× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬ ১১:১৩ এএম

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

টানা বর্ষণে যখন নগর-জনপদ ভেসে একাকার, রাজধানী ঢাকাসহ বিস্তীর্ণ জনপদ রূপ নিয়েছে জলাশয়ের, ঠিক তখনই মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো ভয়াবহ নদীভাঙনের খবর এসেছে বগুড়া ও জামালপুর থেকে। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বলা হয়েছে, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে যখন দেশের পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলে পাহাড়ধস আর হঠাৎ বন্যায় ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তখন উত্তরাঞ্চলে যমুনা নদীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙছে বাঁধ। ফলে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতবাড়ি। নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে দিশাহারা সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষরা।

খবরে বলা হয়েছে, বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার যমুনা নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রক্ষার জন্য নির্মিত শহরাবাড়ি স্পারের প্রায় ৪০ মিটার অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রবিবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে খবরে বলা হয়েছে, ২০০২ সালে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আটাচর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ থেকে যমুনা নদীর তীর পর্যন্ত ৭০০ মিটার দীর্ঘ শহরাবাড়ি স্পার নির্মাণ করা হয়েছিল। এর ফলে নদী-তীরবর্তী মানুষরা অনেকটাই নিরাপদে বসবাস করে আসছিলেন। তবে নির্মাণের পর থেকে প্রতিবছরই স্পারটি ভাঙনকবলিত হয়ে পড়ে। রবিবার সকালে স্পারটির ৪০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড তা রক্ষায় উদ্যোগী হয়েছে। তবে প্রায় এক কিলোমিটারব্যাপী ভাঙন দেখা দিলেও তারা ৪০ মিটারের রক্ষার তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অপরদিকে জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার জলসন্ধ্যা, ডাকাতিয়ামেন্দা, মিরকুটিয়াসহ কয়েকটি গ্রাম ইতোমধ্যেই যমুনার ভাঙনের শিকার হয়েছে। এসব এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ফসলি জমি নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে। অব্যাহত নদীভাঙনের ফলে এখন সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতঘর, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, তারা সরেজমিন গিয়ে ভাঙনকবলিত এলাকা দেখেছেন এবং ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

আমাদের দেশের সরকারি তৎপরতার একটি নেতিবাচক ঐতিহ্য হলো, প্রভূত ক্ষতির মুখে না পড়লে কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙে না। ঝড়-বন্যার মতোই নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীভাঙন একটি সাংবৎসরিক সমস্যা। বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের কোথাও না কোথাও এর প্রকোপ দেখা দেয়। আর এ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারায় প্রান্তিক মানুষরা। বসতবাড়ি ও জমিজিরাত হারিয়ে তারা পরিণত হয় আক্ষরিক অর্থেই নিঃস্ব, সহায়-সম্বলহীন মানুষে। একসময় যারা নিজেদের জমিতে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুধু নয়, দেশের খাদ্যচাহিদা পূরণে অবদান রাখত, তারাই নিত্যদিনের খাবারের সন্ধানে ছুটে বেড়ায় এখানে-সেখানে। নদীভাঙনের এই অভিশাপ কত যে নগর-জনপদ নিশ্চিহ্ন করেছে, কত যে স্বাবলম্বী মানুষকে নিঃসম্বল করেছে, তার হিসাব কে রাখে? দশকের পর দশক ধরে এদেশের মানুষ সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখে নদীভাঙন রোধ, বাঁধ নির্মাণ, তার রক্ষণাবেক্ষণের নিমিত্তে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের গল্প শুনে আসছে। নদীর ভাঙনের কবল থেকে শহর কিংবা গ্রাম রক্ষার জন্য বস্তায় বস্তায় বালু-সিমেন্ট, কংক্রিটের ব্লক ফেলা হয়েছে। কিন্তু ফলাফল যেন শুভংকরের ফাঁকি। আজ একটি এলাকা ভাঙনমুক্ত হয় তো কাল আবার নতুন এলাকায় তা শুরু হয়। এ যেন ধারাবাহিক তাণ্ডব। এর বিরাম নেই। 

নদীপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ কঠিন, কিন্তু দুঃসাধ্য নয়। মাঝেমধ্যে ‘নদী শাসন’ কথাটি আমরা শুনতে পাই। বড়সড় কোনো ব্রিজ কিংবা নদী-তীরবর্তী স্থানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণের সময় নদী শাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে কৃত্রিম উপায়ে দিক পরিবর্তন করে বিশেষ স্থানকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে অনেক সময় এতে হিতে বিপরীতও হয়। স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে নদী তার চলার পথে অন্য কোথাও ভাঙনের আগ্রাসন চালায়। এজন্য নদী শাসনের আগে তার গতিপথ সম্বন্ধে ভালো রূপে স্টাডি আবশ্যক বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞগণ। তবে নদী ভাঙন রোধের প্রধান উপায় হলো নিয়মিত পুনঃখনন। এর মাধ্যমে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে ভাঙন অনেকাংশেই হ্রাস পেতে পারে। আগে বড় বড় নদীতে ড্রেজার লাগিয়ে পুনঃখনন করা হলেও হাল আমলে তা আর দেখা যায় না। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড নামে আমাদের একটি সরকারি সংস্থা রয়েছে। কোথাও নদীভাঙন দেখা দিলে সংস্থাটির অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে। অন্য সময় এটি কোন কাজে ব্যাপৃত থাকে বলা মুশকিল। নদীর দেশ বাংলাদেশের নদ-নদীসমূহের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও তা নিয়ন্ত্রণের জন্য বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা গ্রহণই সংস্থাটির মূল কাজ হওয়ার কথা। কিন্তু আমরা কী দেখি? কোথাও ভাঙন দেখা দিলে তারা বালুর বস্তা কিংবা সিমেন্ট ব্লক নিয়ে হাজির হন। যেমনটি হয়েছে বগুড়ার ধুনট ও জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সারা বছর নাকে তেল দিয়ে না ঘুমিয়ে যদি সজাগ থাকতেন, তাহলে কখন কোন বাঁধে ভাঙন দেখা দিতে পারে তা আন্দাজ করতে পারতেন। তাহলে পূর্বাহ্ণেই ব্যবস্থা নিলে নদী-তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা করাল গ্রাসের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পেতে পারত। 

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, নদীভাঙন আমাদের দেশের সাংবৎসরিক দুর্যোগ হলেও কর্তৃপক্ষ যেন এটাকে মৌসুমি সমস্যা হিসেবেই ধরে নিয়েছে। তাই ভাঙনপ্রবণ নদী-তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে রক্ষার স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ আজ অবধি নেওয়া হয়নি। এসব নিয়ে বহু কথা হয়েছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নামের কুম্ভকর্ণের সুখনিদ্রা ভঙ্গ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। হয়তো এভাবে চলতে থাকবে বছরের পর বছর। 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা