× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ক্রিপ্টোকারেন্সি কি অর্থনীতির বেসরকারি মুদ্রা

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

ক্রিপ্টোকারেন্সি কি অর্থনীতির বেসরকারি মুদ্রা

বিগত এক দশকে বিশ্বে যে কয়টি বিষয় নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সি, যা মূলত ডিজিটাল সম্পদ। কোনোরকম পূর্বানুমতি ছাড়া এবং কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ন্ত্রণে না থেকে এই ভার্চুয়াল মুদ্রা ক্রমাগত এগিয়ে চলে এবং এক পর্যায়ে আমেরিকার অর্থনীতিতে বেশ ভালো জায়গা করে নেয়। প্রথম দিকে, বিশেষ করে বিগত বাইডেন সরকারের সময় ক্রিপ্টোকারেন্সি মোটেই সুবিধা করে উঠতে পারেনি, কেননা আমেরিকার তখনকার সরকার ক্রিপ্টোকারেন্সি সহায়ক ছিল না। বরং তাদের অবস্থান এই ভার্চুয়াল মুদ্রার বিপক্ষেই ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে আসায় আমেরিকার ক্রিপ্টো কোম্পানিগুলোর ভাগ্য খুলে যায়। ট্রাম্প নিজে ক্রিপ্টোর সমর্থকই শুধু নন, তিনি দ্রুত এই ভার্চুয়াল মুদ্রাকে অর্থনীতির মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এমনকি বেশ কয়েকজন সিনেট সদস্যও ক্রিপ্টোর পক্ষে। ফলে পুরো ট্রাম্প প্রশাসন ক্রিপ্টো সহায়ক হয়ে উঠেছে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এই ডিজিটাল সম্পদ এখন অর্থনীতির এক অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার এখন ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অবস্থা এমন পর্যায় পৌঁছেছে যে, আমেরিকার ব্যাংকিং খাত এখন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য নিজেরাই ক্রিপ্টো প্রডাক্ট বাজারে নিয়ে আসার কথা বিবেচনা করছে। অথচ এই ব্যাংকিং খাত ক্রিপ্টোকারেন্সি থেকে নিজেরা শুধু দূরেই থাকেনি, এই ডিজিটাল সম্পদকে ব্যাংকে প্রবেশ করতেই দেয়নি।

প্রথমদিকে যখন ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে আসে, তখন এই ডিজিটাল সম্পদের প্রতি সাধারণ মানুষের খুব একটা আস্থা ছিল না। কেননা এই ভার্চুয়াল মুদ্রার বিপরীতে কোনো সম্পদ নির্দিষ্ট করে জমা রাখা হয়নি। ফলে এই ডিজিটাল মুদ্রার অন্তর্নিহিত মূল্য বা ইনট্রিনসিক ভেলু সেভাবে নির্ণয় করা যায়নি। এই মুদ্রার মূল্য ওঠানামা করেছে মাত্রাতিরিক্ত এবং ফটকা কারবারের দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল। পরবর্তীতে যখন স্ট্যাবলকয়েন চালু হলো, তখন এই ধরনের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে। মূলত স্ট্যাবলকয়েনই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে এবং এই ডিজিটাল মুদ্রাকে অর্থনীতিতে এবং মুদ্রাবাজারের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার পথ অবারিত করেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি হচ্ছে সেই ধরনের ডিজিটাল টোকেন, যার বিপরীতে সমপরিমাণ ডলার বা অন্যান্য তরল সম্পদ, বিশেষ করে ট্রেজারি বিল সংরক্ষণ করা আছে। স্ট্যাবলকয়েনের এক টোকেনের বিপরীতে এক ডলার বা সমপরিমাণ ট্রেজারি বন্ড জমা রাখা হয়েছে। ফলে স্ট্যাবলকয়েনের অন্তর্নিহিত মূল্য বা ইনট্রিনসিক ভেলু ঋণাত্মক বা নেগেটিভ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। স্ট্যাবলকয়েন জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণে এখন অনেকেই এই ডিজিটাল অ্যাসেটে বিনিয়োগ করছে। এমনকি এই ডিজিটাল টোকেন এখন অনেক স্বাভাবিক লেনদেন নিষ্পত্তি করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্রসবর্ডার লেনদেন নিষ্পত্তি করা যায় এই স্ট্যাবলকয়েন দিয়ে। অনেকে ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মতো স্ট্যাবলকয়েন ব্যবহার করে থাকে। এই স্ট্যাবলকয়েনের জনপ্রিয়তা দেখেই আমেরিকার বৃহৎ ব্যাংকগুলো তাদের নিজস্ব স্ট্যাবলকয়েন হিসেবে ডিজিটাল টোকেন-ভিত্তিক (টোকেনাইজড) ডিপোজিট চালু করতে চলেছে। 

ক্রিপ্টোকারেন্সি, বিশেষ করে স্ট্যাবলকয়েনকে মূল আর্থিক খাতের সাথে সম্পৃক্ত করতে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন সবরকম সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। এই উদ্দেশ্যে গত বছর জিনিয়াস অ্যাক্ট পাস করা হয়েছে। এবং ক্লারিটি অ্যাক্ট নামের আরও একটি আইন পাসের অপেক্ষায় আছে। এসব আইনের উদ্দেশেই হচ্ছে স্ট্যাবলকয়েনকে একটা আইনগত ভিত্তি দেওয়া, যাতে এই ভার্চুয়াল মুদ্রা ডলারের মতো সাধারণের মাঝে লেনদেন নিষ্পত্তিতে অবাধে ব্যবহৃত হতে পারে। শুধু তাই নয়, এই জিনিয়াস আইনের কারণে অনেক ক্রিপ্টো কোম্পানি ব্যাংকের মতো বেশ কিছু আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। এই আইন বলেই অনেক ক্রিপ্টো কোম্পানি ব্যাংকের পাশাপাশি অনেক আর্থিক সেবা গ্রাহকদের দিতে পারবে। ডিপোজিট সংগ্রহ, ক্রেডিট কার্ড চালু করা, ঋণ দান, অর্থ স্থানান্তর এবং এমনকি ক্রসবর্ডার পেমেন্ট দিতে পারবে এই স্ট্যাবলকয়েন ব্যবহার করে। এককথায় অনেক ক্রিপ্টো কোম্পানি রীতিমতো ব্যাংকের প্রতিযোগী হয়ে যাবে। ক্রিপ্টো কোম্পানির কাছ থেকে এরকম প্রতিযোগিতা আসতে পারে, এমনটা আঁচ করতে পেরে ব্যাংকগুলো এই জিনিয়াস অ্যাক্ট ঠেকানোর অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। 

ক্রিপ্টোকারেন্সি যে পর্যায়ে চলে এসেছে এবং ইন্ডাস্ট্রিতে যে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে, তাতে স্ট্যাবলকয়েন এখন অর্থনীতিতে লেনদেনের বৈধ মাধ্যম হিসেবে ডলারের পাশাপাশি অবস্থান করবে। এমনকি লেনদেন নিষ্পত্তিতেও ব্যবহৃত হবে। মানুষ তাদের সুবিধামতো ডলার বা স্ট্যাবলকয়েন দিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় লেনদেন সম্পন্ন করবে। যখন স্ট্যাবলকয়েন ডলারের পাশাপাশি অবস্থান করবে এবং একই রকম কাজে ব্যবহৃত হবে তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে যে স্ট্যাবলকয়েনের স্বীকৃতি বা স্ট্যাটাস কী হবে। ডলার লিগ্যাল টেন্ডার বা সরকারি মুদ্রার স্ট্যাটাস ভোগ করে থাকে। কেননা সরকারের পক্ষে ফেডারেল রিজার্ভ বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার ইস্যু করে এবং এর সার্কুলেশন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কিন্তু স্ট্যাবলকয়েন তো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ইস্যু করা হয়েছে। বেসরকারি কোম্পানির ইস্যু করা কোনো আর্থিক দলিল বা ফিন্যান্সিয়াল ইনস্ট্রুমেন্ট সরকারি মুদ্রার স্ট্যাটাস ভোগ করতে পারে না।

সরকারি মুদ্রার কথা আমরা সবাই জানলেও, বেসরকারি মুদ্রা বা প্রাইভেট কারেন্সির কথা আমরা সেভাবে জানি না। আসলে সরকারি এবং বেসরকারি মুদ্রা জানার আগে আমাদের জানা প্রয়োজন মুদ্রা বা অর্থ বলতে আসলে কী বুঝায়। অর্থের সংজ্ঞার কোনো শেষ নেই। অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে অর্থের সংজ্ঞা দিয়েছেন। কিন্তু সাধারণভাবে আমরা যা বুঝি তা হচ্ছে অর্থ বা মুদ্রা এমন এক বিনিময়ের মাধ্যম, যার মাধ্যমে কোনো পণ্য বা সেবার মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এমনকি অর্থের মাধ্যমেই কোনো পণ্য বা সেবার মূল্য ধরে রাখা হয়। সুতরাং অর্থের সুনির্দিষ্ট তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমত, অর্থ বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে লেনদেন নিষ্পত্তিতে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয়ত, অর্থের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রীর মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তৃতীয়ত, এই অর্থের মাধ্যমেই পণ্যসামগ্রীর মূল্য ধরে রাখা হয়। অর্থের এই তিনটি বৈশিষ্ট্য আবার ক্রিপ্টোকারেন্সি বা স্ট্যাবলকয়েনেরও আছে। অর্থাৎ স্ট্যাবলকয়েন বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্ট্যাবলকয়েনের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রীর মূল্য নিরূপণ করা শুরু হয়েছে এবং স্ট্যাবলকয়েনের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রীর মূল্য ধরে রাখার সুযোগ আছে। 

এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই স্ট্যাবলকয়েন এখন আর্থিক খাতে বৈধ অর্থের স্বীকৃতি পেতে চলেছে। কিন্তু একই রকম বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও স্ট্যাবলকয়েন ডলারের মতো লিগ্যাল টেন্ডার বা সরকারি মুদ্রার স্ট্যাটাস ভোগ করতে পারে না। কেননা স্ট্যাবলকয়েন ইস্যু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সেই বিবেচনা থেকে স্ট্যাবলকয়েন বেসরকারি মুদ্রা হিসেবে অর্থনীতিতে চালু থাকবে। অনেকে অবশ্য বলার চেষ্টা করেন যে স্ট্যাবলকয়েন বেসরকারি মুদ্রা হলেও এসব মুদ্রা সরকারি এবং বেসরকারি উভয় ধরনের মুদ্রার কাজ করতে পারবে। কেননা স্ট্যাবলকয়েনের বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার সংরক্ষণ করা হয়। তাই স্ট্যাবলকয়েনের মালিক চাইলে ডিজিটাল টোকেন পরিবর্তন করে ডলারে রূপান্তর করতে পারবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে স্ট্যাবলকয়েন সরকারি এবং বেসরকারি উভয় মুদ্রার স্ট্যাটাস দাবি করলেও এই ভার্চুয়াল মুদ্রা মুদ্রাবাজারের সেটেলমেন্ট সিস্টেমের বাইরেই রয়ে গেছে। 

আজকের দিনে বেসরকারি মুদ্রার কথা শুনে অনেকেই অবাক হতে পারেন। কিন্তু এই বেসরকারি মুদ্রার প্রচলন একসময় ছিল। আগে অনেক ব্যাংক, বিশেষ করে আমেরিকার অনেক ব্যাংক নিজেরাই নোট ইস্যু করতে পারত। ব্যাংকের ইস্যু করা অর্থকে তখন বেসরকারি মুদ্রাই বলা হতো। স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, আমেরিকায় ১৮৩৭ থেকে ১৮৬৩ সাল সময়ের মধ্যে অনেক ব্যাংক নিজেরাই তাদের নিজস্ব কারেন্সি ইস্যু করেছে। ব্যাংকের নিজস্ব মুদ্রা তখন বেসরকারি অর্থের মর্যাদাই ভোগ করেছে। কিন্তু ব্যবস্থাটা মোটেই কার্যকরী ছিল না। কেননা এক ব্যাংকের ইস্যু করা মুদ্রার সাথে অন্য ব্যাংকের মুদ্রার বিনিময় মূল্যের ব্যাপক উত্থানপতন হয়েছে। তা ছাড়া ব্যাপক জালজালিয়াতি এবং সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় এই পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়। একসময় বেসরকারি মুদ্রা অর্থনীতিতে চালু থাকলেও ভালো জায়গা করে নিতে পারেনি। এতদিন পরে এসে স্ট্যাবলকয়েন কি অর্থনীতিতে বেসরকারি মুদ্রা হিসেবেই চালু হবে কি নাÑ সেটাই এখন দেখার বিষয়।


লেখক: সার্টিফায়েড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা