ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১২ জুন ২০২৪ ১০:৩৬ এএম
আপডেট : ১২ জুন ২০২৪ ১১:২৭ এএম
বাংলাদেশ সচিবালয়। ছবি : সংগৃহীত
মাঠ প্রশাসনের ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য দুর্গম ভাতা চালু থাকলেও দুর্গম এলাকার জেলাগুলোতে যেতে চান না প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। মাঠ প্রশাসনের ৬৪টি জেলার ডিসি অফিসে প্রশাসন ক্যাডার পদে জনবল কাঠামোর বেশিরভাগই তাই শূন্য থাকছে। ৮ বিভাগের ৬৪ জেলায় ডিসি অফিসের জনবল কাঠামো অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১৭ হাজার ৮৮৯টি। এর মধ্যে ডিসি অফিসের নিয়োগযোগ্য শূন্যপদে ফাঁকা রয়েছে ৪ হাজার ১২৫টি। অন্যদিকে চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রয়েছে ১ হাজার ৩৩৫টি। বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়োগযোগ্য এবং সুপারিশযোগ্য অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১১ হাজার ৭৪৮টি এবং বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়োগযোগ্য এবং সুপারিশযোগ্য শূন্য পদে ফাঁকা রয়েছে ৬ হাজার ৭৫৬টি।
অবস্থানগত কারণে বেশি গুরুত্ববহ ‘বিশেষ ক্যাটাগরি’র অন্তর্ভুক্ত জেলাগুলোতে যেতেই আগ্রহী বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা। দুর্গম জেলার ডিসি অফিসগুলোতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা না থাকায় কোটি কোটি সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার অনেক ডিসি অফিসে এক কর্মকর্তাকে কয়েকটি পদে একাই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে পদ ছাড়াই চলছে বারবার পদোন্নতি। আবার বদলিযোগ্য পদ হওয়ার কারণে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বেশি বদলিও হচ্ছেন।
দেশে ২৫ জেলার ৭২ উপজেলাকে দুর্গম হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে সরকার। দুর্গম জেলা ও উপজেলায় যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন, তাদের জন্য ‘দুর্গম ভাতা’ও চালু করা হয়েছে। এসব দুর্গম ও পাহাড়ি এবং উত্তরাঞ্চলের অনেক জেলায় বদলি করা হলে যেতে চান না প্রশাসনের ক্যাডার কর্মকর্তারা। তারা ঢাকা বিভাগীয় কমিশনের কার্যালয়, পাশের বিভিন্ন জেলাসহ এবং ঢাকা ডিসি অফিসে চাকরি করতে অনেক পছন্দ করেন। তাই অনেক জেলায় ক্যাডার কর্মকর্তা পাচ্ছেন না জেলা প্রশাসকরা। এ কারণে অনেক ডিসি অফিসে জনবল কাঠামো শূন্যই থাকছে।
ঢাকা বিভাগীয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের চাহিদার চেয়ে কর্মকর্তা বেশি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, উপপরিচালকের অধীনে আছে একটি স্থানীয় সরকার বিভাগ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সার্বিক-এর অধীনে আছে সাধারণ শাখা, নেজারত শাখা, আইসিটি শাখা, ট্রেজারি শাখা, সংস্থাপন শাখা, ই-সেবা শাখা। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর অধীনে আছে রাজস্ব শাখা, এলও শাখা, সার্টিফিকেট শাখা, রেভিনিউ মুন্সিখানা শাখা। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে আছে জুডিসিয়াল মুশাখানা শাখা।
অনেক বিভাগীয় কমিশনার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চাহিদা দিয়েও কর্মকর্তা পাচ্ছেন না। মাঠ প্রশাসনের ডিসি অফিসগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রত্যেক দপ্তরের সিটিজেন চার্টার সন্নিবেশিত করা থাকলেও দেশের সাধারণ জনগণ ক্যাডার কর্মকর্তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এছাড়া অনেক জেলায় তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে পারছেন না মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. নাজমুছ সাদাত সেলিম বলেন, ‘মাঠ প্রশাসনে অনেক পদ শূন্য রয়েছে। এগুলো নিয়ে বিভাগীয় কমিশনাররা আমাদের কাছে চিঠি দিয়েছেন। মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগযোগ্য এবং সুপারিশযোগ্য পদগুলোতে নিয়োগ চলমান রয়েছে।’ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য দুর্গম ভাতা চালু করার পরও কেন কর্মকর্তারা দুর্গম জেলায় যেতে চান না?- এমন প্রশ্নের জবাবে এপিডি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার জানা নেই।’
এ বিষয়ে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার জাকি হোসাইন বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে যেখানে বদলি হবে, কর্মকর্তারা সেখানে যেতে বাধ্য। কিন্তু বর্তমানে সে রকম ঘটছে না। এ বিভাগে সরকারি কর্মকর্তারা আসতে চান না। আবার যারা আসেন, তারা যেতে চান না। রংপুর বিভাগের ডিসি অফিসগুলোতে অনেক কর্মকর্তার পদ ফাঁকা রয়েছে। জনবল চেয়ে আমরা জনপ্রশাসনে চিঠি দিয়েছি।’
ভোলা জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুজ্জামান বলেন, ‘আমার জেলা আসলে দুর্গম জেলা। এখানে অনেক কর্মকর্তা আসতে পছন্দ করেন না।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়োগ কার্যক্রম চলমান রয়েছে ১ হাজার ৭৫৩টি। মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগযোগ্য এবং সুপারিশযোগ্য অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১০ হাজার ৭৬৪টি, মন্ত্রণালয়ের নিয়োগযোগ্য এবং সুপারিশযোগ্য শূন্য পদের সংখ্যা ৪ হাজার ২৬৩টি। দেশে ‘দুর্গম জেলা’র তালিকায় রয়েছে মোট ২৫ জেলা। এগুলো হচ্ছে- কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ (অংশবিশেষ), বাগেরহাট, খুলনার (অংশবিশেষ), বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, নেত্রকোণা (অংশবিশেষ), কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, মানিকগঞ্জ (অংশবিশেষ) ফরিদপুর (অংশবিশেষ), সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, চাঁদপুর (অংশবিশেষ), লক্ষ্মীপুর (অংশবিশেষ), নোয়াখালী (অংশবিশেষ), চট্টগ্রাম (অংশবিশেষ), কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা।
দেশের সকল জেলার শ্রেণি হালনাগাদ করেছে সরকার। জেলাগুলোকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছেÑ ‘বিশেষ’, ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’ শ্রেণি। সম্প্রতি হালনাগাদ করা ৬৪ জেলার শ্রেণির পরিপত্র জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আট বা এর বেশি উপজেলা থাকা জেলাকে ‘এ’, পাঁচ থেকে সাতটি উপজেলা থাকা জেলাকে ‘বি’ এবং পাঁচটির কম উপজেলা থাকা জেলাকে ‘সি’ শ্রেণির উপজেলার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অবস্থানগত কারণে বেশি গুরুত্ববহ জেলাকে ‘বিশেষ ক্যাটাগরি’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শ্রেণি অনুযায়ী সরকার বিভিন্ন জেলার সরকারি দপ্তরগুলোতে জনবল নিয়োগ দিয়ে থাকে। জেলাগুলোতে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া এবং ত্রাণ বরাদ্দও করা হয় এই শ্রেণি বা ক্যাটাগরির ওপর ভিত্তি করে। নতুন নতুন উপজেলা সৃষ্টি হওয়ায় কোনো কোনো জেলার ক্যাটাগরি পরিবর্তন হয়েছে। হালনাগাদের পর দেখা গেছে, ‘বিশেষ ক্যাটাগরি’তে রয়েছে ছয়টি জেলা। এছাড়া ‘এ’ এবং ‘বি’ শ্রেণির ২৬টি করে ও ‘সি’ শ্রেণির ছয়টি জেলা রয়েছে।