বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩১ মে ২০২৪ ১৬:৪২ পিএম
ফাইল ফটো
উপজেলা পরিষদের ষষ্ঠ সাধারণ নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে গত বুধবার ভোট দিয়েছেন ৩৬ দশমিক ১১ শতাংশ ভোটার। এর মধ্যে সবচেয়ে কম ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভোট পড়েছে লক্ষ্মীপুর সদরে। সর্বোচ্চ ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ ভোট পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের (ইসি) জনসংযোগ শাখা থেকে দেওয়া ৮৬টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণে এ তথ্য জানা যায়।
আগের দুই ধাপের তুলনায় এ ধাপে বেশি ভোট পড়বে বলে আশা ছিল নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এ ধাপেই ভোটের হার সবচেয়ে কম। বুধবার ভোটের দিন দুপুরে কমিশনের বিদায়ি সচিব মো. জাহাংগীর আলম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া হিসেবে ৩৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ হার আরও বাড়তে পারে। কারণ এখনও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিকালে ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ ধাপেই সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে। গত ৮ মে প্রথম ধাপের নির্বাচনে ভোট পড়ে ৩৬ দশমিক ১৮ শতাংশ। এরপর গত ২১ মে দ্বিতীয় ধাপে ভোটের হার ৩৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
একটি উপজেলায় সবচেয়ে কম ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ ভোট পড়ার কারণেও তৃতীয় ধাপের নির্বাচন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। আগের দুই ধাপে এত কম ভোট পড়ার নজির নেই। প্রথম ধাপে সবচেয়ে কম ১৭% ভোট পড়ে কুষ্টিয়া সদরে। আর দ্বিতীয় ধাপে সবচেয়ে কম ১৮ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পড়ে পাবনার চাটমোহরে।
ইসি সচিবালয় আগের দুই ধাপে ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদের তথ্য না জানালেও তৃতীয় ধাপে এই দুই পদের তথ্যও জানিয়েছে। এতে দেখা যায়, ৮০ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে গড়ে ৩৬ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ৭৯ উপজেলায় মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে গড়ে ৩৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট পড়েছে।
গত এক দশকের মধ্যে স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে ভোটের হার এবারই সবচেয়ে কম। এর আগে ২০১৯ সালে উপজেলার পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে গড়ে ৪১ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছিল। তার আগে ২০১৪ সালে উপজেলার চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনে ৬১ শতাংশ এবং ২০০৯ সালে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনে ৬৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে।
তৃতীয় ধাপে ১১২ উপজেলায় ভোট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রার্থীর মৃত্যু, মামলা, ধাপ পরিবর্তন ও ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবের কারণে বেশ কয়েকটি উপজেলার ভোট স্থগিত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ভোট হয় ৮৭ উপজেলায়। এ ধাপে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার তিন পদের সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ফলে সেখানে ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এ ছাড়া এই ধাপে চেয়ারম্যান পদে একজন, ভাইস চেয়ারম্যান পদে চারজন এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে সাতজনসহ মোট ১২ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
বেশি ভোটের ১৪ উপজেলা
প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে সর্বোচ্চ ৭৪ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়লেও এবার এত বেশি ভোট কোথাও পড়েনি। প্রথম ধাপে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় ৭৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে খাগড়াছড়ির পানছড়িতে ৭৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ ভোট পড়ে। তৃতীয় ধাপের ১৪টি উপজেলায় ৫০ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ ভোট পড়ে। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ ছাড়া এবার বেশি ভোট পড়েছে এমন উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে রংপুর সদর (৫৭.১৯), হবিগঞ্জের লখাই (৫৬ দশমিক ৩৮), পাবনার আটঘরিয়া (৫৪.৪৫), ফেনী সদর (৫৩.৯৩), রাঙামাটির লংগদু (৫৩.১৩), দিনাজপুরের খানসামা (৫২.৯৪), হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ (৫১.৩৮), কক্সবাজারের টেকনাফ (৫১.১৮), ফেনীর দাগনভূঁঞা (৫১.০৮), কিশোরগঞ্জের তারাইল (৫০.৫৪), খাগড়াছড়ির মহালছড়ি (৫০.৩৬) এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা (৫০.৩৬)।
কম ভোটের ৮ উপজেলা
এ ধাপে ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ থেকে ২৩ দশমিক ০৭ শতাংশ ভোট পড়েছে এমন উপজেলার সংখ্যা ৮টি। ১৩.৬৪ শতাংশ ভোটের লক্ষ্মীপুর সদর ছাড়াও কম ভোটের অন্য ৭ উপজেলা হচ্ছেÑ লালমনিরহাট সদর (১৮.১৪), বগুড়া সদর (২০), দিনাজপুর সদর (২০.০৬), নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ (২২.০৫), নীলফামারী সদর (২৩ দশমিক ০১) ও সাতক্ষীরা সদর (২৩.০৭)।
কেন কম ভোট
নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের অনাস্থার কারণে ভোটাররা ভোট বিমুখ হয়েছে। বিশেষ করে, বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে। সর্বশেষ গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর বড় একটি অংশ বর্জন করে। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি-জামায়াত উপজেলার ভোটও বর্জনের ঘোষণা দেয়। তা ছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়নি। ফলে বেশিরভাগ উপজেলায় আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের লড়াই হয়েছে। এক অর্থে এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নিজেই। এ অবস্থায় সাধারণ ভোটারদের বেশিরভাগকে ভোটকেন্দ্রে টানতে পারেননি প্রার্থীরা।
গত ২১ মে দ্বিতীয় ধাপের ভোট শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল স্বল্প ভোট পড়ার জন্য দেশের একটা বড় রাজনৈতিক দলের ভোট বর্জনকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, সংকট হচ্ছে রাজনৈতিক। রাজনীতি যদি আরও সুষ্ঠু ধারায় প্রবাহিত হয়, আগামীতে হয়তো ভোট স্বল্পতার এ সমস্যা কেটে যাবে।
নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীরের মতে, মোটা দাগে পাঁচ কারণে ভোট কম পড়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈরী আবহাওয়া, ভোটে বিএনপির অংশ না নেওয়া, জনপ্রিয় প্রার্থীর অভাব, ধান কাটার মৌসুম এবং সাধারণ ছুটি থাকায় শ্রমিকদের নিজ এলাকায় চলে যাওয়া। তিনি প্রথম ধাপের ভোট সম্পর্কে এসব কথা বলেছিলেন। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের আগে তিনি বলেন, ভোটার উপস্থিতি নিয়ে কমিশন উদ্বিগ্ন নয়। জাতীয় কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কত শতাংশ ভোট পড়লে তা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে তার কোনো বিধিনিষেধ বা বাঁধাধরা নিয়ম নেই।
এগুলো নিয়ে ইসি ভাবে না। যেকোনো শতাংশ ভোট পড়লেই আমরা খুশি।