বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
নূরুদ্দীন দরজী
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
নূরুদ্দীন দরজী। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আজ ১১ জুলাই। দিবসটি সম্পর্কে কিছু লিখতে বসে মরমী শিল্পী ফিরোজ সাঁইয়ের একটি গানের কথা মনে হলো। মানুষ নিয়ে গানে তিনি গেয়েছেন, ‘আমি মানুষ দেখে পেলাম কেন ভয়।’ অর্থাৎ শিল্পী মানুষ দেখে ভয় পাচ্ছেন। মনে হয় মানুষের আধিক্য নয়, হিংস্রতার কারণে মানুষ দেখে তার এমন ভয় হয়। এই বিশ্ব সৃষ্টির পর থেকে এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় পনের হাজার কোটি মানুষের জন্ম হয়েছে।
পনের হাজার কোটির একটি অংশ বর্তমান পৃথিবীর ৮২০ কোটি মানুষ। জাতিসংঘের জনসংখ্যা প্রকল্পের এক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই হাজার বছর আগে অর্থাৎ ০১ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১৯ মিলিয়ন বা এক কোটি নব্বই লাখ।তার আগে ১,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ছিল পঞ্চাশ লাখ এবং তারও অনেক আগে ১০,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ছিল চল্লিশ লাখ। আবার আজ এক হাজার বছর আগে অর্থাৎ ১,০০০ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর মানুষ ছিল দুই কোটি পঁয়ষট্রি লাখ। ভিন্ন একটি তথ্য মতে, ৪০,০০০ বছর পূর্বে পৃথিবীর লোকসংখ্যা ছিল মাত্র মাত্র দশ হাজার। তাদের অধিকাংশের বসবাস ছিল আফ্রিকার বন-জঙ্গলে। প্রাকৃতিক কারণে সময়ে সময়ে জনসংখ্যা বেড়েছে-কমেছে।
এক সময় পৃথিবীতে অধিক পরিমাণে হিংস্র প্রাণী ছিল, যাদের দ্বারা মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হতো। মানুষদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জায়গা ছিল না। চিকিৎসার অভাবে, শীত ও তুষারপাতে, খাদ্যশস্য উৎপাদন না থাকায় মানুষের সংখ্যা লাখে পৌঁছতে হাজার বছর লেগে যেত। মানুষ যখন থেকে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে, খাদ্য উৎপাদনের সুযোগ পেয়েছে তখন থেকেই বাড়তে শুরু করেছে।
আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশের জনসংখ্যার তথ্য উপাত্তে দেখা যায়, এ বদ্বীপে মানুষের বসবাস ছিল হাজার হাছার বছর আগে থেকে। দুইশ, তিনশ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে এ অঞ্চলে মানুষ বসবাস করে আসছে। তার পর আসে আর্যরা। আর্যদের আসা শুরু হওয়ার পূর্বের মানুষের পরিসংখ্যান জানা যায় না। তবে খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর জনসংখ্যা প্রায় দশ হাজার ছিল বলে ধারণা করা হয়। এ সংখ্যা বেড়ে ১,০০০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিশ লাখের কাছাকাছি চলে যায়। তার পাঁচশ বছর পর সুলতানি ও মোগল আমলে হয়েছিল প্রায় ষাট লাখ। ব্রিটিশ আমলে ছিল দুই কোটি থেকে আড়াই কোটির ধারে-কাছে। দেশ ভাগের পর দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে পাকিস্তান আমলে ১৯৫১ সালে সাড়ে চার কোটির মতো, তারপর সাত কোটি । ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর জনসংখ্যার গ্ৰাফ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ২০০০ সালের হিসাব অনুযায়ী এ সংখ্যা চলে যায় তেরো কোটির ওপরে। এ ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আমাদের জনসংখ্যা আঠারো কোটির প্রায়। কিন্তু বাঙালিরা বিলম্বে হলে ছোট একটি ভূখণ্ডে অধিক জনসংখ্যার সমস্যার কথা বুঝতে পেরেছে, সচেতন হয়েছে। এ মুহূর্তে তেমন বাড়ছে না। এখন আমাদের বৃদ্ধির হার ০.৯০ শতাংশ। অথচ এ হার একটি সময় ৩.২৮ শতাংশে উঠে গিয়েছিল।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের আবহাওয়াগত কারণে এখানে বৃদ্ধির হার বেশি হয়ে থাকে। দেশের দক্ষিণে সুবিশাল বঙ্গোপসাগর রয়েছে বলে উত্তরের হিমালয় পর্বত শৃঙ্গ থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর পানি বঙ্গভূমিতে বয়ে বয়ে সাগরে পতিত হয়। বয়ে যাওয়া পানির সাথে উর্বর পলিমাটি এসে বাংলার জমির উর্বরতা শক্তি বাড়িয়ে দেয়। আবার বঙ্গোপসাগরের জলরাশি দেশের আবহাওয়া খুব বেশি গরম কিংবা ঠান্ডা হতে দেয় না। তাই এ অঞ্চল নাতিশীতোঞ্চ। সারা বছর ধরে কিছু না কিছু ফসল ফলে। সাগরের মোহনায় সহজে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। সুজলা সুফলা, শস্য শ্যামলা উর্বর মাটির ফসল এবং সাগর-নদী-খালবিলের মাছের আধিক্যে মানুষ অনেক প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেয়ে থাকে। এ সমস্ত কারণে এখানে জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পায় দ্রুত।
মানুষ বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জীব এবং জনসম্পদ। এ জনসম্পদকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে উন্নয়ন করা যায়। কবি নজরুল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধায় বলছেন, ‘গাহি সাম্যের গান,/ মানুষের চেয় বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ অথচ বড় ও মহীয়ান মানুষই এখন সমস্যা। তাদের কাজকর্মে দেখা যায় যতসব অসঙ্গতি, অন্যায়, অবিচার ও অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতা। অনেকের কর্মকাণ্ড পশুত্বকেও হার মানায়। অবশ্য অন্যান্য প্রাণীর চেয়ে মানুষেরই চিন্তা, চেতনা ও বিবেক আছে। আর তা আছে বলেই মানুষ বসবাস করে লোকালয়ের সুরম্য অট্টালিকায়, বেশভূষায় সাজে ভদ্রলোক। নিউরোলজিক্যাল দিকগোলো পশুদের আলাদা হওয়ায় এরা থাকে বন-জঙ্গলে। এ কারণে এরা তেমন কিছুর জন্য দায়ী নয়। সৃষ্টিকর্তা মানুষ সৃষ্টি করেছেন তার অবারিত পৃথিবীর সবকিছু দেখভাল করা এবং নিজেদের প্রয়োজনে সুষ্ঠু ব্যবহার করার জন্য। পশুরা হয়তো খেয়ে থাকে, তাও আবার নিজেদের জন্য নয়, অনেকাংশেই পরার্থে। জড় পদার্থ তো নিজেদের জন্য কিছুই করে না, মানুষই এদের ব্যবহার করে। কিন্তু এদের অপব্যবহারে এরা প্রতিশোধ নেয়। মানুষের দ্বারা অত্যাচারিত হয়ে পশু আর কীটপতঙ্গও প্রতিশোধ নিতে বাধ্য হয়। চীনে ফসল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য একটি সময় সকল ইঁদুর, চড়ুইপাখি, মশা ও মাছি মেরে ফেলা হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে ঝাঁকে ঝাঁকে পঙ্গপাল সৃষ্টি হয়ে সমগ্ৰ চীনবাসীকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। মানুষ যে শ্রেষ্ঠ জীব তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু তাদের সবাই শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখে না বলেই আজ পৃথিবীতে সমস্যার পর সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিশিষ্ট লেখক এ. কে. এম. মনজুরুল ইসলাম আফসোস করে তার একটি লেখায় বলেছেন, ‘জনসংখ্যা বাড়ছে, মানুষ বাড়ছে না। মানুষ যদি মানুষের মতো না হয় তবে অহেতুক মানুষ নামধারী জনসংখ্যা অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। এ অধিক সংখ্যায় ক্ষতি ব্যতীত লাভ নেই। তাই সবকিছুর সাথে মানুষের সংখ্যারও একটি ভারসাম্য থাকতে হবে। মানুষই তাদের বিবেকবুদ্ধি খাটিয়ে জনসংখ্যা সীমিত পর্যায়ে রেখে সবকিছুতে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
২০২৬ সালে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রাতিপাদ্য হচ্ছে, ‘এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এ প্রতিপাদ্য একান্তই প্রয়োজনীয়। অধুনা প্রয়াত পাপেট সম্রাট মুস্তাফা মনোয়ার বলেছেন, ‘আমাদের তরুণদের জীবনে অনেক স্বপ্ন, সেই স্বপ্নই দেশকে বাঁচিয়ে রাখবে।’ ইতোমধ্যে যা হওয়ার হয়ে গেছে। আগামী দিনের তরুণদের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে হবে। তরুণরা কমবেশি জনসংখ্যার সমস্যার কথা বোঝে। তারা চায় শান্তিপূর্ণ সুন্দর ভবিষ্যৎ। বর্তমান বিশ্বে ‘জেন-জি’ জেনারেশনের মানুষই তরুণ প্রজন্ম। তার আগে ‘আলফারা এখন মধ্য বয়সী আর, বেটারা সবে জন্মগ্ৰহণ শুরু করেছে। এ তরুণরা যদি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে না পারে পৃথিবী হুমকির সম্মুখীন হবে। এ তরুণরাই সবকিছু কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় রেখে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলে কবি সুকান্তের নবজাতকের কাছে যে দৃঢ় অঙ্গীকার তা পূরণ করতে পারে।
অধিক জনসংখ্যা ভূ-প্রকৃতির ওপর প্রভাব ফেলছে দারুণভাবেÑ এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতোমধ্যে পৃথিবীর অনেক কিছুই বিনষ্ট হয়ে গেছে। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৮০ সালে জনসংখ্যা হবে ১,০৩০ কোটি, যেটি হবে সর্বোচ্চ। পরিসংখ্যানটা ভয়ের কারণ হলেও ২০৮০ সালের পর থেকে আবার নামতে শুরু করবে। ফ্রান্স, জার্মানিসহ কিছু কিছু দেশের জনসংখ্যা এখন থেকে কমা শুরু হয়ে গেছে। সর্বত্রই প্রজনন হার হ্রাস পাচ্ছে। নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিকল্পিত পরিবার গড়ে তোলা সহজ হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া, প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াসহ নানাবিধ প্রতিকূল পরিস্থিতি ভবিষ্যতে জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করছে। শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ যদি বুঝেসুঝে পথ চলে, মানুষের মতো মানুষ হয়, কবির বাণী, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তার উপরে নাই’, চিন্তা করে কোনো সমস্যা নয়, মানুষ দেখে ভয় নয়, মানুষই গড়ে তুলতে পারে সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী।
লেখক: নূরুদ্দীন দরজী (কলাম লেখক ও সাবেক শিক্ষা অফিসার)