মাহমুদুল হাসান কমল
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীনে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে দালিয়ানে গ্রীষ্মকালীন দাভোস সম্মেলনে অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে বেইজিংয়ে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক, সব মিলিয়ে ১৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি মন্ত্রণালয় পর্যায়ে, তিনটি বিডার সঙ্গে এবং একটি বিএনপি ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে। সরকারের ভাষায় এটি ‘নতুন দিগন্ত উন্মোচন’। লালগালিচা সংবর্ধনা, গ্রেট হল অব দ্য পিপলের আনুষ্ঠানিকতা, যৌথ ঘোষণাপত্রে ‘কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি এসব দৃশ্য নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দিক থেকে তৃপ্তিদায়ক। কিন্তু প্রশ্ন তোলা জরুরি যে এই সফর থেকে বাংলাদেশ আদতে কী পেল এবং এর মূল্য কত?
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার তাড়না সময়োপযোগী ও অত্যন্ত যৌক্তিক উদ্যোগ। রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর গত দুই বছরে চীনা বিনিয়োগ ও অবকাঠামো অর্থায়নের গতি অনেকটা মন্থর হয়ে পড়েছিল। এই সফরের মধ্য দিয়ে সেই গতি আবার বাড়ানোর চেষ্টা সময়োচিত। কারণ চীন এখনও বাংলাদেশের শিল্পের যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও টেক্সটাইল কাঁচামালের সবচেয়ে বড় উৎস।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে শিক্ষাখাতে যে অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে, তার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো বাংলাদেশে তৃতীয় ভাষা হিসেবে মান্দারিন শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যাতে চীন শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়নেও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি এসেছে। কিন্তু এখানে যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হলো বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট গবেষণা বরাদ্দের অভাব, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে থাকা এবং প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষায় দুর্বলতা। চীনের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা, স্কলারশিপ সম্প্রসারণ অথবা যুগ্ম ডিগ্রি প্রোগ্রামের মতো কাঠামোগত কোনো রূপরেখা এই সফরে প্রকাশ্যে আসেনি। ভাষা শেখানো একটি ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু এটি উচ্চশিক্ষার সংকটের সমাধান নয়, বড়জোর একটি পরিপূরক উপাদান।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী সই হওয়া ১৩টি সমঝোতা স্মারকের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতও রয়েছে। তবে এই খাতে ঠিক কী ধরনের সহযোগিতা হবে, হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসক প্রশিক্ষণ, নাকি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম রপ্তানি, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সরকারি ব্রিফিংয়ে স্পষ্ট করা হয়নি। বাংলাদেশের লাখো মানুষ প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বিদেশ যান এবং তার একটি বড় অংশ ভারতের দিকে ঝোঁকেন। চীনের সঙ্গে যদি প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসা পর্যটন বা যৌথ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মতো সুনির্দিষ্ট কিছু হতো, তাহলে তা দেশের রোগীদের জন্য বাস্তবিক অর্থে উপকারে আসত। কিন্তু এই সফরে স্বাস্থ্য খাত যেন শুধু একটি তালিকার আইটেম, যার পেছনে নির্দিষ্ট সময়সীমা বা বাজেট নেই। সরকারের উচিত ছিল এই বিষয়ে আরও স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা।
এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সবচেয়ে কম আলোচিত দিক হলো প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। দুই দেশ প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক তথ্য আদান প্রদানে সম্মত হয়েছে এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ চীনের তৈরি ২৪টি চেংডু জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, যা বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পর এই মডেলের দ্বিতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী হবে বাংলাদেশ। এই অগ্রগতি একদিকে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু অন্যদিকে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশকে একটি স্পষ্ট অবস্থানে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকিও বহন করে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম একক উৎস থেকে সংগ্রহ করা, বিশেষ করে এমন একটি দেশ থেকে যার সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নে স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ। সরকার বলছে, এটি অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না, কিন্তু বাস্তবতা হলো ভূ-রাজনীতি কখনও শূন্যস্থানে ঘটে না। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সহযোগিতার বিষয়টিও এই সফরে গুরুত্ব পেয়েছে, যাতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ এগিয়ে নেবেন।
সফরের সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাবটি হলো বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী এর উদ্দেশ্য বাংলাদেশের অর্থনীতির ব্যাপ্তি বাড়ানো, বাণিজ্যিক লেনদেন সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী পরিবহন ব্যবস্থা জোরদার করা। সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে চীনের আগ্রহও প্রকাশ পেয়েছে। প্রস্তাবটি কাগজে-কলমে আকর্ষণীয় শোনায়, কারণ এটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হতে পারে। তবে এই করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যাবে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে, যেখানে চলমান গৃহযুদ্ধ, রোহিঙ্গা সংকট এবং সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণহীনতা একটি নিদারুণ বাস্তবতা। যে অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই কঠিন, সেখানে রেল বা সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলার স্বপ্ন আদৌ কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, প্রধানমন্ত্রীর এই প্রথম চীন সফর কূটনৈতিক দিক থেকে সফল বলেই প্রতীয়মান হয়। সবকিছু মিলিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। কিন্তু মূল প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে যেগুলোর বাস্তবায়নের হার নিরাশাজনক।সরকারের উচিত হবে, এই সফরের প্রাপ্তিগুলোকে কেবল সংবাদ সম্মেলনের বিবৃতি না রেখে সংসদে এবং জনসমক্ষে আরও স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা, যাতে জাতি জানতে পারে এই সম্পর্কের প্রকৃত মূল্য এবং তার শর্তাবলি কী। মানে রাখা দরকার, কূটনীতির সাফল্য মাপা হয় তার বাস্তবায়নে, লাল গালিচার দৈর্ঘ্যে নয়।
লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও মুখপাত্র, বাংলাদেশ স্টাডি ফোরাম (বিডিএসএফ)