আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস
আমিনুল ইসলাম মিঠু
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৪ ০৯:৩৫ এএম
আপডেট : ০৫ জুন ২০২৪ ১১:২২ এএম
ছবি: সংগৃহীত
একের পর এক ঘূর্ণিঝড়, তীব্র দাবদাহসহ পরিবেশগত নানা বিপর্যয়ে ভুগছে বাংলাদেশ। পরিবেশবিদরা বলছেন, দেশে গাছ কমে আসায় আবহাওয়ার আচরণও বদলেছে। একটি দেশের মোট ভূখণ্ডের কমপক্ষে ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, যা বাংলাদেশে নেই। অথচ গত এক বছরে দেশে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে কাটা পড়েছে সাড়ে ১১ লাখ বড় গাছ।
মঙ্গলবার (৪ জুন) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিভার ও ডেল্টা রিসার্স সেন্টারের (আরডিআরসি) মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটি গত ২০২৩ সালের মার্চ মাস থেকে ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত তথ্য নিয়ে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির ঘোষণা অনুযায়ী ‘করব ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখব মরুময়তা : অর্জন করতে হবে মোদের খরা সহনশীলতা’ প্রতিপাদ্যে এবং ‘জেনারেশন রেস্টোরেশন’ স্লোগানে পালিত হচ্ছে এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পাশাপাশি এবারের জাতীয় বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বৃক্ষ দিয়ে সাজাই দেশ, সমৃদ্ধ করি বাংলাদেশ’।
প্রতিদিন কাটা পড়ছে ২ হাজার ৯০২ গাছ
আরডিআরসির মিডিয়া মনিটরিং প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশের অবনতির ক্ষতিকর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যার মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে গাছ কাটার কারণে আরও বেড়েছে। এই ঘটনা জীববৈচিত্র্য, জলবায়ুর স্থিতিশীলতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। গত এক বছরে বাংলাদেশে ১১ লাখ ৪৬ হাজার ৪৬৫টি গাছ কাটা হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা হয়েছে চট্টগ্রাম জেলাতে। এখানে ৫ লাখ ৬ হাজার ২২২টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এরপরই রয়েছে নীলফামারী, যেখানে কাটা পড়েছে ৪ লাখ ১৫২টি গাছ। সবচেয়ে কম গাছ কাটা হয়েছে রংপুর জেলায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮৮ হাজার ১৯০টি গাছ কাটা হয়েছে; প্রতিদিন কাটা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯০২টি গাছ। নীলফামারীর তিস্তা সেচ প্রকল্প বৃক্ষনিধনে একক বৃহত্তম অবদানকারীÑ এটি বাস্তবায়নের জন্য ৪ লাখ গাছ কাটা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকায় গত এক বছরে মোট ১ হাজার ৮১টি গাছ কাটা হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকায় প্রতি মাসে ৮৩টি করে গাছ এবং প্রতিদিন প্রায় ৩টি করে গাছ কাটা হয় বলে আরডিআরসির গবেষণায় উঠে এসেছে।
বর্ষা মৌসুমে ৮ কোটি ৩৩ লাখ চারা লাগানো হবে
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৪ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রণালয়ের সচিব ফারহিনা আহমেদ জানিয়েছেন, চলতি বর্ষা মৌসুমে সারা দেশে ৮ কোটি ৩৩ লাখ ২৭ হাজার চারা রোপণ করা হবে।
পরিবেশ সচিব বলেছেন, ‘দেশে বন, জীববৈচিত্র্য ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য ব্যাপকহারে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের বৃক্ষাচ্ছাদন মোট ভূমির ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে এবং বনাচ্ছাদনের পরিমাণ ১৪ দশমিক এক শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সরকার বনায়ন ও বন সংরক্ষণ, অবক্ষয়িত বন পুনরুদ্ধার এবং টেকসই বন ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। ২০০৯-২০১০ থেকে ২০২২-২৩ আর্থিক সাল পর্যন্ত মোট ২ লাখ ১৭ হাজার ৪০২ হেক্টর ব্লক এবং ৩০ হাজার ২৫২ সিডলিং কিমি স্ট্রিপ বাগান সৃজন এবং ১১ কোটি ২১ লাখ চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে।’
সচিব ফারহিনা আহমেদ বলেছেন, ‘সারা দেশে বৃক্ষের পরিমাণ ও বন খাতে কার্বনের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য এ বছর জাতীয় বন জরিপ শুরু হয়েছে। দেশের উপকূল, বাঁধ এবং পোল্ডারে বনায়নের মাধ্যমে উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী সৃষ্টি করা হচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮৯ হাজার ৮৫৩ হেক্টর উপকূলীয় বনায়ন সৃষ্টি করা হয়েছে।’
গাছ কাটার পেছনে উন্নয়ন প্রকল্প
আরডিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পরিসংখ্যান বলছে, এক বছরে ১১ লাখ ৫০ হাজার গাছ কাটা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা রিপোর্ট করা পরিসংখ্যানের চেয়ে তিন গুণ বেশি। গাছপালা কাটার জন্য উন্নয়ন প্রকল্প অনেক বেশি দায়ী। যেমন, তিস্তা সেচ প্রকল্প, ইকো-ট্যুরিজম উদ্যোগ এবং নগর অবকাঠামো ইত্যাদির জন্য অনেক গাছ কাটা পড়েছে। নীলফামারীতে তিস্তা সেচ প্রকল্পের জন্য ৪ লাখের মতো গাছ কাটা পড়েছে। রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে পাঁচশর মতো গাছ কাটা হয়েছে সড়কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচশরও বেশি গাছ কাটা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বাড়াতে গিয়ে। চট্টগ্রামের লোহাগড়া এবং মহেশখালীর সংরক্ষিত প্যারাবনে ৭ লাখেরও বেশি গাছ কাটা হয়েছে। এই গাছপালা কাটার জন্য দায়ী বন বিভাগসহ স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, সরকারের অন্যান্য বিভাগ এবং প্রভাবশালী স্থানীয় জনগণ।
তিনি বলেন, ‘প্রতিবেদনে চিহ্নিত হয়েছে, গাছ কাটার জন্য সবচেয়ে দায়ী সংস্থা হলো বন বিভাগ। আবার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (এলজিআই) সম্মিলিত বিবেচনায় বন বিভাগকে অতিক্রম করেছে। বড় গাছ সচেতনভাবে হিসাব করা হয় এবং নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু মাঝারি গুল্ম এবং ছোট গাছপালা তো হিসাবে থাকে না।’
গাছ কাটা রোধে দেশের আইন ও নীতি সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বন সংরক্ষণের জন্য আইনের প্রয়োগ অনেক দুর্বল।
বিশিষ্টজনদের অভিমত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘উন্নয়ন ও মানুষের ব্যবহারের প্রয়োজনে গাছ কাটা যেতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে অবশ্যই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কারণ প্রতিটি গাছের সঙ্গে ইকোসিস্টেম জড়িত। যেখানে ক্ষুদ্র পিঁপড়া থেকে শুরু করে পাখি ও নানা ধরনের পোকামাকড়ের জীবন জড়িত। গাছ কাটার ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো বিবেচনা ছাড়াই বিদেশি গাছ লাগানো হয়েছে। এতে পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে না। গত তিন-চার বছরে সারা দেশে ১০-১৫ প্রজাতির অসংখ্য বিদেশি গাছ লাগানো হয়েছে। এগুলো সঙ্গে এ দেশের প্রজাপতি, পোকামাকড়সহ বিভিন্ন কীটের কোনো যোগাযোগ নেই। এমনকি গরু-ছাগলও এসব গাছ খায় না। ফলে পরিবেশে ভারসাম্যহীনতা দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশীয় প্রজাতির ফলদ ও বনজ গাছ বেশি লাগাতে হবে।’
প্রাণ-প্রকৃতি বিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, ‘বন বিভাগ কিংবা কোনো কর্তৃপক্ষÑ যে-ই হোন না কেন, গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়ার সময় অংশীজনের সঙ্গে কোনো আলোচনাই করা হয় না। আবার যখন গাছ কাটা হয়, তখন মূলত দেশি গাছগুলোই কেটে ফেলা হয়। এতে প্রতিবেশগত বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অন্যদিকে কোথায় কী রকম গাছ লাগানো হবে, তা নিয়েও সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই। গাছ কাটার ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তাও পূরণ হচ্ছে না। এই মুহূর্তে গাছ না কেটে গাছের সুরক্ষা দেওয়াই বেশি প্রয়োজন।’
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, ‘আরডিআরসির গবেষণা প্রতিবেদনটিতে পত্রপত্রিকায় গাছ কাটার যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা উঠে এসেছে। তবে আমি মনে করি আরও বেশি পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে ও হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলা, ঝড়-বাদল এবং তীব্র গরম থেকে বাঁচতে চাইলে কোনো গাছ কাটা যাবে না। পাশাপাশি গাছ লাগাতে হবে আগামী দিনের দুর্যোগের হুমকি মোকাবিলায়। তাই গাছ কাটার জন্য গাছ লাগানো হবেÑ এই বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক।’