আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
একসময় যে পলিথিনকে আমরা কেবল পরিবেশ ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে দেখতাম, আজ সেই পরিত্যক্ত পলিথিনই আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় রূপ নিচ্ছে টেকসই আসবাব, নির্মাণসামগ্রী এবং নানা মূল্যবান শিল্পপণ্যে। এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গল্প নয়; এটি পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং টেকসই উন্নয়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা নদীমাতৃক বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ শুধু সময়োপযোগী নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অপরিহার্য উন্নয়ন কৌশল।
সম্প্রতি কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠিত একটি আধুনিক প্লাস্টিক রি-সাইক্লিং কারখানা দেখিয়ে দিয়েছে যে, যেসব একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন এত দিন সমুদ্র, নদী, খাল-বিল ও নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার জন্য অভিশাপ হয়েছিল, সেগুলোকে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করে টেকসই আসবাব, প্লাস্টিক লাম্বার, শিট এবং অন্যান্য ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব। এটি কেবল একটি শিল্প উদ্যোগ নয়; বরং বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এক সফল উদাহরণ, যা বাংলাদেশের সার্কুলার অর্থনীতি গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর বড় একটি অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার না হওয়ায় নদী, কৃষিজমি, জলাভূমি এবং শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে গিয়ে জমা হয়। বিশেষ করে পর্যটননগরী কক্সবাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এই বাস্তবতায় কক্সবাজারের রামুতে গড়ে ওঠা আধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখানে সংগ্রহ করা পলিথিন ও নিম্নমূল্যের প্লাস্টিক বর্জ্য ধোয়া, বাছাই, কুঁচি করা, শুকানো এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে পেলেটে রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পরে সেই পেলেট থেকে তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিক লাম্বার, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল, সোফা, শিট এবং বিভিন্ন ধরনের টেকসই আসবাব। কাঠের বিকল্প হিসেবে এসব পণ্য দীর্ঘস্থায়ী, পানি ও পোকামাকড় প্রতিরোধী এবং তুলনামূলকভাবে কম রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষ।
এটি পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একই সূত্রে বেঁধেছে। একদিকে সমুদ্র ও প্রকৃতি প্লাস্টিক দূষণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন কর্মসংস্থান। বর্জ্য সংগ্রহকারী, বাছাইকারী, কারখানার শ্রমিক, কারিগর এবং উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন আয়ের সুযোগ। বিশেষ করে নারী কর্মীদের অংশগ্রহণ এই শিল্পকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সামাজিকভাবে ইতিবাচক করে তুলছে।
বিশ্বব্যাপী এখন ‘সার্কুলার ইকোনমি’ বা চক্রাকার অর্থনীতির ধারণা দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। এই ধারণার মূল দর্শন হলোÑ একটি পণ্যের ব্যবহার শেষ হলেও সেটিকে পুনরায় উৎপাদনচক্রে ফিরিয়ে এনে নতুন সম্পদে রূপান্তর করা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশ ইতোমধ্যেই এই মডেল অনুসরণ করে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশও যদি পরিকল্পিতভাবে এই শিল্পকে সম্প্রসারণ করতে পারে, তবে এটি দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় সবুজ শিল্প খাতে পরিণত হতে পারে।
বর্তমানে দেশের প্লাস্টিক শিল্প রপ্তানিমুখী সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি। কিন্তু পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটলে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরতা কমবে, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং নাগরিক সচেতনতাÑ এই চারটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যবহারের পর পলিথিন যদি সঠিকভাবে সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা যায়, তাহলে সেটি আর পরিবেশের শত্রু নয়; বরং শিল্পের মূল্যবান কাঁচামাল।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের অধিকাংশ পৌর এলাকায় এখনও উৎস পর্যায়ে বর্জ্য আলাদা করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। একই ডাস্টবিনে খাদ্যবর্জ্য, প্লাস্টিক, কাগজ ও চিকিৎসাবর্জ্য ফেলার ফলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকও নষ্ট হয়ে যায়। তাই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি উৎপাদিত প্লাস্টিকের একটি অংশ পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং সরকার উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ, কর-সুবিধা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে, তবে দেশে শত শত আধুনিক রিসাইক্লিং শিল্প গড়ে ওঠা সম্ভব। কক্সবাজারের এই উদ্যোগ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়Ñ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিকল্প নেই। পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি লাম্বার ও নির্মাণসামগ্রী উপকূলীয় অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা গেলে কাঠের ব্যবহার কমবে, বন সংরক্ষিত হবে এবং কার্বন নিঃসরণও হ্রাস পাবে।
সরকার ইতোমধ্যে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন নীতি ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তবে নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়ন, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি। মানুষকে বোঝাতে হবেÑ প্লাস্টিক বর্জ্য কেবল আবর্জনা নয়; সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক দিয়ে স্কুলের বেঞ্চ, পার্কের আসবাব, সেতুর উপকরণ, হাঁটার পথ এবং আবাসন নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই ধারায় এগিয়ে যেতে পারলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
আজকের বিশ্বে উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলে গেছে। শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়; প্রকৃতি রক্ষা, বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড। কক্সবাজারের এই উদ্যোগ সেই নতুন উন্নয়ন দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন। পরিত্যক্ত পলিথিন বর্জ্য থেকে টেকসই আসবাব তৈরির এই উদ্যোগ কেবল একটি শিল্পপ্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত। সরকার, বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে যদি এ ধরনের উদ্যোগকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারে, তবে এক দিন বাংলাদেশের নদী, সমুদ্র, বন ও নগরগুলো প্লাস্টিক দূষণের অভিশাপ থেকে অনেকটাই মুক্ত হবে। তখন বর্জ্য আর বোঝা হবে না; বরং তা হবে নতুন সম্পদ, নতুন কর্মসংস্থান এবং সবুজ অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি। তাই কক্সবাজারের এই উদ্ভাবনী উদ্যোগ শুধু একটি জেলার সাফল্যের গল্প নয়; বরং এটি সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি অনুপ্রেরণা ও উন্নয়ন দর্শন। সুতরাং সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে আবর্জনাও জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক