ইমেইল থেকে
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
২০২৬ সালে বাংলাদেশে এইচএসসি, এসএসসি ও সমমানসহ বিভিন্ন শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার ক্রমবর্ধমান হার একটি নীরব সংকটকে নির্দেশ করছে। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার এমন এক গভীরে লুকিয়ে থাকা ফাটল, যা দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধিত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৬.৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। প্রায় সাড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থীর এই আকস্মিক নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিছক কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত দুর্বলতার এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মারাত্মক আর্থিক অনীহা ও অনটনের মুখে পড়েছে। ফলে সন্তানের পড়ার খরচ চালানো অনেক পরিবারের জন্যই অসম্ভব বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের শিক্ষার আলো থেকে দূরে সরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
দারিদ্র্যের এই নিষ্ঠুর প্রভাব শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় তীব্র অনাগ্রহ তৈরি করছে এবং সমাজজুড়ে ব্যাপক বৈষম্য বৃদ্ধি করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দরিদ্রতম পরিবারগুলোর মাত্র ২১ শতাংশ সন্তান তাদের মাধ্যমিক স্তর শেষ করতে সক্ষম হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে এই বিশাল বৈষম্য ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। সুযোগের অভাবে দরিদ্র, মেধাবী শিক্ষার্থীরা সমাজ থেকে ছিটকে পড়ছে, যা চরম মেধা অপচয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আর্থিক অনটনের কারণে প্রান্তিক পরিবারগুলোতে বাল্যশ্রম বৃদ্ধির হারও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অল্প বয়সেই ছেলেরা পড়াশোনা ছেড়ে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ ও সাধারণ কর্মসংস্থানে যোগদান করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ঝরে পড়া ছেলেদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশই পড়াশোনা ছেড়ে সরাসরি শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাত্ক্ষণিক আয়ের এই তাড়না তাদেরকে স্থায়ীভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি। করোনা মহামারির পরবর্তী সময় থেকে সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তীব্র হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঝরে পড়া মেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৭১ শতাংশের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কারণে। মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকে নিবন্ধিত বিপুলসংখ্যক ছাত্রী বিয়ের পর আর পরীক্ষার হলে বসার সুযোগ পাচ্ছে না।
সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ এবং শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূল করতে আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলগুলোতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারগুলোকে বিশেষ অর্থনৈতিক সুবিধা বা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে হবে। কন্যাসন্তানদের শিক্ষাজীবন যেন মাঝপথে থমকে না যায়, সেজন্য রাষ্ট্রকে শতভাগ সুরক্ষার গ্যারান্টি দিতে হবে।
২০২৬ সালের এই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আমাদের জন্য একটি শেষ সতর্কবার্তা। এই নীরব সংকটকে যদি এখনই গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করা না হয়, তবে আমাদের সমগ্র জাতি এক পঙ্গু ও মেধাহীন ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে। সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং সর্বস্তরের নাগরিক সচেতনতাই পারে বাংলাদেশের ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে এনে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
লেখক: ড. মো. আনোয়ার হোসেন (কলাম লেখক)