন প্রত্যাহার করবেন না।
আন্দোলন দীর্ঘায়িত হলে সেশনজট, শিখন ঘাটতিসহ নানা সংকট তৈরি হতে পারে। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে সরকার অনেকটা নমনীয় হয়েছে। আজ সকালে আন্দোলনকারী শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এতে আন্দোলন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
গত ১ জুলাই থেকে স্বশাসিত, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত, সংবিধিবদ্ধ বা সমজাতীয় সংস্থা এবং তাদের অধীনস্থ অঙ্গপ্রতিষ্ঠানে যোগদানকারীদের প্রত্যয় পেনশন কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক নেতা জানান, শিক্ষকরা দীর্ঘদিন থেকে এই দাবিতে নানা কর্মসূচির পর গত কয়েক দিন ধরে কর্মবিরতিতে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে টানা আন্দোলনে অনড় থাকায় গতকাল বুধবার সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজ বৃহস্পতিবার শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাও বলছেন, এই সংকট সমাধানে তারা আন্তরিক। তারা সরকারের উচ্চ মহলকে বিষয়টি সমাধানের তাগিদ দিচ্ছেন। আজকের আলোচনায় কোনো সমাধান না হলে বা ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত না মিললে এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করতে পারেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদেরকে ওবায়দুল কাদের ডেকেছেন। আমরা শিক্ষক নেতারা তার সঙ্গে আলোচনায় বসব। আমাদের দাবি তুলে ধরব। দাবি মেনে নেওয়া হলে আমরা কর্মবিরতির আন্দোলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করব, কাল থেকেই ক্লাসে ফিরে যাব। অন্যথায় আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে।’
শিক্ষকদের আন্দোলন প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘সর্বজনীন পেনশনের প্রত্যয় স্কিম সরকারের পলিসিগত বিষয়। এটা নিয়ে ইউজিসির করার কিছু নেই। আমরা শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবিগুলো শিক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টাকে জানিয়েছি। এখন সরকারের তরফ থেকে আমাদের বলা হলে, আমরা শিক্ষক ফেডারেশনের সঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেব।’
স্থবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
তৃতীয় দিনও সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে স্থবির ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নেতারা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সর্বাত্মক আন্দোলন চলবে। আর চলমান আন্দোলন নিয়ে মন্তব্যের জেরে অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর পদত্যাগ দাবি করেছে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ’। কর্মসূচি পালনের সময় অর্থমন্ত্রীর নামে নানা স্লোগানও দেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বক্তব্যে পরিষদের নেতারা বলেন, ‘প্রত্যয় স্কিম বাতিল করা না হলে আন্দোলনের মুখে আপনার (অর্থমন্ত্রীর) অবস্থানচ্যুতি ঘটতে পারে।’
ঢাবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, ‘আমরা তিন দফা দাবি জানিয়েছি। প্রত্যয় স্কিম বাতিল করতে হবে, আলাদা বেতন কাঠামো চালু করতে হবে এবং আমাদের জন্য সুপার গ্রেড চালু করতে হবে। দাবিগুলো যদি মেনে নেওয়া না হয় তাহলে আমরা লাগাতার কর্মবিরতি চালিয়ে যাব।’
বাকৃবিতে কুশপুত্তলিকা দাহ, ভর্তি পরীক্ষা বর্জনের হুঁশিয়ারি
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) তৃতীয় শ্রেণি কর্মচারী পরিষদ ও কারিগরি কর্মচারী সমিতি অর্ধদিবস কর্মবিরতি, প্রতিবাদ সভা এবং বিক্ষোভ মিছিল করেছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অর্থমন্ত্রীর নামে স্লোগান দিয়ে কুশপুত্তলিকাদাহ করেন।
এ ছাড়া কর্মবিরতি পালন করেছে বাকৃবি শিক্ষক সমিতি। অন্যদিকে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা ফেডারেশনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করে বাকৃবি অফিসার পরিষদ।
বাকৃবি শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. তানভীর রহমান বলেন, আমাদের দাবি মেনে নেওয়া হলে আগামী ২০ জুলাইয়ের কৃষিগুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। অন্যথায় আমরা ভর্তি পরীক্ষা বর্জন করব।
ইবিতে তিন দিনে চৌদ্দ পরীক্ষা স্থগিত
শিক্ষক-কর্মকর্তাদের কর্মবিরতিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন দিনে বিভিন্ন বিভাগের চৌদ্দটি ষাণ্মাষিক পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এ জে আজাদ লাভলু বলেন, ‘গত তিন দিনে মোট পনেরটি ষাণ্মাষিক পরীক্ষা আয়োজন করার কথা ছিল। কিন্তু আমরা শুধু একটি পরীক্ষা নিতে পেরেছি। বাদবাকি চৌদ্দটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।’
দাবি আদায়ে অনড় চবি শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা
দাবি আদায়ে অনড় অবস্থায় রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) শিক্ষক সমিতি, অফিসার্স সমিতি ও কর্মচারী ইউনিয়ন। গতকালও সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করা হয়েছে।
চবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এই পেনশন স্কিম চালু হলে শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষকতা পেশার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। দাবি মেনে নেওয়া হলে আমরা ক্লাসে ফিরে যাব।’
জাবিতে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ ভবনের নিচে শিক্ষক সমিতির ব্যানারে অবস্থান কর্মসূচি পালনের সময় সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘শিক্ষকদের আন্দোলনকে অর্থমন্ত্রী অযৌক্তিক বলেছেনÑ এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কখনোই অযৌক্তিক আন্দোলন করেনি। কিন্তু যারা সর্বোচ্চ প্রশাসনে রয়েছে, তাদের ভুল বুঝিয়ে আমাদের বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি।’
অচল শেকৃবি
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করছেন শিক্ষক, সব বিভাগের ও দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ত্রিমুখী এই আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সর্বাত্মক কর্মবিরতির কারণে গতকাল বুধবার কোনো ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রশাসনিক ভবনেও উপাচার্যসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ছাড়া বাকিগুলোয় তেমন কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
এ ছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) শিক্ষক সমিতির ডাকে কর্মবিরতি পালন হচ্ছে। এতে ক্লাস, পরীক্ষাসহ দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় স্থবির ছিল ওই তিন বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।