সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে অপরাধী চক্র আবারও সশস্ত্র হয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। ফাইল ছবি
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। দেশের বাণিজ্যিক নগরীও বটে। সমগ্র দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম এই নগরীকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। সেখানে ‘চাঁদাসন্ত্রাস’ একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
জানা গেছে, বিভিন্ন অপরাধী চক্র আবারও সশস্ত্র হয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করছে। সোমবার শহরের চকবাজার এলাকার ‘ডিজিটাল ডট নেট’ নামক একটি ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে এবং ৩৫ লাখ টাকা লুটে নেয়। ঘটনার দুই দিন আগে জনৈক ইমন নামের এক সন্ত্রাসী ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার শর্তে দুই কোটি টাকা এককালীন এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা চেয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির মালিকের কাছে। এভাবে প্রকাশ্যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা, ভাঙচুর এবং টাকা লুটের মতো ঘটনা দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ, আইনের শাসন এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এসেছে।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে। হামলার একটি ভিডিও এবং প্রতিষ্ঠানটির মালিকের সঙ্গে ইমনের চাঁদা দাবি-সংক্রান্ত মোবাইল ফোনে কথোপকথন সামাজিক মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ওই এলাকার ইন্টারনেট ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র দল হঠাৎ ডিডিএনের কার্যালয়ে ঢুকে পড়ে। দেশীয় অস্ত্রধারী ওই ব্যক্তিরা অফিসের কম্পিউটার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোবাইল ফোন এবং বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন। একজনকে কুড়াল দিয়ে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জামে আঘাত করতে দেখা যায়। পুলিশের দাবি, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারীরা এ হামলায় জড়িত।
উল্লেখ্য, গত ৯ মে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে চট্টগ্রামের এক সাংবাদিককে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনায়ও হুমকি দাতাদের একজন ইমন। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন ওই সাংবাদিক। এ ছাড়া চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্ত্রাসীরা পুলিশি পাহারায় থাকা স্মার্ট গ্রুপের পরিচালক মুজিবুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ২ জানুয়ারিও একই বাসার জানালার কাচ ও দরজা লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটেছিল।
ব্যবসা হলো অর্থনীতির চালিকাশক্তি। উদ্যোক্তারা নিরাপদ থাকলে কর্মসংস্থান বাড়ে, শিল্পের বিকাশ ঘটে এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পায়। তাই ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর চাঁদাবাজিও দেশে কোনো নতুন সংবাদ নয়। তবে এভাবে যখন সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র প্রকাশ্যে অস্ত্রের মুখে ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা দাবি করাÑ রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। একজন উদ্যোক্তা যখন বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার পরিবর্তে নিজের নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তখন নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়া স্বাভাবিক। চট্টগ্রামের মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা আরও বেশি উদ্বেগজনক।
এমনিতেই দেশে বিনিয়োগে মন্দাভাব চলছে। আমরা মনে করি, দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই নগরীতে যদি ব্যবসায়ীরা নিরাপদ না থাকেন, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে। ব্যবসা পরিচালনার জন্য যেখানে আইনের সুরক্ষা থাকার কথা, সেখানে যদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য কিংবা চাঁদা দেওয়ার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা একটি ভয়াবহ বার্তাই বহন করে। এই ধরনের অপরাধের দ্রুত ও যথাযথ তদন্ত হওয়া জরুরি। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাব যাই থাকুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ, চাঁদাসন্ত্রাসী অর্থাৎ অপরাধীরা যদি বারবার পার পেয়ে যায়, তাহলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক বাড়তে থাকে।
চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক চাঁদাসন্ত্রাসের ঘটনাকে অশনিসংকেত বলাটা অসমীচীন হবে না। এ ধনের অপরাধপ্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে সমাজ একটি সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে। সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও জনজীবনকে নিরাপদ করতে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে অবশ্যই শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত বিচার, কার্যকর নিরাপত্তা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। তাই চাঁদাসন্ত্রাস শক্ত হাতে দমন করতে হবে।