প্রতীকী ছবি
রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে অভিনব কৌশলে মাদক বিক্রিতে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা, নারীদের ব্যবহার এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়ার ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
মাদক এখন আর নির্দিষ্ট কোনো এলাকার সমস্যা নয়, এটি সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়াবহ সংকটে পরিণত হয়েছে। খোদ্ রাজধানীর কড়াইল বস্তির মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল গ্রহণ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তারা নারী, কিশোর-কিশোরীÑ এমনকি শিশুদেরও ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং সামাজিক বৈষম্যের সুযোগ নিয়ে অপরাধীচক্র তাদের এই কাজে যুক্ত করছে। এতে একদিকে যেমন অপরাধের বিস্তার ঘটছে, অন্যদিকে একটি প্রজন্ম অপরাধের অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাচ্ছে।
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, সন্ধ্যায় অন্ধকার নামতেই কড়াইল বস্তিতে সৃষ্টি হয় অন্য রকম এক জগত। বস্তির প্রবেশমুখ, বউবাজার, লেকপাড়ের মাটির রাস্তা ও ভেতরের কয়েকটি গলিকে কেন্দ্র করে মাদকের একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। চক্রটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের সাংকেতিক নাম ব্যবহার করছে। তাদের ভাষায়, হেরোইনকে ‘কাঁঠাল পাতা’, গাঁজাকে ‘সবজি’ ও ইয়াবাকে ‘পট’ বা ‘গুটি’ বলা হয়। জানা গেছে, বস্তিতে ইয়াবা বিক্রির নির্দিষ্ট কোনো স্পট নেই। বিক্রেতারা পকেটে ইয়াবা নিয়ে ঘোরে এবং ফোনে অর্ডার পেলেই গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়। লেকপাড়ের মাটির রাস্তা ঘিরে অন্তত চারটি হেরোইন বিক্রির স্পটের কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান। প্রথমে ছোটখাটো অপরাধে জড়ালেও পরবর্তীতে এসব গোষ্ঠী মাদক পরিবহন, বিক্রি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। মাদক কারবারিরা তাদের সহজে প্রভাবিত করতে পারে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও ব্যবহার করে। ফলে কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিস্থিতিও কম উদ্বেগজনক নয়। একই দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ভেতরের পাতায় আলাদা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন থানা এলাকার অলিগলিতে প্রকাশ্যেই চলছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের বেচাকেনা। শুধু তাই নয়, মাদক বিক্রেতাদের দাপটে এলাকার সাধারণ মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত। কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। অভিযোগ রয়েছে, খুচরা মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও স্থানীয় পর্যায়ের ‘চিহ্নিত প্রভাবশালী’ মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত খুবই কম। প্রতিবেদন বলছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৫০টিরও বেশি স্পটে ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। এমনকি মাদক কিনতে এসে অনেক যুবকও পরে এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হওয়ায় এখানে মাদকের সরবরাহ ও বিস্তার তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘটে। নগরীর বহু এলাকায় সহজেই মাদক সংগ্রহ করা যায়। এতে শিক্ষার্থী, তরুণ সমাজ এবং শ্রমজীবী মানুষের একটি অংশ নেশার জালে আটকে পড়ছে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকছে না; কর্মক্ষমতা হ্রাস, অপরাধ বৃদ্ধি এবং সামাজিক অস্থিরতার মাধ্যমে পুরো সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এক কথায় মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশ ও তরুণ সমাজকে মুক্ত করতে কঠোর আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা অপরিহার্য। দেশের যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সমন্বিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা মনে করি, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহ চক্র এবং অর্থায়নের পথ চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে অপরাধচক্রের প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা অনেকটাই কমবে। নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।
মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প নেইÑ এটা যেমন সত্য, তেমনি মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন এবং গণমাধ্যমের সমন্বিত দায়িত্ব। সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধÑ এই তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই একটি কার্যকর মাদকবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। আজকের সঠিক ও সমন্বিত পদক্ষেপই পারে আগামী প্রজন্মকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করতে এবং একটি নিরাপদ, সুস্থ ও মানবিক সমাজ গঠনের পথ সুগম করতে। আজ আমাদের শপথ হোক মাদকের থাবামুক্ত সমাজ গড়ার। আর এ ক্ষেত্রে সরকার এবং নাগরিকদের যুথবদ্ধ আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।