× ই-পেপার প্রচ্ছদ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি ফিচার চট্টগ্রাম ভিডিও সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এমপি আনার হত্যা

কসাই জিহাদকে নিয়ে ঘটনাস্থলে ডিবির টিম

আলাউদ্দিন আরিফ

প্রকাশ : ২৮ মে ২০২৪ ০৯:০৪ এএম

আপডেট : ২৮ মে ২০২৪ ০৯:০৪ এএম

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম। ফাইল ফটো

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম। ফাইল ফটো

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত নানা আলামত সংগ্রহে কাজ করছে ঢাকা ও পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ। বহুল আলোচিত এই মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন আকতারুজ্জামান শাহীন ও শিমুল বিশ্বাস ওরফে আমানুল্লাহর বাড়ি ও ফ্ল্যাটে আলামতের সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে। শাহীনের গুলশান ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ফ্ল্যাট থেকে বেশকিছু আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ফ্ল্যাট দুটি ইতোমধ্যে সিলগালা করা হয়েছে। অপরদিকে শাহীনের কোটচাঁদপুরের এলাঙ্গি গ্রামের বাগানবাড়ি থেকেও সিসিটিভি ফুটেজসহ বেশকিছু আলামত জব্দ করা হয়েছে। এসব আলামত ও গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের জবানবন্দি থেকে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ও জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত ও আনারের দেহাবশেষের সন্ধানেও চলছে নানা তৎপরতা।  

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করা ডিবি পুলিশের টিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল নিউটাউনের সঞ্জিবা গার্ডেনের ৫৫ বিইউ ফ্ল্যাটটি পরিদর্শন করেছে। দুই দফায় বাড়িটি পরিদর্শনের পর গতকাল সোমবার আনারের অন্যতম ঘাতক কসাই জিহাদকে সঙ্গে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে গেছে বাংলাদেশের তদন্তকারী দল। তারা প্রায় ৩ ঘণ্টা ধরে জিহাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা শুনেছেন। অপর ঘাতক শিমুলকেও ভিডিও কলে যুক্ত করে তার বর্ণনা শুনেছেন।  এ বিষয়ে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে তদন্ত দলের নেতা ও ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ মোবাইলে বলেন, ‘বৈরী আবহাওয়া এবং তুমুল বৃষ্টির মধ্যে আমাদের তদন্তকাজ করতে হচ্ছে। আমরা তিন দফায় সঞ্জিবা গার্ডেনের ফ্ল্যাটটি পরিদর্শন করেছি। ঘাতক জিহাদকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। সেখানে তার কাছ থেকে বর্ণনা শুনে সেগুলো লিপিবদ্ধ করেছি। ঘটনাস্থলের একটি স্কেচ তৈরি করা হয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিডিও কলে শিমুল ভূঁইয়া ও সেলেস্তি এবং জিহাদকে মুখোমুখি করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা জিহাদকে সঙ্গে নিয়ে যে খালে এমপির লাশের অংশবিশেষ ফেলে দেওয়া হয়েছে, সেই ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেছি। পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গেও আমাদের কথা হয়েছে। তারা আমাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছে, আমরাও তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করছি।’

ডিবিপ্রধান হারুন আরও জানান, কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ঘাতকদের কেউ প্রকৃত নাম-ঠিকানা ব্যবহার করেননি। শিমুল নিজেও আমানুল্লাহ ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। আবার কলকাতায় তিনি পরিচয় দেন জব্বার নামে। এভাবে সেলে নিস্কি ও অন্য ঘাতকরাও ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। মূলত পুলিশকে বিভ্রান্ত করতেই তারা ছদ্মনাম ও ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন।’ 

এদিকে এমপি আনার নিখোঁজের ঘটনায় তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেছেন। মামলাটির তদন্ত করছেন ডিবির সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘শাহীনের গুলশান ও বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে তল্লাশি করে কিছু আলামত ও নথিপত্র জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া আসামিদের মোবাইল ফোনের সিডিআর বিশ্লেষণ, বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও রেজিস্টার দেখে কয়েক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদেরকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে, প্রয়োজন অনুসারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’

রিমান্ডে একেক সময় একেক তথ্য শিমুলের 

খুলনা অঞ্চলের পেশাদার খুনি ও চরমপন্থি নেতা শিমুল এমপি আনার কিলিং মিশন সরাসরি বাস্তবায়ন করেছেন, সেটা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদে শিমুল খুনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে কয়েক ধরনের বর্ণনা দিয়েছেন। এমনকি লাশের খণ্ডিত অংশ যে স্থানে বা খালে ফেলার কথা বলেছেন, তা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। 

জিজ্ঞাসাবাদ-সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, খুনের পরিকল্পনার আলাপ-আলোচনায় শাহীন, শিমুল ও অন্যান্য ঘাতক অ্যাপে কথা বলেছেন। এক্ষেত্রে শিমুল ইন্দোনেশিয়ার একটি ফোন নম্বর ব্যবহার করেছেন। আনারকে খুনের কারণ হিসেবে শিমুল জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, এমপি আনারের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই তার ব্যাপক ক্ষোভ ছিল। শিমুলের বোন লুচি খানমের সঙ্গে তার ফুপাতো ভাই ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর সদরের ডা. মিজানুর রহমান টুটুলের বিয়ে হয়েছিল। পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা) কেন্দ্রীয় নেতা টুটুল ছিলেন শাহীনের চাচাতো ভাই। সেই হিসেবে তারা ছিলেন বেয়াই। ২০০৯ সালের ২৫ জুলাই র‌্যাব ঢাকার উত্তরা থেকে ডা. টুটুলকে আটক করে। ওই বছর ২৭ জুলাই ভোরে নওগাঁয় র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যান বিসিএস ক্যাডার এই চিকিৎসক। টুটুলের আটক হওয়া ও পরে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাওয়ার ঘটনায় এমপি আনারকেই দায়ী করতেন শিমুলসহ এমএল লাল পতাকার নেতাকর্মীরা। তাই আনারের ওপর পুরোনো ক্ষোভ ছিল শিমুলের। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মরিয়া ছিলেন তিনি। জিজ্ঞাসাবাদে শিমুল আরও জানান, আনারের ইন্ধনে ২০০৭-০৮ সাল থেকে বিপুল সংখ্যক এমএল লাল পতাকার নেতাকর্মী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার এবং ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যায়। আনারের কারণে শিমুল নিজেও বহু বছর আত্মগোপনে ছিলেন। পরে গ্রেপ্তারও হন। সবকিছু মিলিয়ে আনারের ওপর শিমুলের ক্ষোভের মাত্রা ছিল ব্যাপক। তাই যখনই আনারকে হত্যার জন্য শাহীন প্রস্তাব দেন তখন শিমুল তাতে হাসিমুখে রাজি হয়ে যান। শাহীনের পরিকল্পনা অনুযায়ী শিমুল নিজে উপস্থিত থেকে কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করেন। কিলিং মিশন বাস্তবায়নের জন্য শাহীনের কাছ থেকে ৫ কোটি টাকার চুক্তি করেন শিমুলসহ অন্য ঘাতকরা। তারা কিলিং মিশন বাস্তবায়নের আগে আড়াই কোটি টাকা নেন। 

এছাড়া রিমান্ডে থাকা শিমুল গ্রেপ্তারের পর ডিবিকে বলেছিলেন, এমপি আনারকে একটি চেয়ারে বসিয়ে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ টুকরা টুকরা করে খালে ফেলে দেওয়া হয়। পরে খুনের আরেক রকম বর্ণনা দেন। বলেন, খুনের উদ্দেশ্যে নয়, আপত্তিকর ছবি তুলে (ব্ল্যাকমেল করে) টাকা আদায়ের লক্ষ্যে আনারকে তারা ফ্ল্যাটে ডেকে নিয়েছিলেন। অতিরিক্ত চেতনানাশক (ক্লোরোফর্ম) প্রয়োগের ফলে আনারের জ্ঞান ফেরেনি। এরপর তাকে বালিশচাপা দিয়ে খুন করা হয়। আবার বলেন, খুনের আগে স্বর্ণ ও হুন্ডির টাকা কোথায় রেখেছেনÑ এ নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান আনার। একপর্যায়ে জিহাদসহ অন্যদের সঙ্গে আনারের ধ্বস্তাধ্বস্তি হয়। পরে তার মুখে চেতনানাশক স্প্রে করা হয়। মরদেহ গুম করতে লাশের খণ্ডিত অংশ বাইরে ফেলা নিয়েও একেকবার একেক রকম তথ্য দেন পেশাদার কিলার শিমুল।

ফয়জুলকে খুঁজছে পুলিশ 

আনার হত্যার আরেক ঘাতক ফয়জুল। কলকাতা সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা ভারতীয় ‘সিম’ ব্যবহার করেছিলেন। ফয়জুল এখনও গ্রেপ্তার না হলেও তার মোবাইলের ‘কল রেকর্ড ডিটেলস’ (সিডিআর) দেখে তার গতিবিধি জানার চেষ্টা চলছে। একটি ক্যাব ভাড়া করে ঘটনার পরে ঘাতকরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছিলেন। ক্যাবটি চিহ্নিত করার কাজ করছেন তদন্তকারীরা। এর আগে লাল ও সাদা রঙের দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। গাড়িগুলোর চালককে জেরা করা হয়েছে। নিউটাউনের যে ফ্ল্যাটে আনার খুন হয়েছেন, তার মালিক এবং কেয়ারটেকারের সঙ্গে কথা বলেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও ঢাকার ডিবি।

প্রসঙ্গত, গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার। এরপর সেখানেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তিনি। ১৮ মে পশ্চিমবঙ্গের বরানগর থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন তার পূর্বপরিচিত বরানগরের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস। ২০ মে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে আনারকে হত্যা করে লাশ টুকরো টুকরো করার তথ্য জানায় ভারতীয় পুলিশ। গ্রেপ্তার হওয়া ঘাতকদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, ১৩ মে দুপুরেই আনারকে হত্যা করা হয়েছে।

আনার হত্যায় জড়িত সন্দেহে ঢাকায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন শিমুল, সেলেস্তি ওরফে সেলে নিস্কি এবং তানভীর ভূইয়া আট দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। সোমবার ছিল রিমান্ডের তৃতীয় দিন। অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া মুম্বাইয়ের কসাই জিহাদ ১২ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়া মোস্তাফিজ ওরফে ফয়জুল নামে আরেকজনকে খুঁজছে পুলিশ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০১৭১২০৩৩৭১৫ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা