× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাড়ছে পানিতে ডুবে ‍শিশুমৃত্যু, কচ্ছপগতি সরকারি প্রকল্পে

ফারহানা বহ্নি

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০২৪ ১৪:২৩ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

গত বছর পবিত্র ঈদুল আজহার তিন দিন পর পানিতে ডুবে মারা যায় ১৯ মাস বয়সি আবরার হোসেন আয়ান। তার জন্মের পরের বছরই আরও এক সন্তান আসে আয়ানের মায়ের কোলে। সে কারণে বড় শিশুটির দেখাশোনা করতেন তার দাদি। মাত্র ১৫ মিনিট দাদির চোখের আড়ালে ছিল সে। এর মধ্যেই খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, আয়ানের মৃতদেহ পুকুরে ভাসছে। 

আয়ানের চাচি জুঁই ফারজানা শাম্মী বলেন, ‘বাচ্চাটার হাতে কাদা লাগায় পুকুরের পানিতে তার হাত ধুয়ে পরিষ্কার করানো হয়েছিল। ওই সময় হয়তো শিশুটির পুকুরের প্রতি কৌতূহল জন্মেছিল। দুপুরের দিকে হঠাৎই চোখের আড়াল হয়ে যায় সে। দাদি ভেবেছিল মায়ের কাছে আছে, মা ভেবেছিল দাদির কাছে। খুঁজতে খুঁজতে দেখা যায় পুকুরের পানিতে আয়ান ভেসে উঠেছে।’ সেই শোক এক বছরেও ভুলতে পারেননি বাবা গোলাম কিবরিয়া। ছেলের জামা, জুতা সব এখনও আঁকড়ে ধরে কাঁদেন।

চার বছরে পানিতে ডুবে ৩,৬০৭ শিশুর মৃত্যু

গত চার বছরে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে ৪ হাজার ১৬৫ জনের। যার মধ্যে ৩ হাজার ৬০৭ জন অর্থাৎ ৮৮ শতাংশই শিশু। প্রতি বছর এ শিশুমৃত্যুর হার বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। ২০২০ ও ২০২১ সালে ৯ বছর বয়সি শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুহার ছিল যথাক্রমে ৬৫ শতাংশ ও ৭৩ শতাংশ। এ দুই বছরে পানিতে ডুবে যথাক্রমে ৮০৭ এবং ১ হাজার ৩৪৭ জনের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালে এক হাজার ১৩০ জনের মৃত্যু হয়, যার ৮১ শতাংশই ছিল শিশু। ২০২৩ সালে এভাবে মারা যান ৮৮০ জন। যার ৮৭ শতাংশই শিশু। অর্থাৎ গত বছর পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু বেড়েছে ৬ শতাংশ।

ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে লক্ষ্মীপুরে দাদার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় আড়াই বছরের সোলায়মান সাদের। দুই ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর পানিতে ভাসতে দেখা যায় শিশুটির লাশ। প্রথমে টের না পেলেও পরে তিনি বুঝতে পারেন পানিতে আসলে তার ভাতিজা সুলায়মানের দেহ ভাসছে।

প্রতিদিনের বাংলাদেশকে সুলায়মানের চাচা তাজুল ইসলাম জানান, ঘটনার আকস্মিকতায় তিনি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। ছোট্ট সাদকে হারানোর

মৃত্যু রোধে নিতে হবে ১০ ব্যবস্থা : ডব্লিউএইচও

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকে অবহেলাজনিত মৃত্যু বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) শিশুদের ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে ১০টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। যেগুলোর মধ্যে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন, সাঁতার শেখানো ও প্রাথমিক চিকিৎসা উল্লেখযোগ্য। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ (সিআইপিআরবি) দেশের ১০টি উপজেলায় ডুবে গিয়ে মৃত্যু রোধে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, সাঁতার শেখানো ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। এ লক্ষ্যে যেসব কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে সেগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে ‘আঁচল’। সিআইপিআরবি এই কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তার ভিত্তিতেই ডব্লিউএইচও ডুবে মৃত্যু রোধের ১০টি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা চিহ্নিত করেছে।

বরিশাল বিভাগের দুই জেলা পটুয়াখালী ও বরগুনার তিন উপজেলাÑ কলাপাড়া, তালতলী ও বেতাগীতে ২০১৬ সাল থেকে ‘ভাসা’ নামের একটি প্রকল্প পরিচালনা করে আসছে সিআইপিআরবি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে ১-৫ বছর বয়সি শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান ও প্রারম্ভিক বিকাশের, অন্যদিকে ৬-১০ বছর বয়সের শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ভাসা-১ প্রকল্প শেষের পর দেখা গেছে, এই উদ্যোগের ফলে প্রকল্প এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার প্রায় ৫৩ শতাংশ কমেছে। 

সরকারি প্রকল্পে ধীরগতি

ডুবে শিশুমৃত্য রোধে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি অনেক দিনের। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশু-যত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান’ শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পটি ২০২২ সালে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও শুরু হয়নি। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ১৬টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় আট হাজার দিবাযত্ন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। সেখানে দুই লাখ শিশুর যত্ন নেওয়া হবে এবং নির্দিষ্ট বয়সে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তবে এখনও সাঁতার শেখানো বা দিবাযত্ন কেন্দ্র একটিও হয়নি। ২৭১ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির পরিচালনায় রয়েছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি।

প্রকল্প শেষ হওয়ার বাকি আছে আর মাত্র সাত মাস। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের পরিকল্পনায় মোট বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ৮৪ শতাংশ শিশু যত্ন কেন্দ্র পরিচালনায়, বৈদেশিক প্রশিক্ষণে দশমিক ১৮, সেমিনার-কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপে ১ দশমিক ৬২, অফিস ভবন ভাড়ায় দশমিক ৪৩, প্রচার ও বিজ্ঞাপনে দশমিক শূন্য ৪, গবেষণায় ১ দশমিক ৭৯ ও পরামর্শক সেবা ক্রয়ে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ব্যয় ধরা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ৮ হাজার শিশুযত্ন কেন্দ্রের মধ্যে নতুন হবে ৫ হাজার। বাকি ৩ হাজার কেন্দ্র বেসরকারি উন্নয়ন-সহযোগীদের মাধ্যমে আগে থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো প্রকল্পের সঙ্গে একীভূত হওয়ার কথা। কেন্দ্রগুলোতে তিন বছরে ১ থেকে ৫ বছর বয়সি ২ লাখ শিশুকে সেবা প্রদান এবং ৬ থেকে ১০ বছর বয়সি ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। তবে এর মধ্যেও ৩ লাখ শিশুকে সাঁতার শেখানো যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। 

মূলত মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাঁতার শেখার সময়। তবে এখনও কাউকেই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়নি। দুই বছরেরও বেশি সময় পার হলেও মাত্র গ্রাউন্ড ওয়ার্ক শেষ হয়েছে প্রকল্পটির। 

তবে আসন্ন বর্ষাকালের আগেই সাঁতার প্রশিক্ষণ শুরু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রকল্প পরিচালক তরিকুল ইসলাম চৌধুরী। সময় লাগার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘২৭১ কোটি টাকার মধ্যে সাঁতারের জন্য বরাদ্দ আছে ২ শতাংশ। বাকিটা বরাদ্দ শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের জন্য। তড়িঘড়ি কাজ করে শিশুদের ঝুঁকির মুখে ফেলার দরকার নেই। প্রকল্পের গ্রাউন্ড ওয়ার্কে ৮ হাজার সেন্টার নিয়ে কাজ করা হয়েছে। সেটা কীভাবে তৈরি করা দরকার, যারা শেখাবে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ সেন্টারে কী করা হবে তার ম্যানুয়েল তৈরি করা হয়েছে। সবগুলোর গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করতে সময় লাগবে। এ প্রকল্পের জন্য যে সময় দেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট নয়।’ 

তিনি বলেন, ‘এই আট হাজার চাইল্ড কেয়ার সেন্টার পরিচালনা করবে এনজিওরা। বাচ্চাদের এই সময়টায় পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এ সময় তারা বিকাশ কেন্দ্রে থাকবে বলে ডুবে মৃত্যু কমবে। এ ছাড়াও এ প্রকল্পের সাতটা প্যাকেজের জন্য সাতটি এনজিও ঠিক করা হয়েছে। আগামী জুলাই থেকে প্রশিক্ষণ শুরু হবে।’ 

বিশেষজ্ঞ অভিমত : গুরুত্ব দিতে হবে পরিবারকেই

‘এ ক্ষেত্রে পরিবারকেই প্রধান দায়িত্ব পালন করতে হবে। যদি বাচ্চার দেখাশোনা করতে না পারেন তবে কেন শিশুটিকে পৃথিবীতে এনে হুমকির মুখে ফেলবেন?’Ñ বললেন লেখক-গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা।

তিনি বলেন, ‘এটা একটা অবহেলাজনিত মৃত্যু। শুধু মা নয়, শিশুর বাবাকেও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবার সচেতন না হলে সরকারের কিছু করার নেই। প্রতিটি শিশু মায়ের ১০০ গজ দূরত্বের মধ্যে মারা যাচ্ছে। সব বাড়িতেই বড়দের এই বিষয়টা নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের দেশের বাড়িগুলো শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে তৈরি করা হয় না। মা, বাবা, নানি, দাদি সবাইকে মিলেই কাজটা করতে হবে। শুধুমাত্র মায়ের ওপর শিশুর দায়িত্ব দিলেই হবে না।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা