ড. মিহির কুমার রায়
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
ড. মিহির কুমার রায়। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী এই জীবনের অন্যতম বড় পরীক্ষা চলমান। উচ্চশিক্ষার এক বিশাল ও উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার হিসেবে এই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এখান থেকে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েই শিক্ষার্থীরা পা রাখবে দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ কিংবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। এটি মূলত উচ্চশিক্ষার একমাত্র প্রবেশদ্বার এবং জ্ঞানার্জনের পরিধিকে এক নতুন বৈশ্বিক মাত্রায় রূপান্তরের অনন্য চাবিকাঠি। এই পরীক্ষাটি প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীর বহু লালিত স্বপ্নপূরণের অন্তহীন যাত্রার এক বাস্তবসম্মত প্রারম্ভিক বিন্দু। বছরের পর বছর ধরে বাবা-মা, শিক্ষক এবং নিজেরা যে স্বপ্নের জাল বুনছে, তা আজ বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ। স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার এই লড়াইয়ে প্রত্যেকেই এক একজন অসমসাহসী অভিযাত্রী।
কিন্তু সময়ের আবর্তে এ ধারণার অনেক রূপান্তর ঘটেছে, যা কাঙ্ক্ষিত নয় । দুই বছর আগেও যারা নতুন স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাধ্যমিকের বৈতরণী পার হয়েছিল, তাদের একটি বিশাল অংশ আজ উচ্চমাধ্যমিকের আঙিনায় অনুপস্থিত। ২০২৪ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৬ লাখ ৮১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জনই চলতি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। অর্থাৎ নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের ৩৬.৪৩ শতাংশ মাঝপথেই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উধাও হয়ে গেছে। এই নীরব মহাপ্রস্থান কেবল কয়েকটি পরীক্ষার খাতার পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের জাতীয় সক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো এক অশনিসংকেত। ঝরে পড়ার নেপথ্যের গল্পটি হলো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের মধ্যবর্তী এই দুই বছর মূলত উচ্চশিক্ষা এবং দক্ষ কর্মজীবনে প্রবেশের প্রধানতম সেতুবন্ধন। এখান থেকেই দেশের তরুণরা চিকিৎসা, প্রকৌশল, কারিগরি শিক্ষা কিংবা উচ্চতর গবেষণার দিকে ধাবিত হয়। এই বুনিয়াদেই যদি লাখো তরুণ হারিয়ে যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে দেশের শ্রমবাজার ও উৎপাদনশীলতায় মারাত্মক শূন্যতা তৈরি হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে যে জনমিতিক সুবিধা বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ ভোগ করছে, তা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা না গেলে অচিরেই বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে বিগত রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক টানাপড়েন এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক শিক্ষার্থী পড়ালেখার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে। কেউ কেউ সক্রিয় রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে আর শ্রেণিকক্ষে ফেরেনি। এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় চব্বিশের অভ্যুত্থানে কিশোর-তরুণদের অংশগ্রহণ ছিল নজিরবিহীন। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকে ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জড়িয়ে পড়ে পড়ালেখা থেকে দূরে সরে গেছে। পাশাপাশি সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের দুর্বল ভিত্তির কারণে অনেকে এই স্তরের কঠিন পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি। অর্থনৈতিক সংকট এই ক্ষতে নুন ঢেলে দিয়েছে। তীব্র মূল্যস্ফীতি ও পারিবারিক আয় কমে যাওয়ার ফলে বহু অভিভাবক সন্তানের পড়ালেখার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়েই অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বোর্ডের পরিসংখ্যানে চরম বিপর্যয় পরিলক্ষিত হয়। সমন্বয় কমিটির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে। যেখানে দেশের শিল্পায়নের জন্য সবচেয়ে বেশি দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন, সেখানেই অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী (৫৪.৫৮%) মাঝপথে পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এই হার ৩৩.০৪% এবং মাদ্রাসায় ৪৪.০৭%। আগে মূলত মেয়েরা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে ঝরে পড়ত।এখন ছেলেরাও উদ্বেগজনক হারে শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কেউ কিশোর অপরাধে জড়াচ্ছে, কেউবা অনিশ্চিত কর্মসংস্থানে। এই অন্ধকার থেকে তরুণদের ফেরাতে পরিবার, শিক্ষক ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, বছরের পর বছর নীরবে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ শিক্ষার্থী। এর প্রভাব কেবল একটি পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষ জনশক্তি গঠন, শিল্পায়ন, উৎপাদনশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গভীর ছাপ ফেলবে। তাই এই সংকটকে আর শুধু শিক্ষা খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতার প্রশ্ন। তারা আরও বলেন, এই মহামারি রুখতে প্রতিটি জেলার তথ্যভিত্তিক সুনির্দিষ্ট গবেষণা ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির আওতা বাড়ানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে রাষ্ট্রকে বড় বিনিয়োগ করতে হবে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হারিয়ে যাবে আগামীর গবেষক, প্রকৌশলী ও চিকিৎসকরা, যা দেশের অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দেবে। কলেজগুলোকে শুধু পরীক্ষাকেন্দ্রিক বানালে চলবে না। শিক্ষার্থীরা কেন ক্লাস থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, তা ট্র্যাক করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম আমাদের নেই। নজরদারি জোরদার করা আবশ্যক।
এখন আসা যাক, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যার পরিণতি আরও ভয়াবহ। উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেইÑ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান সংকট কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার ঘাটতি, নাকি বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুণগত দুর্বলতা? বাস্তবতা হলো, গত কয়েক দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি (বেবসরকারি ১১৮টি ও সরকারি ৫৮টি) পেলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চশিক্ষার কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি খুবই সীমিত। ফলে উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণে আবেগ, প্রতীকী উন্নয়ন বা রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পরিবর্তে জাতীয় প্রয়োজন, বৈশ্বিক পরিবর্তন, শ্রমবাজারের চাহিদা এবং জ্ঞান উৎপাদনের সক্ষমতাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষাপরিকল্পনার ভিত্তি হওয়া উচিত রাষ্ট্রীয় দর্শন, জাতীয় লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশল; রাজনৈতিক বিবেচনা নয়।
উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সৃজনশীলতার বিকাশ, গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করা। এ কারণেই নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কার্যকর, গবেষণামুখী এবং জ্ঞানসৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত করার প্রশ্নটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ, উদ্ভাবন, সামাজিক রূপান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্র। কিন্তু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, শিক্ষক ও গবেষকদের পরিবর্তে কেবল অবকাঠামো ও প্রশাসনিক সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন বাহ্যিক বৃদ্ধি ঘটলেও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অতএব নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হলে সবার আগে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবেÑ বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় কি নতুন বিভাগ খোলা, দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ কিংবা রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে, নাকি তার প্রাণশক্তি নিহিত থাকে একাডেমিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত পরিবেশ, উচ্চমানের শিক্ষক এবং শক্তিশালী গবেষণা সংস্কৃতির মধ্যে?
বাংলাদেশ এখন এই চক্রের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেছে, যার থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তার মধ্যে উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংকট, যা চলতে থাকলে অনেক বেসরকারি কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পাবে না, যা আর একটি বিপর্যয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘আপনাকে এই জয়াভিযানে সার্থক করাই মনুষ্যত্ব’। আর ছাত্রদের এই সার্থকতা প্রকাশের প্রথম বড় ক্ষেত্র হলো এই পরীক্ষা। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে বড় প্রতিভার পরিচয় হলো সীমাহীন ধৈর্যশীলতা।’ এই ধৈর্যই ছাত্রদের লক্ষ্যে পৌঁছাবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক ও অর্থনীতিবিদ