বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০২৪ ১০:১৯ এএম
নাফ নদে কোস্টগার্ডের টহল জাহাজ। ছবি : সংগৃহীত
চলমান রোহিঙ্গা সংকটের মধ্যে টেকনাফের সেন্টমার্টিন এলাকায় বাংলাদেশি ট্রলার লক্ষ্য করে গুলি এবং মিয়ানমার নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতিতে দেশের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নে উঠেছে, বেড়েছে উদ্বেগ। ওই এলাকার সীমান্তের নিরাপত্তায় দুদেশের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এখন প্রকট।
সরকারের পক্ষ থেকে শনিবার (১৫ জুন) আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আমরা আক্রমণ করব না, তবে আক্রান্ত হলে ছেড়ে দেব না। আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি আছে।’ অন্যদিকে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করে বলেছেন, ‘সরকারের ব্যর্থতায় আমরা আমাদের দ্বীপে যেতে পারছি না। সেন্টমার্টিন দ্বীপ নিয়ে সৃষ্টি হওয়া সংকটে সরকারের আচরণ দাসসুলভ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।’ আর সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘বহিঃশত্রুর যেকোনো আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা রয়েছে।’
অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেনÑ মিয়ানমারে অস্থিরতার কারণে সেন্টমার্টিন ঘিরে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে বাংলাদেশের করণীয় নির্ধারণের বিষয়টি খুবই জটিল। বিদ্যমান পরিস্থিতি সীমান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি গুরুত্ব হারাতে পারে।
সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ শনিবার দুপুরে শরীয়তপুরের জাজিরায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে শেখ রাসেল সেনানিবাসে একটি ব্রিগেড সিগন্যাল কোম্পানির পতাকা উত্তোলন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আরও বলেন, মিয়ানমার সীমান্তে যে সহিংসতা হচ্ছে, তার জন্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্ট গার্ড আছে। তারা বিষয়টা তদারকি করছে। আমরা সেনাবাহিনীও প্রস্তুত আছি। পরিস্থিতি খারাপ হলে বা অন্যদিকে গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা শান্তিপ্রিয় কারো সাথে ঝগড়া করতে চাই না। কিন্ত কেউ যদি আমাদের সাথে অযথা বিবাদ সৃষ্টি করতে আসে সেক্ষেত্রে আমরা বসে থাকবো না।
টেকনাফের সেন্টমার্টিন উপকূলে মিয়ানমারের যুদ্ধ জাহাজের উপস্থিতিতে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের জলসীমায় মিয়ানমারের যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি ও জাহাজ থেকে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। বাংলাদেশীদের ট্রলার লক্ষ্য করেও ইতিমধ্যে মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। জান্তা বাহিনীর এইসব অশুভ সামরিক তৎপরতা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। মিয়ানমারের ধারাবাহিক উসকানির মুখে সরকারের নির্বিকার আচরণ বিস্ময়কর।
কেন গুলি ও আতঙ্কের ঘটনা ঘটেছে
জানা যায়, প্রায় এক দশক আগে সেন্টমার্টিন দ্বীপ সংলগ্ন স্থানে বঙ্গোপসাগরের মাঝে দুটি স্থানে বালুচর জেগে ওঠে। এই দুটো বালুচরের কারণে ভাটার সময়ে সেন্টমার্টিনে চলাচল করা যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযানগুলো সাগরের ভেতর মিয়ানমারের একটি অংশ ব্যবহার করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) সঙ্গে বাংলাদেশের বিজিবির সমন্বয়ের কারণে এই চলাচলে এর আগে কখনো কোনো বাধা সৃষ্টি হয়নি। তবে সম্প্রতি আরাকান আর্মি মিয়ানমারের এই অঞ্চল দখল করে নেওয়ার কারণে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনগামী ট্রলার ও নৌযানগুলোকে লক্ষ্য করে আরাকান আর্মি গুলি ছুড়ছে।
এছাড়া জানা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ এলাকায় নাফ নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গোলারচর নামক এলাকায় আনুমানিক দুই কিলোমিটার জুড়ে বড় একটি বালুর চর এবং গোলারচর থেকে আনুমানিক ৫-৭ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী স্থানে নাইক্ষ্যংদিয়া নামক স্থানে এক কিলোমিটারের মধ্যে আরো একটি বালুর চর ভাটার সময় জেগে ওঠে। ফলে টেকনাফ দমদমিয়া কেয়ারী জেটিঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রী ও পণ্যবাহী জাহাজ, মাছ ধরার ট্রলার, সার্ভিস বোট এবং স্পিডবোটসহ সব ধরনের নৌযানগুলোকে জেগে ওঠা ওই বালুর চরের কারণে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম বাউন্ডারি লাইনের (আইএমবিএল) মিয়ানমার অংশের নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকা ব্যবহার করতে হয়। এই চর দুটি ড্রেজিং করা হলে ভবিষ্যতে মিয়ানমারের জলসীমা আর ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না।
গত ১৫ দিনে যা ঘটেছে
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, গত ১ জুন বিকাল সাড়ে ৩টায় টেকনাফ পৌরসভার নৌকা ঘাট থেকে ১টি ট্রলার সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে মুদি মালামাল ও ১০ জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায়। আনুমানিক বিকাল সাড়ে ৪টার সময় নাইক্ষ্যদিয়া খাল এলাকা অতিক্রমের সময় আরাকান আর্মি ট্রলারটিকে লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্রের ৬-৭ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং ট্রলারটি বিকাল ৫টা ৫৫ মিনিটে সেন্টমার্টিন দ্বীপে নিরাপদে পৌঁছে।
গত ৫ জুন সেন্টমার্টিনের জিনজিরায় স্থগিতকৃত একটি কেন্দ্রে টেকনাফ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদের ফলাফল নির্ধারণের জন্য ভোট গ্রহণ করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে বিকাল ৫টা ৪৫ মিনিটের দিকে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট শাফকাত আলীর নেতৃত্বে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ মোট ২৭ জন সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফের উদ্দেশে মেটাল শার্ক ও কাঠের বোটযোগে টেকনাফে ফিরছিলেন। পথে নাফ নদী এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নাইক্ষ্যংদিয়া চর এলাকা অতিক্রম করার সময় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের মেগিচং এলাকা থেকে মেটাল শার্ক ও কাঠের বোটকে লক্ষ্য করে আরাকান আর্মি গুলিবর্ষণ করলে মেটাল শার্কে ২ রাউন্ড এবং কাঠের বোর্ডে ৪ রাউন্ড গুলি লাগে। পরে ঐ বোট এবং মেটাল শার্ক দুটি নিরাপদে টেকনাফ কোস্টগার্ডের বোটপুলে ফিরে আসে।
গত ৮ জুন আনুমানিক ১২টার দিকে নাইক্ষ্যংদিয়া খাল সীমান্তে নাফ নদীর মোহনায় দুটি কাঠের ট্রলার টেকনাফ পৌরসভাস্থ কাউকখালী ঘাট থেকে সিমেন্ট, রড ও ছয় জন যাত্রী নিয়ে নৌকাযোগে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যাওয়ার পথে আক্রান্ত হয়। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের মেগিচং ক্যাম্পের ওয়াচ টাওয়ার থেকে আরাকান আর্মি ট্রলার দুটিকে লক্ষ্য করে আনুমানিক ১৫-২০ রাউন্ড গুলি করা হয়। পরে ট্রলার দুটি ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে শাহপরীর দ্বীপ জেটিঘাটে ফিরে আসে। এতে একটি ট্রলারে সাত রাউন্ড গুলি আঘাত হানে। এ ঘটনায়ও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।