× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জুলাই অভ্যুত্থান ও জণগণের শক্তি

অ্যাড. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

জুলাই গণঅভ্যুত্থান। ফাইল ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থান। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস মূলত অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানÑ প্রতিটি অধ্যায়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষের মুক্তি, বৈষম্যের অবসান এবং একটি জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা।

ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে এদেশের মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, যখন রাষ্ট্র জনগণের প্রত্যাশা থেকে বিচ্যুত হয়, তখন জনগণই পরিবর্তনের শক্তি হয়ে ওঠে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেবল একটি সরকারের পতনের মধ্যে দেখলে, এর প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়। এটি ছিল একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, অন্যায়, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মতপ্রকাশের সংকোচন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থাহীনতার বিরুদ্ধে জনগণের সম্মিলিত প্রতিবাদ। মানুষ রাজপথে নেমেছিল শুধু শাসক পরিবর্তনের জন্য নয়; তারা চেয়েছিল রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনের পরিবর্তন। এই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন কিংবা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, তারা ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে আত্মত্যাগ করেননি। তাদের অধিকাংশই ছিলেন তরুণ। তাদের সামনে ছিল পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন ও অসংখ্য স্বপ্ন। তবুও তারা রাজপথে নেমেছিলেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেছিলেনÑ একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়েও বড় হলো জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের এই আত্মত্যাগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।

আজ সেই আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে কেবল স্মৃতিচারণের মাধ্যমে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার প্রতিফলনের মাধ্যমে। শহীদদের দায়িত্ব শেষ হয়েছে কিন্তু জীবিতদের দায়িত্ব এখন শুরু। তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, নতুন প্রজন্মের বিশ্বাসকে অক্ষুণ্ন রাখা এবং রাষ্ট্রকে ন্যায়, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের পথে এগিয়ে নেওয়াই আজকে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের বড় একটি অংশ কোনো রাজনৈতিক পদ, ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার প্রত্যাশায় মাঠে নামেননি। তারা নেমেছিলেন একটি ন্যায্য রাষ্ট্রের দাবিতে। এই তরুণদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের নৈতিক অবস্থান। রাষ্ট্র যদি তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, যদি পুরনো সংস্কৃতিই নতুন রূপে ফিরে আসে, তবে সেটিই হবে জুলাইয়ের চেতনার সবচেয়ে বড় পরাজয়। তাই জুলাইয়ের আদর্শকে ধারণ করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজÑ সবাইকে এই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি গণ-আন্দোলনের মূল কারণ ছিল বৈষম্য। অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য কিংবা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বেদনাÑ এসবই মানুষকে বারবার রাজপথে নিয়ে এসেছে। ধর্ম, বর্ণ, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ যখন একটি অভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, তখনই ইতিহাসে পরিবর্তন এসেছে। জুলাই সেই জাতীয় ঐক্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।

জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলোÑ রাষ্ট্রের শক্তির প্রকৃত উৎস জনগণ। জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না। আর সেই আস্থা অর্জনের একমাত্র পথ হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। আর চেতনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট অবস্থানও নির্দেশ করে। দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ধ্বংস করে। একইভাবে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের সংস্কৃতি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়। অতীতের এসব অভিজ্ঞতা থেকেই জনগণ পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল। তাই নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের প্রথম শর্ত হওয়া উচিতÑ রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা।

পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও মেধার মূল্যায়নও জুলাইয়ের চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী যদি তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ না পায়, তবে হতাশা বাড়বে, রাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমবে এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে। একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোÑ সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা। সেখানে চাকরি, শিক্ষা, প্রশাসনিক সুযোগ কিংবা অর্থনৈতিক অগ্রগতি কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে নাÑ নির্ভর করবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততার ওপর।

জুলাই আমাদের আরেকটি বিষয়ও স্মরণ করিয়ে দেয়Ñ গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন-নির্ভর একটি ব্যবস্থা নয়। গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকে, সংবাদ মাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ থাকে এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবে সুরক্ষিত হয়। রাষ্ট্রের সমালোচনা করার অধিকার যেমন গণতন্ত্রের অংশ, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। 

আজ বাংলাদেশের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। এই সুযোগকে যদি আমরা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন হিসেবে দেখি, তবে তা হবে একটি বড় ভুল। এটিকে রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন এবং সুশাসনের নতুন ভিত্তি নির্মাণের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ ইতিহাসে এমন মুহূর্ত বারবার আসে না। যারা জীবন দিয়েছেন, তারা একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।

জুলাইকে ধারণ করার অর্থ শুধু স্মৃতিসৌধ নির্মাণ নয়, শুধু শোক বা শ্রদ্ধা নিবেদনও নয়। জুলাইকে ধারণ করার অর্থ হলোÑ দুর্নীতিকে না বলা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, বৈষম্য কমানো, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকারকে সমানভাবে স্বীকৃতি দেওয়া। এই মূল্যবোধগুলো যদি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে প্রতিফলিত হয়, তাহলেই জুলাইয়ের আত্মত্যাগ অর্থবহ হবে।

জুলাই কোনো সমাপ্তি নয়; এটি একটি নতুন সূচনা। একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের দীর্ঘ যাত্রাপথের সূচনা। সেই যাত্রায় রাষ্ট্র, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং নাগরিকÑ সবার দায়িত্ব রয়েছে। আমরা যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারি, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারি এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সংযুক্ত রাখতে পারি, তাহলে জুলাইয়ের চেতনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। আর যদি আমরা সেই অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হই, তবে ইতিহাস আমাদেরও ক্ষমা করবে না।


লেখক: অ্যাড. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস (সংসদ সদস্য ও প্রধান সমন্বয়ক, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল কেন্দ্রীয় কমিটি)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা