× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাজেট: কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাজেট কাঠামো ঘিরে যে অর্থনৈতিক বাস্তবতা সামনে আসছে, তা ক্রমশ একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করছে। একদিকে রাজস্ব আহরণের চাপ, কর ও ভ্যাটের বিস্তৃত জাল; অন্যদিকে কৃষি, উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান নীতিগত দুর্বলতা।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজেট এখন ক্রমেই ‘রাজস্ব সংগ্রহ-নির্ভর প্রশাসনিক দলিল’ হয়ে উঠছে; কিন্তু ‘উৎপাদন ও জনকল্যাণভিত্তিক অর্থনৈতিক কৌশল’ হিসেবে তার ভূমিকা দুর্বল হচ্ছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট রাজস্বের বড় অংশই পরোক্ষ কর-মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), শুল্ক ও অন্যান্য ভোক্তা-নির্ভর কর। এর সরাসরি বোঝা পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন একটি রাষ্ট্র পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তখন মুদ্রাস্ফীতির চাপ স্বাভাবিকভাবেই বহুগুণে বেড়ে যায়। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমশ সংকুচিত করছে। অথচ বাজেট কাঠামোয় জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর কার্যকর ও সুসংগঠিত নীতি অনুপস্থিত।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক মন্দা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্য অস্থির করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বারবার সতর্ক করছেÑ উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি বহু দেশে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপÑ সব মিলিয়ে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। এর ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। কিন্তু বাজেট কাঠামোয় এই বাস্তবতার প্রতিফলন যথেষ্ট শক্তভাবে নেই বলেই সমালোচকদের অভিমত।

কৃষি এখনও দেশের মোট শ্রমশক্তির একটি বড় অংশের জীবিকা হলেও বাজেটে এই খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার নেই বললেই চলে। কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তর আনার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো ‘কৃষক কার্ড’, মৎস্য বীমা স্কিম, বাণিজ্যিক মৎস্য খামারের যান্ত্রিকীকরণ এবং বিভিন্ন ভর্তুকি ও প্রণোদনা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের তুলনায় কৃষি খাতের বরাদ্দ ৫৫৩ কোটি টাকা কমেছে, যদিও সংশোধিত বাজেটের তুলনায় তা ১ হাজার ৩২ কোটি টাকা বেশি।

আগামী অর্থবছরে দেশের ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫ হাজার কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার জন্য ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সার ভর্তুকি অব্যাহত রাখা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ, কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ এবং পচনশীল পণ্যের জন্য কোল্ড স্টোরেজ ও কোল্ড-চেইন অবকাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, কৃষি খাতে ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংকট মোকাবিলা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য যান্ত্রিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। তবে প্রশ্ন হলো, এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছবে এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কতটা দূর করা সম্ভব হবে। সার, ডিজেল ও কিছু সেচ ভর্তুকি থাকলেও তা মূলত ‘চালু ব্যবস্থাপনা রক্ষা’ পর্যায়ে সীমিত। অভিযোগ রয়েছে, এই ভর্তুকির একটি অংশ মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের কারণে প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও কৃষি অর্থায়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, ক্ষুদ্র কৃষকরা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণব্যবস্থার বাইরে থেকে যান। ফলে ‘সাবসিডি আছে, কিন্তু সুবিধা নেই’Ñ এই বাস্তবতা তৈরি হয়। বাজেটে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ ও আধুনিকায়নের কথা বলা হলেও, এর সুফল বিতরণের কাঠামো প্রশ্নবিদ্ধ।

যান্ত্রিকীকরণ যদি শুধুই বড় পুঁজির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে তা কৃষিতে নতুন বৈষম্য সৃষ্টি করে। ট্রাক্টর, হারভেস্টর বা আধুনিক সেচযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ যদি ক্ষুদ্র কৃষকের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে উৎপাদনশীলতা বাড়লেও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি খাত ধীরে ধীরে ‘উৎপাদন-নির্ভর খাত’ থেকে ‘পুঁজি-নির্ভর খাতে’ রূপান্তরিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

রাষ্ট্রীয় খাদ্য মজুদ ব্যবস্থার সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় সীমিত। বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম তিন মাসের খাদ্য মজুদ থাকা প্রয়োজন, কিন্তু বাস্তবে এই সক্ষমতা সময়ভেদে ওঠানামা করে। এই দুর্বলতা দুর্যোগ, আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট বা বাজার অস্থিরতার সময় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাজেটে মজুদ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ঘোষণা থাকলেও তার বাস্তবায়ন কৌশল ও সময়সূচি নিয়ে স্পষ্টতা নেই। প্রতিবছর প্রায় ২০-২২ লাখ নতুন কর্মপ্রত্যাশী শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন সেই অনুপাতে এগোয়নি।

ফলে কৃষিপণ্য কেবল কাঁচামাল হিসেবে রপ্তানি হচ্ছে, কিন্তু দেশেই পর্যাপ্ত মূল্য সংযোজন শিল্প গড়ে উঠছে না। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও সীমিত হচ্ছে। কোল্ড স্টোরেজ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও রপ্তানিমুখী কৃষি ব্যবসায় বিনিয়োগ ঘাটতি স্পষ্ট। জ্বালানি, পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে ব্যয়ের ব্যবধানও বাড়ছে, যা সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করছে। যখন রাজস্ব বাড়ানোর জন্য করের চাপ বাড়ে কিন্তু উৎপাদন ব্যয় কমানোর নীতি দুর্বল থাকে, তখন অর্থনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়েÑ এটাই এখনকার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

বাজেটের মৌলিক প্রশ্ন হওয়া উচিতÑ এটি কি রাজস্ব সংগ্রহের কাঠামো, নাকি জনগণের জীবনমান উন্নয়নের রূপরেখা? বর্তমান প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব আহরণ ও ঋণ পরিশোধের চাপ যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, কৃষি ও উৎপাদন খাতের পুনর্গঠন ততটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। বাংলাদেশ এখন এক জটিল অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেÑ বৈশ্বিক চাপ, অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ-নির্ভর বাজেট কাঠামো একসঙ্গে কাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি ও উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী না করলে কেবল কর বাড়িয়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে যদি কৃষক, শ্রমিক ও উৎপাদনশীল খাত না থাকে, তাহলে বাজেট যতই বড় হোক, তা জনজীবনের সংকট কমাতে ব্যর্থ হবে। আর সেজন্যই এখন প্রয়োজন একটি বাস্তবমুখী নীতিগত পুনর্বিন্যাসÑ যেখানে বাজেট শুধু টাকার অংক নয়, বরং মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার নিশ্চয়তার দিকনির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হবে। 


লেখক: রাসেল আহমদ (সাংবাদিক ও কলাম লেখক)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা