× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলাদেশের এগিয়ে যাবার পথ

আলতাফ হোসেন উজ্জ্বল

প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে

শিক্ষা হবে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, আর রাজনীতি হবে জনকল্যাণ, নৈতিকতা ও দূরদর্শিতার প্রতীক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

শিক্ষা হবে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, আর রাজনীতি হবে জনকল্যাণ, নৈতিকতা ও দূরদর্শিতার প্রতীক। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

একটি জাতির ভাগ্য কেবল তাদের রাষ্ট্রীয় ভৌগোলিক সীমানা, প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। ইতিহাসের প্রতিটি সফল রাষ্ট্র প্রমাণ করেছেÑ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তাদের জনগণের জ্ঞান, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রজ্ঞায়। আর এই চারটি শক্তির ভিত্তি গড়ে ওঠে শিক্ষা ও রাজনীতির সুসমন্বয়ে। শিক্ষা জাতির আত্মাকে আলোকিত করে, রাজনীতি সেই আলোর সঠিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। যখন এই দুই শক্তি একই আদর্শে পরিচালিত হয়, তখনই একটি রাষ্ট্র সভ্যতার অগ্রভাগে পৌঁছে যায়।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল সংযোগ, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে টেকসই উন্নয়নের মূল প্রতিযোগিতা আর কেবল অর্থনীতিতে নয়; বরং জ্ঞান, গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে। যে রাষ্ট্র জ্ঞান উৎপাদন করবে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বও তার হাতেই থাকবে।

বাংলাদেশের জন্মই শিক্ষা ও রাজনীতির এক ঐতিহাসিক সম্মিলনের ফসল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধÑ প্রতিটি অধ্যায়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন জাতীয় চেতনার অগ্রভাগে। ভাষার অধিকার থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাÑ সব ক্ষেত্রেই শিক্ষিত সমাজ নেতৃত্ব দিয়েছে। এ ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, শিক্ষাঙ্গন কেবল পাঠদান নয়; জাতির বিবেক গঠনেরও কেন্দ্র।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি বৃদ্ধি, নারী শিক্ষার প্রসার, ডিজিটাল শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং উচ্চশিক্ষার বিস্তৃতি জাতীয় উন্নয়নের ইতিবাচক ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু বিস্তারের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গুণগত মান। কেবল ডিগ্রিধারী মানুষের সংখ্যা বাড়লেই উন্নত রাষ্ট্র হওয়া যায় না; প্রয়োজন দক্ষ, নৈতিক, উদ্ভাবনী এবং মানবিক নাগরিক।

আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, জৈবপ্রযুক্তি, তথ্যবিজ্ঞান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বাস্তবতা নতুন কর্মবাজার তৈরি করছে। ফলে শিক্ষার লক্ষ্যও বদলাতে হবে। মুখস্থবিদ্যা নয়, সমস্যা সমাধান ; সনদ নয়, দক্ষতা ; চাকরির প্রস্তুতি নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ; প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতাÑ এসবই হতে হবে নতুন শিক্ষাদর্শনের ভিত্তি। এখানেই রাজনীতির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা যদি দলীয় প্রতিযোগিতার বিষয় হয়ে ওঠে, তবে নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। কিন্তু যদি শিক্ষা জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়, তবে সরকার পরিবর্তন হলেও উন্নয়নের গতি থেমে থাকে না। উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষানীতি কখনও পাঁচ বছরের রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি অন্তত দুই বা তিন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জাতীয় রূপরেখা।

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার সামনে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন আজ স্পষ্ট। শিক্ষকতার পেশাকে কীভাবে আরও মর্যাদাপূর্ণ করা যায়. গবেষণায় বিনিয়োগ কীভাবে বহুগুণ বাড়ানো যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞানকেন্দ্রে রূপান্তর করা যায়? কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষাকে কীভাবে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা যায়? সর্বোপরি, কীভাবে এমন একটি শিক্ষা পদ্ধতি নিশ্চিত করা যায়, যা একজন মানুষকে কেবল দক্ষ নয়, নৈতিকও করে তোলে। 

একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য স্থায়ী জাতীয় তহবিল গঠন, প্রাথমিক  বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার মানোন্নয়নে নিয়মিত মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিকীকরণ, শিল্প-শিক্ষা-গবেষণার কার্যকর সমন্বয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধের অন্তর্ভুক্তি এবং নীতিনির্ধারণে গবেষণালব্ধ তথ্যের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। শিক্ষকের দায়িত্ব জ্ঞানকে মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করা। শিক্ষার্থীর দায়িত্ব সততা, অধ্যবসায় ও সৃজনশীলতাকে জীবনের অংশে পরিণত করা। অভিভাবকের দায়িত্ব সন্তানকে কেবল সফল নয়, সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আর রাজনীতির দায়িত্ব এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে মুক্তচিন্তা, গবেষণা, মতপ্রকাশ ও উদ্ভাবনের পথ কখনও সংকুচিত না হয়।

বাংলাদেশ যদি আগামী কয়েক দশকে উন্নত, মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হতে হবে মানুষের মেধায়। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদ একদিন শেষ হতে পারে, কিন্তু জ্ঞান কখনও নিঃশেষ হয় না; বরং যত ভাগ করা যায়, ততই বৃদ্ধি পায়। একটি উন্নত জাতির পরিচয় তার অট্টালিকায় নয়, তার বিদ্যালয়ে; তার অস্ত্রাগারে নয়, তার গবেষণাগারে; তার ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়, তার নাগরিকের চরিত্রে।

আজ তাই নতুন করে জাতীয় অঙ্গীকারের সময়- শিক্ষা হবে জাতীয় উন্নয়নের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, আর রাজনীতি হবে জনকল্যাণ, নৈতিকতা ও দূরদর্শিতার প্রতীক। যে দিন সংসদে শিক্ষা নিয়ে বিতর্ক হবে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে, যে দিন শিক্ষক তার মর্যাদাকে রাষ্ট্রের মর্যাদা বলে অনুভব করতে পারবেন, যে দিন একজন শিক্ষার্থী নম্বরের চেয়ে জ্ঞানকে বেশি মূল্য দেবে এবং যে দিন রাজনীতিকগণ ক্ষমতার পরিবর্তে মানুষের কল্যাণকে নিজের সর্বোচ্চ ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেনÑ সেদিনই সত্যিকার অর্থে একটি জ্ঞাননির্ভর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশের নতুন অধ্যায় সূচিত হবে।

সভ্যতার ইতিহাসে সাম্রাজ্য এসেছে, সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে; কিন্তু মহান শিক্ষা, আলোকিত চিন্তা এবং নৈতিক নেতৃত্ব যুগের পর যুগ মানুষের পথপ্রদর্শক হয়ে থেকেছে। বাংলাদেশেরও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে সেই পথেই। শিক্ষা যদি জাতির আত্মা হয়, তবে রাজনীতি তার বিবেক। আর সে আত্মা ও বিবেক যখন একই আদর্শে পরিচালিত হয়, তখনই জন্ম নেয় এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হয় মানুষের জ্ঞান, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং মানবিক উৎকর্ষ। বাংলাদেশ আজ যে যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তাতে এসব মূল্যবোধের সম্মিলনই পারে তাকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের পথে এগিয়ে নিতে।


লেখক: শিক্ষক, কবি ও কলাম লেখক 

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা