ফয়সাল খান
প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৪ ০৮:৪২ এএম
আপডেট : ২৯ জুন ২০২৪ ১০:১৮ এএম
ফাইল ছবি
সিসিটিভি ক্যামেরা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কয়েক স্তরের জনবল, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবকিছু মিলে নিরাপত্তার আয়োজন বেশ ভালোই। কিন্তু এতসবের পরও সেই নিরাপত্তারই নেই কোনো নিশ্চয়তা। এটাই হচ্ছে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানুষের সবচেয়ে বেশি ভরসার বাহন ট্রেনের বাস্তব অবস্থা। অনেকদিন ধরেই ট্রেনে যথেষ্ট নিরাপত্তা পাচ্ছে না নারী ও শিশুরা। প্রায়ই ট্রেনের ভেতরে নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু তাতে টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। মামলার পর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার আর সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বরখাস্ত করে দায়মুক্ত হচ্ছে রেলওয়ে। সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশাল জনবল থাকার পরও নারী ও শিশুসহ সবার জন্য ট্রেনযাত্রা নিরাপদ করতে রেলওয়েকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, নিরাপত্তার বিবেচনায় ট্রেন সবার কাছেই ভরসার বাহন। সরকারি বাহন হিসেবে সেখানে বাড়তি নিরাপত্তার প্রত্যাশাও করে সবাই। বাস্তবে সেটা না পাওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। আবার নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবখানেই পরিবারেরও দায়িত্বশীল থাকা দরকার। ট্রেনে যা ঘটছে তার জন্য সার্বিকভাবে সবার মানসিকতা বদলানো ছাড়া সেসব ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়।
উদয়ন এক্সপ্রেসে ধর্ষণের শিকার তরুণী
ভাইয়ের বাসা থেকে বেড়ানো শেষে সিলেট থেকে ফেরার পথে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক তরুণী। রেলওয়ে পুলিশ জানায়, ওই তরুণী সিলেট থেকে উদয়ন এক্সপ্রেসে উঠে খাবারের বগিতে অবস্থান করেন। ওই সময় খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মী তাকে প্রথমে উত্ত্যক্ত এবং পরে ধর্ষণ করেন। ভুক্তভোগীর বাড়ি বান্দরবানে।
এই ঘটনায় ট্রেনের পরিচালক (গার্ড) আবদুর রহিমকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। ট্রেনে খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এসএ করপোরেশনের তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- মো. জামাল (২৯), মো. শরীফ (২২) ও রাশেদুল ইসলাম (২৮)।
পুলিশ জানায়, গত বুধবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ট্রেনটি ওই সময় লাকসাম এলাকা পার হচ্ছিল। ভোরে এই ঘটনা ঘটলেও বিষয়টি জানাজানি হয় সেদিন সন্ধ্যার পর। উদয়ন এক্সপ্রেস সিলেট থেকে মঙ্গলবার রাত ১০টায় চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। চট্টগ্রাম পৌঁছে বুধবার সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে।
রেহাই পায়নি শিশুও
গত এক যুগে রেলস্টেশন, ট্রেন এবং পরিত্যক্ত বগিতে অন্তত ১৪ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নারী-ই নয়, ট্রেনে ধর্ষকদের ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশু-কিশোররাও। চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি ট্রেনে ভুলবশত ট্রেনে উঠে পড়ে এক শিশু। পরে ট্রেনের অ্যাটেনডেন্ট আক্কাস গাজী (৩২) একটি খালি কেবিনে নিয়ে ওই শিশুকে ধর্ষণ করেন। ওই ঘটনায় আক্কাস গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ছাড়া ২০১৯ সালের ১১ জুলাই কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়া যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেনে টয়লেটে গিয়ে এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়।
ধর্ষণের পর ঘটেছে হত্যার ঘটনাও
ট্রেনের ভেতর ধর্ষণের পর ভুক্তভোগীকে হত্যা করার নজিরও আছে। এমনকি ধর্ষণ শেষে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় পরিত্যক্ত বগিতে এক তরুণীকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে ধর্ষণ শেষে এক কিশোরীকে হত্যা করে চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ৮ অক্টোবর রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকায় একটি পরিত্যক্ত ট্রেনের বগির ভেতরে আটকে রেখে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ২০২১ সালের ২৯ জানুয়ারি রাতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চলন্ত সুরমা মেইল ট্রেনে এক প্রতিবন্ধী তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়।
২০২২ সালের ২৮ জুন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাটল ট্রেনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়।
শাস্তির দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির
উদয়ন এক্সপ্রেসে ধর্ষণের ঘটনায় রেলওয়ের যাত্রী নিরাপত্তায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দায়ীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গত ১৫ বছরে রেলে কয়েক লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। নতুন রেলপথ, রেলস্টেশন হচ্ছে, ইঞ্জিন ও কোচ আমদানি করে নতুন রেল চালু হচ্ছে। যাত্রী নিরাপত্তায় রেলপুলিশের (জিআরপি) পাশাপাশি রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) সদস্য বাড়ছে। কিন্তু যাত্রীসেবা ও যাত্রী নিরাপত্তা কোথায় তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যাত্রীদের টাকায় জিআরপি ও আরএনবি নামে দুটি বাহিনী থাকার পরও চলন্ত ট্রেনে এক যাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করে, এসব বাহিনী যাত্রী নিরাপত্তায় কতটুকু দায়িত্বহীন ও উদাসীন।
বিবৃতিতে রেলে যাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী। রেলে কর্মরত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের গায়ে প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো সংবলিত পোশাক পরে দায়িত্ব পালন করা, প্রত্যেক কর্মীর পোশাকের ওপর নেমপ্লেট থাকা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান তিনি।
‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মুসলেম বলেন, নারীবান্ধব পরিবহনের জন্য আমরা অনেকবার বলেছি। নিরাপত্তার ঘাটতি সব জায়গায়। নিরাপত্তা দিয়ে তো আর মেয়েদের চলাফেরার ব্যবস্থা করা যাবে না। এসব ঘটনা রোধে সবার আগে প্রশাসন, রাষ্ট্র, বিচারব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
তিনি বলেন, অতীতের ঘটনাগুলোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটত না। বিচারহীনতার কারণে এসব ঘটনা বারবার ঘটছে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য কঠোর শাস্তির প্রয়োজন।
‘ট্রেনের ভেতর সবাই টাকা কামানোর ধান্দায় ব্যস্ত থাকেন’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘দায়িত্ব পালনে গাফিলতির জন্য কোনো ধরনের জবাবদিহি না থাকায় যাত্রীরা চলন্ত ট্রেনেও নিরাপদ নয়। শুধু ধর্ষণ-ই নয়, বিভিন্ন সময় ট্রেনে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। রাতে কোথাও কোথাও যাত্রীদের ডাকাতিরও ঘটনা ঘটছে। কোথাও কোথাও যাত্রীদের গলা কেটে বা ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে আসছে।’
চলন্ত ট্রেনে যাত্রী নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সবাই মিলেমিশে টিকিটবিহীন যাত্রীদের থেকে টাকা কামানোর ধান্দায় ব্যস্ত থাকেন।
অনিরাপদ ট্রেনযাত্রা
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, দেশজুড়ে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার রেলপথে ৩৭৩টি ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে কিছু লোকাল, মেইল ট্রেন রাতে অন্ধকার অবস্থায় চলে। অর্থাৎ ট্রেনগুলোর অধিকাংশ বগিতে লাইট থাকে না। দরজা-জানালা সর্বদাই খোলা থাকে। এমনকি টয়লেটেও বাতি থাকে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ১০৭টি আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে মাত্র পাঁচটি ট্রেনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। তবে সেগুলোও ঠিকঠাক কাজ করে না। অধিকাংশ ক্যামেরাই বিকল। আবার ক্যামেরা চালু থাকলেও ভিডিও পাওয়া যায় না। এসব সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বয়স মাত্র কয়েক মাস হলো।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
এ প্রসঙ্গে বক্তব্য নিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলীকে বৃহস্পতিবার বিকালে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ট্রেনে নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা খুব বেশি নয়। কোথাও এমন ঘটনা ঘটলে জড়িতদের আমরা গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসি।
তিনি আরও বলেন, ট্রেনযাত্রা নিরাপদ করতে আমরা কাজ করছি। এরপরও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। এগুলো কীভাবে রোধ করা যায়, সে বিষয় নিয়েও কাজ করছি।