মতিলাল দেব রায়
প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা বেড়েছে, প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ-তরুণী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করছেন। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি।
কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা আমাদের সামনে ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে— শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। একটি ডিগ্রি যেন এখন আর কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নয়। ফলে একদিকে পরিবার উচ্চশিক্ষার পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে, অন্যদিকে শিক্ষিত যুবসমাজ দীর্ঘদিন চাকরির অপেক্ষায় থেকে হতাশা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপে ভুগছে। এই বাস্তবতা শুধু ব্যক্তিগত সংকট নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষিত বেকারত্বের অন্যতম কারণ হলো শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও মুখস্থ-নির্ভর জ্ঞান অর্জনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরীক্ষায় ভালো ফল করাই যেন শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। অথচ আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা। অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও নিয়োগদাতারা যে দক্ষতা খোঁজেন, তার অনেকটাই তাদের মধ্যে অনুপস্থিত থাকে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো চাকরির প্রতি একমুখী মানসিকতা। আমাদের সমাজে এখনও সরকারি চাকরিকে সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে দেখা হয়। ফলে হাজার হাজার মেধাবী তরুণ বছরের পর বছর বিসিএস কিংবা অন্যান্য সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এ সময় তারা অন্য খাতের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারেন না। অন্যদিকে বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোকে অনেকেই এখনও দ্বিতীয় সারির বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে শিক্ষিত বেকারত্ব কমানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশে শিল্পায়নের গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়াও একটি বড় কারণ। কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য উৎপাদনশীল শিল্প, প্রযুক্তি-নির্ভর প্রতিষ্ঠান, গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। নতুন নতুন বিনিয়োগ না এলে কিংবা বিদ্যমান শিল্পের সম্প্রসারণ না ঘটলে প্রতিবছর কর্মবাজারে প্রবেশ করা বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণের জন্য পর্যাপ্ত চাকরি সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।
শিক্ষিত বেকারত্বের আরেকটি কারণ হলো দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা এবং আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির মতো খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু আমাদের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও এসব বিষয়ে যুগোপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
তবে সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি, ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা এবং ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো জরুরি। একজন শিক্ষার্থী যেন শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, বাস্তব কর্মক্ষেত্রেও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেন— সেই লক্ষ্যেই শিক্ষাব্যবস্থা সাজাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়নে রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ভাষাগত দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং পেশাগত যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোকে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। একজন স্নাতক যদি নিজের বিষয়ের পাশাপাশি অন্তত একটি আধুনিক দক্ষতায় পারদর্শী হন, তাহলে তার কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে।
তৃতীয়ত, উদ্যোক্তা তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সবাই চাকরি করবেÑ এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অনেক উন্নত দেশে তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নতুন ব্যবসা, স্টার্টআপ কিংবা প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগ শুরু করেন। বাংলাদেশেও তরুণদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হতে পারে। একজন সফল উদ্যোক্তা শুধু নিজের কর্মসংস্থানই তৈরি করেন না; অন্যদের জন্যও চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করেন।
চতুর্থত, বেসরকারি খাতকে আরও কর্মবান্ধব পরিবেশ দিতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসা সহজীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পকারখানা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, সেবা খাত এবং গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
পঞ্চমত, বিদেশের শ্রমবাজারেও দক্ষ জনবল পাঠানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। বর্তমানে বিশ্বে শুধু অদক্ষ শ্রমিক নয়, দক্ষ প্রকৌশলী, নার্স, আইটি বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ এবং বিভিন্ন পেশাজীবীর চাহিদা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের জন্য বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মুক্ত হতে পারে।
শিক্ষিত বেকারত্ব একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হলেও এর সামাজিক ও মানসিক প্রভাবও গভীর। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা একজন তরুণের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়, পরিবারে চাপ সৃষ্টি করে এবং সমাজে হতাশা বাড়ায়। তাই এই সমস্যাকে কেবল চাকরির সংকট হিসেবে দেখলে হবে না; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতির প্রশ্ন।
বাংলাদেশে আগামী দিনে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তি-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাইলে শিক্ষিত যুবসমাজকে বোঝা নয়, সম্পদে পরিণত করতে হবে। ডিগ্রির সঙ্গে দক্ষতা, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থান এবং নীতির সঙ্গে বাস্তবায়নের কার্যকর সমন্বয়ই হতে পারে এই সংকটের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার শিক্ষিত, দক্ষ, কর্মক্ষম ও উদ্ভাবনী মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদকে কাজে লাগাতে পারলেই শিক্ষিত বেকারত্বের অন্ধকার কাটিয়ে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
লেখক: মতিলাল দেব রায় (কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক)