কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১০ জুন ২০২৪ ০০:২০ এএম
রবিবার বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর ও ‘আমরা নারী’ যৌথভাবে কর্মশালার আয়োজন করে। প্রবা ফটো
দেশের হাওর, বাওড় ও জলাভূমি উন্নয়নে সরকার ২০১২ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত ২০ বছরের একটি মাস্টারপ্ল্যান করেছে। সেটির আলোকে বর্তমান ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ১২ বছরে মাত্র এক শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন হয়েছে।
অন্যদিকে হাওরের উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১২টি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের নিয়ে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি জাতীয় কমিটিও করা আছে। কমিটিকে প্রতি ৩ মাস অন্তর একটি মিটিং করে কাজের অগ্রগতি জানানোর কথা। কিন্তু সেই কমিটি ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাত্র একটি মিটিং করেছে। এতে হাওর, বাওড় ও জলাভূমি উন্নয়নের লক্ষ্যে যে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছিল তা বেশি অগ্রসর হয়নি। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের আলাপচারিতায় এসব তথ্য জানা গেছে।
রবিবার (৯ জুন) সকালে রাজধানীতে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর ও ‘আমরা নারী’ যৌথভাবে ‘১০০ বছরে হাওর ও জলাভূমি’ শীর্ষক কর্মশালার আয়োজন করে।
অধিদপ্তরের নিজস্ব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় এসব কথা জানা যায়। কর্মশালায় অনলাইন, প্রিন্ট ও টেলিভিশনের ৩৫ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন।
সমূদ্র অর্থনীতি ও পরিবেশবিষয়ক রিপোর্টারদের সংগঠন ‘মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক (এমজেএন)’ এই অনুষ্ঠানের সহ-আয়োজক ছিল।
বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আখতারুজ্জামানের সভাপতিত্বে এবং ‘আমরা নারী’ এর ফাউন্ডার এম এম জাহিদুর রহমান বিপ্লবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ‘হাওর সংরক্ষণ ও উন্নয়নে মিডিয়ার ভূমিকা’ নিয়ে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সহ-সভাপতি এহসানুল হক জসীম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মো. আখতারুজ্জামান।
অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) এর পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. এস এম তানভীর হাসান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমদ, সেভ আওয়ার সি- এর মহাসচিব গাজী মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক, বাংলাদেশ পোস্ট পত্রিকার সিটি এডিটর নাসিমা আক্তার সোমা, মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সভাপতি রাশেদ আহমদ ও সাধারণ সম্পাদক কেফায়েত শাকিল।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফারুক আহমদ, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক গাজী মিজানুর রহমান প্রমুখ।
মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের হাওর, বাওড় ও জলাভূমিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে পলি জমা হওয়া। প্রতি বছর শুধু পলি নয় পাথর, বালিকণা ইত্যাদিও জমা হচ্ছে। এক হিসেবে দেখা গেছে, প্রতিবছর এক বিলিয়ন মেট্রিক টন পলি পড়ে। এতে নদী ও জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অথচ এসব স্থানে মাছ চাষ করলে দেশের ৭১ শতাংশ জিডিপি আসতে পারতো মিঠা পানির মাছ রপ্তানি করে। আমরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘ধানের চেয়ে মাছ চাষে তিনগুণ বেশি লাভ। কিন্তু যেহেতু ভাত আমাদের প্রধান খাবার সেজন্য ধান চাষের পাশাপাশি মাছ চাষ ও রক্ষণাবেক্ষণে মনোযোগ দিতে হবে। শুধু মৌলভীবাজারের বাইক্কা বিলে এক কোটি মাছ পালনে ১০ কোটি টাকা ব্যয় করলে তা ২ হাজার কোটি টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। হাওর অঞ্চলে ২ কোটি মানুষ বসবাস। হাওরে ৭ মাস পানি থাকে। তখন মানুষের কাজ থাকে না। এ সময় তাদের মধ্যে অনেকেই মাছ ধরে জীবন নির্বাহ করে থাকে। তাদেরকে বিকল্প পেশায় নিয়ে মাছকে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে হবে।’
হাওর, বাওড় অঞ্চলকে পর্যটনে পরিণত করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশি মুদ্রা আহরণ করা সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ও চীনের মধ্যে বৈরিভাব থাকা সত্ত্বেও বছরে ২০ লাখ আমেরিকান চীনে ভ্রমণ করে। কিন্তু ট্যুরিস্ট পুলিশের তথ্যমতে, গতবছর বাংলাদেশে মাত্র ১৩৮ জন বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছে। আমরা পর্যটনে ভালো উদ্যোগ নিতে পারলে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি দেশের ২৫ শতাংশ বন থাকতে হবে। সেখানে ৮০ দশকে আমাদের বন ছিল ৭ শতাংশ, আর বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়ে ১৭ শতাংশে উন্নীত হয়ছে। হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক বন সৃষ্টি করতে হবে। এতে সেখানে মাছ ও পাখির আশ্রয়স্থলে পরিণত হবে। দেশের ৮০ শতাংশ ৮ মাস সবুজ থাকে। এই সবুজকে পর্যটনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায়।’
চলমান প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘হাওরে বর্তমানে ৩টি প্রকল্প চালু আছে। ৫টি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া চলনবিলে ১৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সমীক্ষা চালাতে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সমীক্ষাটি শেষ হলে চলনবিলের উন্নয়নে কাজ করতে সহজ হবে। তাছাড়া টাঙ্গুয়ার হাওরে বর্জ্যব্যবস্থার জন্য ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।’
গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রসঙ্গ টেনে মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্বের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি বাড়লে যশোর, নোয়াখালী ও বরিশাল অঞ্চল ডুবে যাবে। হাওর ও জলাভূমি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে।’
এহসানুল হক জসিম বলেন, ‘বাংলাদেশের ৭ জেলা ও ভারতের কিছু অংশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও হাওর নেই।’ এটি পৃথিবীর অন্যতম একটি উপাদান। তিনি বলেন, ‘সারা দেশে যে পরিমাণ ধান উৎপাদন হয় হাওরে তার অবদান ১৭ শতাংশ। আর মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে ২০ শতাংশ। দেশে গ্যাসের ৯০ শতাংশই হাওর অঞ্চল থেকে আসছে। অর্থাৎ হাওর বিপুল পরিমাণ সম্পদের আধার। এটিকে ব্যবহারে যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।’
হাওরে চলমান কিছু সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সরকারের অনেক প্রকল্পের কারণে হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এ অঞ্চলের মানুষের শিক্ষার অভাব, খাবার পানির অভাব, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পায় না। মারাত্মক আকারে পূর্ববন্যা হয়। বজ্রপাতে প্রচুর মানুষ মারা যায়। হাওরে ধারাবাহিক বৃষ্টি নেই কিন্তু যখন হয় তা পরিমাণের চেয়ে বেশি হচ্ছে। ওয়াল ওয়েদার রোডের কারণে পানি যেতে পারে না। এতে সমূহ ক্ষতি হচ্ছে। গত ২০২২ সালের বন্যায় ১০০ জনের মতো মানুষ মারা গেছে যা গণমাধ্যমে আসেনি। এসব সমস্যা সম্মিলিতভাবে সমাধান করতে হবে।’
গাজী আনোয়ার বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড পানির উন্নয়ন না করে বরং শুধু বাঁধ দেওয়ার কাজ করছে। তারা নদী ও খালকে ছোট করে ফেলছে। তাছাড়া এখন মানুষ ছাদে মাছ চাষ করে ভূগর্স্থ পানি নষ্ট করছে। এতে মাছের গুণগত মানও নষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশ হাওর ও জলাধারগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করা হলে ছাদে মাছ চাষের কোন প্রয়োজন নেই।’
রাশেদ আহমেদ বলেন, ‘হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের হিসাব করা দরকার। প্রতিটি হাওরে কী কী সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য আছে তা নিয়ে ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।’
নাসিমা আক্তার সোমা বলেন, ‘অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে। জলামভূমিকে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।’