সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একটি দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য, জনস্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হলো পর্যাপ্ত সবুজায়ন। কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, বনভূমি উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর সবুজ আচ্ছাদন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। যে কারণে সারা বিশ্বে ‘সবুজ বসতি’ গড়ে তোলার গুরুত্ব বাড়ছে। যেখানে বৃক্ষ, উদ্যান, জলাশয় ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষার মাধ্যমে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে একটি সুষম সহাবস্থান নিশ্চিত করা হয়। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশকে একটি সবুজ বসতির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণকে আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। সবাই মিলে কাজ করলেই আমরা সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ বসতি গড়ে তুলতে পারব। ৯ জুলাই, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। আমরা মনে করি, এই আহ্বান কেবল একটি কর্মসূচির বার্তাই নয়Ñ এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার।
২০২৬ সালের জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছেন, এই বৃক্ষমেলার আয়োজন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ও সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য একটি নিরাপদ বিনিয়োগ। তাই এই আয়োজন কেবল একটি বাৎসরিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত হবে না। তার বক্তব্য, দেশ হোক সকল প্রাণী ও প্রাণের নিরাপদ আবাসস্থল। তিনি বলেন, আমরা যদি প্রতিটি প্রাণের জন্মকে উদযাপন করি ও স্মরণ রাখি, তাহলে নবজাতকের পাশাপাশি একটি গাছও বেড়ে উঠবে।
উল্লেখ্য, সবুজ বসতির সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণে সরকারিভাবেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গ্রিন ভলান্টিয়ারিজম’ চালুর পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরে নতুন করে ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করা যায়।
সবুজ বসতি গড়ে তোলার অর্থ শুধু বনাঞ্চল বৃদ্ধি নয়; বরং প্রতিটি বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, শিল্পকারখানা এবং নগর এলাকায় পর্যাপ্ত সবুজ পরিবেশ নিশ্চিত করা। আধুনিক নগরায়ণের ফলে খেলার মাঠ, খোলা জায়গা এবং গাছপালা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এর ফলে শহরগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। তাই নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ, ছাদবাগান, পার্ক এবং উন্মুক্ত সবুজ স্থান সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের অর্থনীতি, কৃষি এবং জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এসব দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সবুজ বসতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সহায়তা করে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুস্থ রাখে। তাই পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা জনগণের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বৃক্ষপ্রেম ও পরিবেশ সংরক্ষণের মানসিকতা গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় করতে হবে। উপলব্ধিতে আনতে হবে, একটি গাছ রোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার কাজ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার অঙ্গীকার।
শুধু আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করলেই যে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে তেমনটা নয়। প্রয়োজন লাগানো গাছের সঠিক পরিচর্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ। প্রায়ই দেখা যায়, উৎসবমুখর পরিবেশে হাজার হাজার চারা রোপণ করা হলেও পরবর্তীতে পরিচর্যার অভাবে তার অনেক নষ্ট হয়ে যায়। ফলে বৃক্ষরোপণের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। আমরা বলতে চাই, সবুজ বাংলাদেশ গড়তে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। যদি বছরে প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ লাগাই এবং তার পরিচর্যা করি তবে দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা অনেক সহজ হবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দিতে আজই আমাদের অঙ্গীকার হোকÑ আসুন, সবাই মিলে সবুজ বসতি গড়ি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য, সুন্দর ও টেকসই বাংলাদেশ নির্মাণ করি। সহজ করে বললে, বাসযোগ্য দেশ গড়তে সবুজ বসতি চাই।