× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আজাদ কাশ্মির: পাকিস্তানের নতুন সংকট

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১৪:৩২ পিএম

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ক্রমাগত এক বহুমুখী ও অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় তীব্র সশস্ত্র অসন্তোষ এবং কেন্দ্রের রাজনৈতিক মেরুকরণের পর পাকিস্তানের জন্য সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে তার তথাকথিত ‘জগদ্দল পাথর’ হিসেবে পরিচিত অঞ্চলÑ পাকিস্তান শাসিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মির থেকে।

দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে যে অঞ্চলটিকে ইসলামাবাদ তাদের আন্তর্জাতিক প্রচারণার মূল ভিত্তি এবং তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে, আজ সেই অঞ্চলের সাধারণ মানুষই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সম্প্রতি আজাদ কাশ্মিরে ছড়িয়ে পড়া নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থান, হরতাল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কেবল একটি আঞ্চলিক অসন্তোষ নয়; বরং এটি ইসলামাবাদের ত্রুটিপূর্ণ কাশ্মিরনীতি এবং ভঙ্গুর রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক চরম বহিঃপ্রকাশ, যা আজ পাকিস্তানকে এক ভয়ঙ্কর পরিণামের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে আজাদ কাশ্মিরকে পাকিস্তান একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে শাসন করে আসছে, যার নিজস্ব রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং আইনসভা রয়েছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ সর্বদা ইসলামাবাদের ‘কাশ্মির  কাউন্সিল’ এবং পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক এস্টাবলিশমেন্টের হাতেই ন্যস্ত ছিল। দুই বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল মূলত আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি, ময়দা ও গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের সংকট এবং নিজেদের উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের বিরুদ্ধে। জম্মু-কাশ্মির  জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (JKJAAC)-এর নেতৃত্বে সাধারণ ব্যবসায়ী, আইনজীবী এবং ছাত্রসমাজ গত বছর থেকেই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন গড়ে তোলে। তবে ২০২৬ সালের জুনে এই অর্থনৈতিক অসন্তোষ এক তীব্র রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়। আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠেয় আজাদ কাশ্মির আইনসভার ৪৫টি আসনের নির্বাচনে পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী জম্মু ও কাশ্মিরের শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখার পুরনো বিধান বাতিলের দাবি তোলে জেকোজেইএএসি। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট অভিযোগ, ইসলামাবাদে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো (যেমন পিএমএল-এন বা পিপিপি) এই ১২টি সংরক্ষিত আসনকে নিজেদের পকেট ভোট হিসেবে ব্যবহার করে কাশ্মিরের স্থানীয় সরকার গঠনে অনৈতিক হস্তক্ষেপ করে থাকে। সাধারণ কাশ্মিরিদের এই ন্যায্য দাবিকে যখন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট এবং স্থানীয় সরকার সাংবিধানিক জটিলতার অজুহাতে প্রত্যাখ্যান করে, তখন ক্ষোভের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।

গত ৭ জুন ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া ‘শাটডাউন ও হুইল-জ্যাম’ ধর্মঘটকে দমন করতে ইসলামাবাদ চিরচেনা ঔপনিবেশিক ও কর্তৃত্ববাদী পথ বেছে নেয়। জেকোজেইএএসিকে একটি ‘সন্ত্রাসবাদী সংগঠন’ হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন (ATA 2014) প্রয়োগ করে সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রধান শওকত নওয়াজ মীরসহ শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুজাফফরাবাদ, রাওলাকোট এবং কোটলি অঞ্চলের সড়কগুলোতে নামানো হয় আধা সামরিক বাহিনী ‘পাকিস্তান রেঞ্জার্স’ এবং ফেডারেল পুলিশ।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা, যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর লাইভ বুলেট ও ছররা গুলি (Pellet Gun) ব্যবহারের ফলে অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে এবং শত শত মানুষ গুরুতর আহত হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্ল্যাকআউট, যা সমগ্র আজাদ কাশ্মিরকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক অবরুদ্ধ কারাগারে পরিণত করেছে। পাকিস্তানের এই নির্মম দমনপীড়ন কাশ্মিরের জনগণের মনে রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের বৈধতাকে চিরতরে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। যে রাষ্ট্র নিজেকে কাশ্মিরের ‘আইনজীবী’ বা রক্ষক দাবি করত, আজ তাদের বুলেটেই কাশ্মিরি যুবকদের রক্ত ঝরছে।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় আদর্শের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘কাশ্মির  কোজ’ (Kashmir Cause) বা কাশ্মিরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে সংহতি প্রকাশ। সাত দশক ধরে পাকিস্তানি পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারতের শাসনাধীন কাশ্মিরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু আজ আজাদ কাশ্মিরের রাওলাকোট বা মিরপুরের রাস্তায় যখন পাকিস্তানি বাহিনী একই ধরনের ছররা গুলি ব্যবহার করছে, তখন ইসলামাবাদের সেই নৈতিক ও রাজনৈতিক বয়ান সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

আজাদ কাশ্মিরের আন্দোলনকারী নেতারা এখন প্রকাশ্যে অভিযোগ করছেন যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এত দিন ধরে কেবল নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে কাশ্মিরি চেতনাকে ব্যবহার করেছে। জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির অন্যতম নেতা সর্দার আমান খান তো একধাপ এগিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীই নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে ছদ্মবেশী যুদ্ধ বা ক্রস বর্ডার টেরোরিজম বজায় রাখতে কাশ্মিরিদের অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং জৈশ-ই-মোহাম্মদের মতো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা দিয়েছে। এই ধরনের প্রকাশ্য বক্তব্য প্রমাণ করে যে, কাশ্মিরের সাধারণ মানুষের ভেতর থেকে পাকিস্তানের প্রতি যে অন্ধ আনুগত্য ছিল, তা আজ ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়েছে।

আজাদ কাশ্মিরের এই গণঅভ্যুত্থান এমন একসময়ে ঘটছে যখন পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড নিজেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান সংকট দৃশ্যমান হয়:

১. বেলুচিস্তানে ‘বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA)’ এবং খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)’ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। এখন আজাদ কাশ্মিরের এই নতুন ফ্রন্ট পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর মনোযোগ ও সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে খণ্ডিত করে ফেলেছে।

২. আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার সাধারণ মানুষের ওপর যে করের বোঝা চাপিয়েছে, তারই প্রতিক্রিয়ায় আজাদ কাশ্মিরে বিদ্যুৎ ও খাদ্যের দাবিতে এই বিদ্রোহের সৃষ্টি। পাকিস্তানের নিজস্ব কোষাগার শূন্য হওয়ায় তারা কাশ্মিরিদের ক্ষোভ প্রশমিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি দিতেও অক্ষম।

৩. শেহবাজ শরিফের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার কার্যত সেনাবাহিনীর একটি পুতুল প্রশাসন হিসেবে কাজ করছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় এই সরকারের কোনো নৈতিক কর্তৃত্ব নেই, যার ফলে তারা রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের চেয়ে শক্তি প্রয়োগকেই একমাত্র পথ মনে করছে।

আজাদ কাশ্মিরের এই অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। কাশ্মিরের বিক্ষোভকারীরা যখন ইসলামাবাদের বৈষম্যের শিকার হয়ে ভারতের দিকে ইঙ্গিত করে বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়, তখন তা দিল্লির জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা এনে দেয়। ভারত দীর্ঘকাল ধরেই পুরো জম্মু ও কাশ্মিরকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে আসছে। আজাদ কাশ্মিরের ভেতরের এই স্বতঃস্ফূর্ত পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন ভারতের সেই দাবিকে বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালো করবে। তবে এই সংকট যদি আরও ঘনীভূত হয় এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী যদি সেখানে জাতিগত নিধনযজ্ঞ শুরু করে, তবে নিয়ন্ত্রণরেখায় দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে পুনরায় সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাস হলো, ১৯৭১ সালে যে পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান বাংলাদেশ) সামরিক শক্তি দিয়ে দাবিয়ে রাখতে গিয়ে পাকিস্তান খণ্ডিত হয়েছিল, ২০২৬ সালের আজাদ কাশ্মিরে তারা ঠিক একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছে। জেকোজেইএএসির নেতারা ইতিমধ্যেই ইসলামাবাদকে চূড়ান্ত আল্টিমেটাম দিয়েছেন এবং দাবি আদায় না হলে ‘চূড়ান্ত ও বৃহত্তর’ আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। যদিও সাময়িকভাবে কিছু সমঝোতার চেষ্টা চলছে, কিন্তু কাশ্মিরিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের যে মৌলিক আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছে, তা বুলেট বা ইন্টারনেট বন্ধ করে আর চেপে রাখা সম্ভব নয়।

পাকিস্তান যদি সত্যিই ভাঙনের এই অতলগহ্বর থেকে বাঁচতে চায়, তবে তাকে অবিলম্বে আজাদ কাশ্মিরের ওপর থেকে সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের অবসান ঘটাতে হবে। কাশ্মিরিদের একটি উপনিবেশের প্রজার মতো না দেখে তাদের প্রকৃত রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন এবং নিজেদের সম্পদের ওপর অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। অন্যথায় বেলুচিস্তানের মরুভূমি থেকে শুরু করে কাশ্মিরের বরফাবৃত পাহাড় পর্যন্ত যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তা পাকিস্তানের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে। আজাদ কাশ্মির আজ পাকিস্তানের জন্য কোনো দূরবর্তী সীমান্ত সমস্যা নয়, এটি রাষ্ট্রটির টিকে থাকার বা ভেঙে পড়ার চূড়ান্ত পরীক্ষা।


লেখক: শাহাব উদ্দিন মাহমুদ (রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা