ফাইল ছবি
ক্যালেন্ডার সব ক্ষত মুছে দিতে পারে না। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, ঋতু পাল্টায়, সরকার আসে-যায়, রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়; অথচ কিছু ঘটনা জাতির সম্মিলিত স্মৃতিতে এমনভাবে গেঁথে যায়, যা কোনো দিন-তারিখের ব্যবধানে ফিকে হয় না।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের ঘোষণায় নয়, মানুষের অভিজ্ঞতা, বেদনা এবং স্মৃতির ওপর দাঁড়িয়েই নিজের রায় লিখে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট এমনই একটি সময়, যা নিয়ে আগামী বহু বছর গবেষণা, বিশ্লেষণ ও বিতর্ক চলবে। ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে, বিচারিক প্রক্রিয়াও সময়ের সঙ্গে এগোবে; কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেইÑ সেই সময়ে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন, বহু পরিবার গভীর শোকের মধ্যে পড়েছে এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে?
আমি সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলায় নানা রাজনৈতিক সংকট, সংঘাত ও আন্দোলনের সাক্ষী হয়েছি। সংবাদকর্মীর পেশাগত দায়িত্ব আমাকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গেছে, আবার একজন নাগরিক হিসেবে সেই দৃশ্যগুলো আমাকে ব্যক্তিগতভাবেও নাড়া দিয়েছে। ২০২৪ সালের সেই অস্থির দিনগুলোও তার ব্যতিক্রম ছিল না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের উৎকণ্ঠা, আতঙ্ক, ছুটে চলা অ্যাম্বুলেন্স, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটিÑ এসব দৃশ্য আজও স্মৃতিতে অমলিন। কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, বরং মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্নটাই তখন সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠেছিল। একদিন জরুরি প্রয়োজনে রাজধানীর একটি এলাকা অতিক্রম করার সময় কয়েকজন পথচারী আমাকে সামনে না যেতে অনুরোধ করেছিলেন। তাদের চোখে আতঙ্ক ছিল, কণ্ঠে ছিল উদ্বেগ। কিছু দূরে আহত একজন তরুণকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল। সেই মুহূর্তে আমি উপলব্ধি করেছিলাম, রাজনৈতিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য কখনও নেতারা নয়, সাধারণ মানুষই পরিশোধ করে। একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ, একজন মায়ের সন্তান, একজন শিশুর বাবা বা একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎÑ সংঘাতের সবচেয়ে নির্মম আঘাত এসে পড়ে তাদের জীবনেই।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডার নয়; নাগরিকের আস্থা। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে সংকটের মুহূর্তেও রাষ্ট্র তার পাশে থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত রাখাÑ এসবই রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু যখন কোনো সংকটের পর মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে, যখন তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি দাবি করে, তখন সেই দাবিকে দুর্বলতার প্রকাশ হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখা উচিত।
বিশ্বের ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। রাজনৈতিক সংকটের পর যে সমাজগুলো সত্য উদ্ঘাটন, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের শাসনের পথ বেছে নিয়েছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে যেসব সমাজ অতীতের কঠিন প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেছে, সেখানে ক্ষত আরও গভীর হয়েছে। ন্যায়বিচার কেবল অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার বিষয় নয়; এটি ভুক্তভোগীর আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি নৈতিক ভিত্তি নির্মাণের প্রক্রিয়া।
আজকের তরুণ প্রজন্ম আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচেতন। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে বেড়ে উঠেছে, তথ্য যাচাই করতে শিখেছে এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি প্রত্যাশা করে। তারা উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের সমান প্রয়োগ দেখতে চায়। তাদের কাছে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক এবং কতটা মানবিক।
বাংলাদেশের ইতিহাসও আমাদের এই শিক্ষা দেয়। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে বিভিন্ন জাতীয় সংকটÑ প্রতিটি অধ্যায়ে দেখা গেছে, জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করা যায় না। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে কোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্যের স্থায়ী সমাধান কখনও শক্তি প্রয়োগে আসে না; আসে সংলাপ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং আইনের শাসনের মাধ্যমে।
আমাদের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অতীতকে কেন্দ্র করে বিভাজন সৃষ্টি নয়; বরং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎকে আরও নিরাপদ করা। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়। যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হবে, যেখানে কোনো নাগরিক তার রাজনৈতিক মতের কারণে ভয় পাবে না; এবং যেখানে প্রতিটি প্রাণের মূল্য সমানভাবে বিবেচিত হবে।
সময়কে আমরা প্রায়ই সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক বলি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সময় সব ক্ষত সারিয়ে তোলে না। কিছু ক্ষত ব্যক্তিগত, কিছু ক্ষত পারিবারিক, আর কিছু ক্ষত পুরো জাতির। জাতীয় স্মৃতিতে যে ক্ষত একবার তৈরি হয়, তা কেবল দিন-তারিখ বদলালেই মুছে যায় না। সেই ক্ষত আমাদের সতর্ক করে, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রেরণা দেয়।
আমরা যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ চাই, তাহলে অতীতের কঠিন অধ্যায়গুলোকে অস্বীকার না করে সেগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। যে পরিবার প্রিয়জন হারিয়েছে, যে মানুষ শারীরিক বা মানসিক ক্ষত বহন করছে, কিংবা যে নাগরিক রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকটে ভুগছেÑ তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব। বিচারিক প্রক্রিয়া তার নিজস্ব গতিতে চলবে, ইতিহাসও সময় নিয়ে নিজের মূল্যায়ন করবে; কিন্তু ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কখনও পুরনো হয় না।
অবশেষে, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার অর্থনীতি, অবকাঠামো বা রাজনৈতিক স্লোগানে নয়; তার মানুষের বিশ্বাসে। সেই বিশ্বাস অর্জন করতে হয় সততা, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। কারণ ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানো সহজ, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে ক্ষত তৈরি হয়, তা মুছে ফেলতে লাগে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার নয়, মানুষের স্মৃতিই সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য হয়ে থাকে। আর সেই কারণেই কিছু ক্ষত কখনই ক্যালেন্ডার মুছে দিতে পারে না।
লেখক: জাহিদ ইকবাল (সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন)