প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৪ ০৯:২৩ এএম
টানা ভারী বর্ষণে খাগড়াছড়িতে বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধস দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শহরের শালবাগ, হরিনাথপাড়া, রসুলপুর ও মেহেদীবাগের বেশকিছুি বাড়িঘর। সম্প্রতি তোলা। প্রবা ফটো
সমুদ্রে লঘুচাপের প্রভাবে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে দেশের পার্বত্য অঞ্চলের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় চলাচলে প্রতিবন্ধকতার কারণে রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ভ্যালিতে আটকা পড়েছেন সাত শতাধিক পর্যটক।
এ ছাড়াও কাপ্তাইয়ে পাহাড়ে বসবাসরতদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করেছে প্রশাসন। এসব জেলার দুর্গত এলাকায় পানিবন্দি মানুষদের সহায়তায় আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে জেলা প্রশাসন।
খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ, পানিবন্দি সহস্রাধিক পরিবার
টানা বৃষ্টিতে সড়কের ওপর পাহাড় ধসে পড়ায় ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে খাগড়াছড়ির যান চলাচল বন্ধ ছিল প্রায় চার ঘণ্টা। স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস মাটি সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে। গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টা নাগাদ এ ঘটনা ঘটে। এ সময় আটকা পড়ে দুই পাশেই গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
স্থানীয়রা জানান, ভোরে সাপাহারা এলাকায় পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে সড়কের ওপর। এ সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
খাগড়াছড়ি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা রাজেশ বড়ুয়া বলেন, স্থানীয় লোকজন, সড়ক বিভাগ এবং আমাদের লোকজন মিলে সড়কের মাটি সরানো হয়।
এদিকে টানা ভারী বর্ষণে খাগড়াছড়িতে বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধস দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গিয়ে সহস্রাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় খোলা হয়েছে ১০০টি আশ্রয়কেন্দ্র। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
পাহাড় ধসে খাগড়াছড়ি শহরের শালবাগান, হরিনাথপাড়া, রসুলপুর ও মেহেদীবাগের বেশ কিছু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো ধরনের হতাহত না হলেও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। অপর দিকে দীঘিনালার কবাখালী ও মেরুং এলাকায় সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় রাঙামাটির সাজেক ও লংগদুর সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। খাগড়াছড়ি শহরে শালবাগানে পাহাড় ধসে কয়েকটি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খাগড়াছড়ি পৌর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং চলছে।
জেলা শহরের মুসলিমপাড়ার একাংশ, মিলনপুর, কল্যাণপুর, মেহেদিবাগ, উত্তর ও দক্ষিণ গঞ্জপাড়া, শান্তিনগর ও বাঙ্গালকাটির একাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। লোকজন বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছে।
খাগড়াছড়ি পৌরসভার মেয়র নির্মলেন্দু চৌধুরী জানান, পৌর এলাকায় ১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত ও পানিবন্দি পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে আসার জন্য মাইকিং চলমান রয়েছে।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক সহিদুজ্জামান বলেন, জেলায় ১০০টি আশ্রয়কেন্দ্ৰ খোলা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধ বসবাসকারীদের বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাজেকে পর্যটক আটক, বাঘাইছড়িতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার মেঘের রাজ্য নামে খ্যাত সাজেক ভ্যালিতে বেড়াতে গিয়ে আটকা পড়েছে সাত শতাধিক পর্যটক। তবে আটকে পড়া পর্যটকদের কাছ থেকে কোনো রুম ভাড়া না নিয়ে শুধু সর্বনিম্ন পানির বিল নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সাজেক কটেজ মালিক সমিতি।
উপজেলা প্রশাসন ও সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সূত্রে জানা যায়, টানা ভারী বৃষ্টিপাতে বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের কাচালং ও গঙ্গারাম নদীর পানি বেড়ে যায়। গত সোমবার রাতে বাঘাইহাট-সাজেক সড়কের মাচালং ব্রিজ, বাঘাইহাট বাজার এলাকা ও দীঘিনালার কবাখালী এলাকায় সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাজেকের সাথে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সাজেকে আটকে পড়ে ছোট-বড় ১২৫ যানবাহনসহ সাত শতাধিক পর্যটক।
সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সহকারী সাধারণ সম্পাদক মতিজয় ত্রিপুরা জানান, বাঘাইহাট মাচালং সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাজেকে আসা প্রায় ৭০০ পর্যটক আটকে পড়েছে। পানি না কমা পর্যন্ত তাদের এখানেই থাকতে হবে। এ সময় আমরা তাদের কাছ থেকে রুম ভাড়া নেব না। শুধু পানির বিলটা নিচ্ছি।
এদিকে বাঘাইছড়ি উপজেলায় কাচালং নদীর পানি বেড়ে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল গ্রাম। পানিবন্দি প্রায় ১০ হাজার মানুষ। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার থেকে বাঘাইছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে শুরু করে। এতে উপজেলার সদর, বারোবিন্দু ঘাট, মাস্টারপাড়া, লাইন্যাঘোনা, উলুছড়ি, এফ ব্লক, পশ্চিম মুসলিম ব্লক, রূপকারী, পুরাতন মারিশ্যাসহ দশটিরও বেশি নিম্নাঞ্চলের গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়াও ভারী বর্ষণে পাহাড়ি ঢলে বিলাইছড়ি রাইংখ্যং নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টি বাড়লে ফারুয়া ইউনিয়নে অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিরীন আক্তার জানান, বাঘাইছড়িতে ভারী বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। প্রায় দশ হাজার মানুষ পানিবন্দি। উপজেলায় ৫৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বাঘাইহাট সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাজেকে পর্যটক আটকা পড়েছে। পানি না কমা পর্যন্ত কেউ ফিরতে পারবে না।
কাপ্তাইয়ে পাহাড়ে আতঙ্ক, নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং
গত কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাতে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় পাহাড় ধসের শঙ্কা নিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে উপজেলার ৫ ইউনিয়নে ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহিউদ্দীন জানান, কাপ্তাই উপজেলায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়ে আসতে প্রচারণা ও মাইকিং করা হচ্ছে। যদি টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকে এবং পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়, তাহলে আমরা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরতদের জোরপূর্বক আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
বান্দরবানে ঘুমধুম ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
টানা বৃষ্টিতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ১২০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘুমধুম ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম কুল, বাজারপাড়া, মাঝেরপাড়া ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের কোনারপাড়া, মাধ্যমপাড়া এলাকার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে প্রায় ১২০ পরিবারের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, টানা বৃষ্টি হলে ঘুমধুম ইউনিয়নের কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে যায়।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ত্রিরতন চাকমা বলেন, ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ওঠার খবর শুনেছি। স্কুলটি নিম্নাঞ্চলে স্থাপিত হওয়ায় টানা বৃষ্টি হলে প্রতিবছর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একেএম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি না কমলে বন্যা দেখা দিতে পারে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ঘুমধুম ইউনিয়নের কিছু এলাকার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।