গত অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বড় দুই-তিনটি দেশে রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও অধিকাংশ বাজারে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানি কমেছে। গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। তবে দেশের মোট পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে তৈরি পোশাক এবারও শীর্ষস্থানে রয়েছে। রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে দেশের মোট রপ্তানি আয় ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী পোশাক খাতের নিটওয়্যার ও ওভেন উভয় উপ-খাতেই রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। নিটওয়্যার খাতে আগের বছরের ২১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ৬২ বিলিয়ন, আর ওভেন খাতে ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন থেকে নেমে এসেছে ১৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় রপ্তানি বাড়লেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অপ্রচলিত কয়েকটি বাজারে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানি কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। সাম্প্রতিক সময়ের ইউরোপীয় সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানিতেই কমেছে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পোশাক সুনাম অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশাব্যঞ্জক হারে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে। হঠাৎ করে সে খাতে এই নেতিবাচক প্রবাহের খবর আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বোঝা যাচ্ছে, তীব্র প্রতিযোগিতার এই সময়ে বাংলাদেশের পোশাক অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এই পিছিয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধান ও প্রতিকার এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
এটা পরিষ্কার যে, চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতাসীন হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এ খাতের সমস্যা-সংকটের দিকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নেওয়া হয়নি সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও। যে কারণে দেশের চার হাজারেরও অধিক সক্রিয় পোশাক কারখানার মধ্যে প্রায় ৫০০টি বন্ধ হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়া অন্যতম। বিশেষ করে ভারত ও ভিয়েতনাম ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য সুবিধা পাওয়ায় তারা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে। তা ছাড়া তীব্র গ্যাস সংকট পোশাক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন বিজিএমইএ’র এই শীর্ষ নেতা। অপরদিকে পোশাক রপ্তানিকারকদের আরেক সংগঠন বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ক্রেতারা সে অনুযায়ী দাম না দেওয়ায় এ খাতে আয় হ্রাস পেয়েছে।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত তৈরি পোশাক রপ্তানি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রবাসী রেমিট্যান্স। জনশক্তি রপ্তানি থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হলেও তা দেশের অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে তেমন ভূমিকা পালন করে না। পোশাক খাতে রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে নতুন বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগ বাড়ে। ফলে এ খাতের সংকট বা রপ্তানি কমে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান, সর্বোপরি জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঋণাত্মক প্রভাব বৃদ্ধি করবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বিগত লীগ সরকারের আমলে নানা ক্ষেত্রে সীমাহীন লুটপাট দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থায় উপনীত করেছে। সেই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হলে দেশের শিল্প ও্র রপ্তানি খাতকে সচল রাখার বিকল্প নেই। ঠিক সে সময়ে পোশাক রপ্তানি হ্রাসের এ খবরকে জাতীয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত বলা অসমীচীন হবে না।
এটা ঠিক, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। এ প্রতিযোগিতা সামনে আরও বাড়বে। সমস্যাসংকুল বিশ্বে নিত্যনতুন সংকটের অবির্ভাব দেখা দিতে পারে। সেজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি না নিতে পারলে পড়তে হবে মারাত্মক সংকটে। সরকার সহায়তা দিতে পারবে। তবে সমস্যা-সংকট উত্তরণের পথ পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। পুরনো বাজার ধরে রাখা এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের ওপর জোর দেওয়া আবশ্যক। অন্যথায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় খাতটি মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।