ইমেইল থেকে
মারিয়া হাসান
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
‘মহাসমুদ্রের শত বৎসরের কল্লোল যদি কেহ এমন করিয়া বাঁধিয়া রাখিতে পারে যে সে ঘুমাইয়া পড়া শিশুটির মত চুপ করিয়া থাকিত, তবে এই নীরব মহাশব্দের সহিত লাইব্রেরির তুলনা হইত’- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
জাতির সভ্যতার মাপকাঠি তার সমৃদ্ধ সাহিত্যভান্ডার। সাহিত্যের সংগ্রহশালাই হলো গ্রন্থাগার, প্রচলিত ভাষায় লাইব্রেরি। মানসম্মত সুশিক্ষা একটি জাতিকে উত্তরোত্তর উন্নতির দিকে ধাবিত করে। আবার শিক্ষার অভাব একটি জাতিকে চূড়ান্ত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দেয়। লাইব্রেরি মুক্ত জ্ঞানচর্চা এবং জ্ঞান বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থাগার ছিল সুদূর মেসোপটেমিয়া সভ্যতার আশুরবানিপাল গ্রন্থাগার। বিখ্যাত মহাকাব্য ‘গিলগামেশ’ ছাড়াও আ্যসেরীয় ভাষা এবং কিউনিফর্ম লিপির পাণ্ডুলিপির অস্তিত্ব মিলেছে এই গ্রন্থাগারে। পাশ্চাত্যের প্রাচীন লাইব্রেরির কথা বলতে গেলেই উঠে আসে অষ্টাদশ শতকে নির্মিত জার্মানির ডাচেস আনা আমালিয়া লাইব্রেরির কথা। রোকোকো স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন এই লাইব্রেরি যেন জার্মান সংস্কৃতি এবং সমাজব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি। সংস্কৃতি আর ক্যাফের শহর পারীর সিন নদীর তীরের বিবলিওতেক নাসিওনাল দ্যা ফঁস (ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগার) ফরাসি সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার কালের সাক্ষী সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম গ্রন্থাগার হিসেবে যাত্রা শুরু করে কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ১৯২১ সালের জুলাই মাসে ঢাকা কলেজ এবং জগন্নাথ কলেজের (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) প্রায় ১৮,০০০ বই নিয়ে যাত্রা শুরু করে। দেশে প্রায় সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে স্বনামধন্য স্কুল এবং কলেজ পর্যায়ে লাইব্রেরি আছে। কিন্তু এই লাইব্রেরিগুলো যেন চরম অব্যবস্থাপনা আর অনিয়মের আঁতুড়ঘর। পর্যাপ্ত বই এবং আনুষঙ্গিক উপকরণের অভাবে প্রায়শই পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে এসব লাইব্রেরি। এসব লাইব্রেরি সংস্কার এবং আধুনীকিকরণ এখন সময়ের দাবি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল মোট জিডিপির ১.৩৯%, যা বর্তমান বাজেটে ২% এ উন্নীত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা বাজেটের একটি নির্দিষ্ট অংশ এই লাইব্রেরি সংস্কারে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ব্যয় করা হয়। বর্তমানে লাইব্রেরি ধারণা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক ছক বাঁধা নিয়মের বাইরেও বিস্তৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশে বেশকিছু আধুনিক ধাঁচের বুকশপ পাঠকসমাজে বেশ সমাদৃত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি ঢাকায় জাপানিজ বুকশপ কিনোকুনিয়া তাদের শাখা চালু করেছে। সুস্থধারার সংস্কৃতি চর্চা এবং সভ্য জাতি বিনির্মাণে গ্রন্থাগার আধুনীকিকরণের বিকল্প নেই । প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সুনিশ্চিত করে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ স্বচ্ছতার সাথে ব্যয় করলে চীনের তিয়ানডন বিনহাই কিংবা জাপানের ইউসুহারার মতো আধুনিক গ্রন্থাগার আমাদের দেশেও অসম্ভব কিছু নয়।
লেখক: মারিয়া হাসান (শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা)