জান্নাতুল ফেরদৌস ঝুমা
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
গণযোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম চলচ্চিত্র। সমাজের শক্তিশালী এই মাধ্যমটি তার পূর্ববর্তী সকল মাধ্যমের সমন্বয়ে যৌগিক মাধ্যম হিসেবে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে হাজির হচ্ছে। নির্বাক, সবাক, এনালগ, ডিজিটাল যে ফর্মেই চলচ্চিত্র তৈরি হোক না কেন, চলচ্চিত্র একটি ভাষা। যা গড়ে ওঠে চলচ্চিত্র নির্মাতার মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি, অবস্থান, সর্বোপরি মতাদর্শের নিরিখে।
চলচ্চিত্রের অভ্যন্তরীণ উপাদানগুলোর সমন্বয়ে দৃশ্য ও ইমেজের সংগঠন ও সংস্থাপনের মাধ্যমে কোনো একটি ঘটনা বা কাহিনীকে চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করে নতুন একটি অর্থ তৈরি করেন নির্মাতা। আবিষ্কারের পর থেকে প্রতিনিয়তই সমৃদ্ধ হওয়া চলচ্চিত্র মাধ্যম ঘিরে যেসব তাত্ত্বিক কাঠামো গড়ে উঠেছে তার মধ্যে অন্যতম হলো অত্যর তত্ত্ব।
ফ্রান্সের নিউওয়েব সিনেমার যুগে অত্যর তত্ত্বের আবির্ভাব। অত্যর তত্ত্ব মতে, প্রত্যেক চলচ্চিত্র নির্মাতাই একজন অথ্যর। যিনি তার চলচ্চিত্রকে নিজ ভাষায়, চিন্তা, মেধা, মনন, দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃষ্টিশীলতায় তৈরি করেন। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, চলচ্চিত্রকে ‘অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য’ আর্ট বা কলায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন যেসব নির্মাতা তাদের মাঝে ডি. ডব্লিউ গ্রিফিট, এফ ডব্লিউ মুরনাও অন্যতম। পরবর্তীতে সের্গেই আইজেনস্টাইন, রবার্ট ফ্লাহার্টি এবং আলফ্রেড হিচকক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন ঐতিহ্য, কলা, তত্ত্ব ও জরাকে কেন্দ্র করে।
অত্যরশিপ বিষয়টি শুধুমাত্র কোনো তত্ত্ব বা কোনো নির্দিষ্ট একটি টপিক নয়। রাজনৈতিক অবস্থান, তাত্ত্বিক ধারণা, সমালোচনাকে সমন্বিত করে অথ্যরশিপ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তত্ত্বটি আলোচনায় আসে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে। হলিউডের কয়েকজন পরিচালক এবং আন্তর্জাতিক আর্ট সিনেমাগুলো বিশ্বব্যাপী অত্যর হিসেবে পরিচিত হচ্ছিল, পাশাপাশি চলচ্চিত্র সমালোচনাকে যখন এক ধরনের বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এ সময় কালকেই ফ্রান্সের ‘পলিটিক দ্য অত্যর’ বা ‘পলিসি’ ধারণার আবির্ভাব হয়।
অত্যর তত্ত্ব ১৯২০-এর দশকে ফ্রান্সে এর গোড়াপত্তন হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে আদ্রে বাজা সম্পাদিত প্রভাবশালী চলচ্চিত্র সাময়িকী কাইয়ে দু সিনেমা সাময়িকী দ্বারা প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৬০-এর দশকে এন্ড্রু সারিস অত্যর তত্ত্বের ধারণা যুক্তরাষ্ট্রে প্রচার করে জনপ্রিয়তা পায়। কিছু কিছু সমালোচনা সত্ত্বেও, চলচ্চিত্র অধ্যয়নে চলচ্চিত্র সমালোচনায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব। ১৯৫০-এর দশকে ফ্রান্স যখন আমেরিকা দ্বারা তীব্রভাবে প্রভাবিত ঠিক তখনই প্যারিসে অত্যর তত্ত্বের আবির্ভাব। পাশাপাশি ১৯১০ ও ২০ দশকের আভাগার্দ আন্দোলন দ্বারা প্রভাবিত অত্যর তত্ত্ব। পুরনো আভা গার্দের মতোই অত্যরবাদ বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণার সমন্বয়, যা সমাজের প্রচলিত প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রশ্ন করে।
অত্যরবাদ মূলত, সমাজের জনসংস্কৃতির নির্দিষ্ট কিছু উপাদানকে গ্রহণ করে এবং যা বুর্জোয়া মূল্যবোধের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। অত্যরবাদ কিছু ইশতেহার বা বিষয় প্রতিষ্ঠা করে, যা এ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাজকে প্রচার করতে সহায়তা করে। যেমনটা বলা যায়, ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর এ সারটেনন টেনডেন্সি অব দ্য ফ্রেন্স সিনেমা’ যা আধুনিক যুগ ও সামাজিক গবেষণার জন্য এ ধরনের পরিবর্তন বা গঠন খুবই সহায়ক ছিল। এর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ট্রুফো, জ্যা লুক গদার, ক্লদ শ্যাব্রল, এরিক রোহমার এবং জ্যাক রিভেতেসহ অত্যর তাত্ত্বিকবৃন্দ তাদের নিজের সৃষ্টিকে সুনির্দিষ্ট একটি ফ্রেমে আবদ্ধ করতে চেয়েছেন। তারা ‘পারসোনাল সিনেমা’ নামে বিষয়ের অবতারণা করেন। ১৯৪৮ সালে আলেকজেন্ডার আস্ত্রুক ‘দ্য বার্থ অব নিউ এভান্ট-গ্রান্ড দ্য : ক্যামেরা স্টাইল’ প্রবন্ধটি জিবি পার্সোনাল সিনেমা ভাবনার পেছনে কাজ করেছে।
অত্যর তাত্ত্বিকগণ তাদের ধারণাগুলোকে শক্তিশালী সমর্থন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং সমালোচনাত্মক লেখনী থেকে সিনেমার প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। নির্মাতা জ্য লুক গদার এ সম্পর্কে বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ২য় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত হলিউডের স্টুডিও নির্ভর ছবিগুলো রাজত্ব করেছে কিন্তু পরবর্তীতে ব্যর্থ হচ্ছিল, সে সময়টা অত্যরবাদীদের চলচ্চিত্র জায়গা করে নেয়। এ সময়টাতে চলচ্চিত্র প্রদর্শন সেন্সরশিপ রেগুলেশনের ওপর আমেরিকার প্রোডাকশন কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এবং বিষয়গুলো আরও স্বাধীন হয়।
অত্যরবাদ চলচ্চিত্র তত্ত্বে একটি সমালোচনাত্মক ও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। এটি সমালোচনা ও আর্টের মধ্যে পার্থক্যকে বাতিল করে দেয়। অত্যরবাদ ইতিহাসের স্বার্থেও চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ১৯৫০-এর দশকে কাইয়ে দু সিনেমা নামক পত্রিকায় যা উল্লিখিত। পত্রিকায় ফ্রেঞ্চ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, আধুনিকতাবাদ, নিউরিয়ালিজমে এর বৃহৎ প্রেক্ষাপটে সময় ও স্থানভেদে লেখকদের মতামত বিতর্ক স্থান পায় পত্রিকাটিতে। পত্রিকাটি চলচ্চিত্র ফিনোমেনোলজি ও সেমিওটিসের ওপর কিছু তত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করে এবং চলচ্চিত্রর জরা ও স্টার বিষয়ক চমৎকার প্রবন্ধ উপস্থাপন করে পাঠকদের জন্যে। প্রবন্ধের রচনাগুলোয় সাহিত্যের চলচ্চিত্র আর্ট সম্পর্কে প্রথাগত সস্তা ধ্যান-ধারণা, বড় বাজেট, বড় স্ক্রিনের অতি রঞ্জিত চলচ্চিত্রগুলোর বিপরীতে কম বাজেটের সিনেমার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে।
১৯৬০-এর দিকে ইলেকট্রনিক যোগাযোগ মাধ্যমের আশীর্বাদ দর্শকশ্রেণি নকল, অলিক ও পুনরায় উৎপাদিত গণসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হতে থাকল। যদিও এ সময় উত্তর আধুনিকতাবাদ দ্বারা নুভেল ভাগ প্রভাবিত হয় তবুও এই ভাবধারা রোমান্টিকতা ও নির্দিষ্ট সমালোচনাত্মক আধুনিকতা ভাবধারাটি বজায় রেখেছিল। ১৯৬০-এর দশকেই অত্যরবাদ ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের যে সময়কার সবচেয়ে বিখ্যাত সব সমালোচক যারা ছিলেনÑ রবিন উড, রেমন্ড ডুগনাট, ভিক্টর পাকিনস, পিটার উলেন, ডেভিট থমসন প্রমুখকে প্রভাবিত করেছিল অত্যর তত্ত্ব। আমেরিকাতেও এর প্রভাব পড়ে। ১৯৬০-এর দিকে নিউইয়র্কে ফিল্ম কালচার নামক সামায়িকীতে আভাগার্দ ফিল্ম নির্মাতা জন মেকস অত্যরবাদী চলচ্চিত্র সমালোচনার জন্যে জায়গা করে দেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অত্যরবাদ
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পে গুণগত মান যেমনই হোক প্রত্যেক বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। নতুন নতুন নির্মাতার চলচ্চিত্র নিয়ে নানা নিরীক্ষা করছেন। চলচ্চিত্র নিয়ে রিভিউ, গবেষণা, আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠছে নিয়মিতই। বাংলাদেশের সবাক চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৬ সালে আবদুল জব্বার খান নির্মিত ‘মুখ ও মুখোশ’-এর মাধ্যমে। দেশের প্রথম প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইকবাল ফিল্মস-এর ছবি মুখ ও মুখোশ যখন নির্মিত হয় তখন পর্যন্ত এদেশে কোনো স্টুডিও ছিল না। সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ১৯৫৭ সালে ০৩ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এফডিসি থেকে নির্মিত প্রথম ছবি ফতেহ লোহানীর ‘আসিয়া’। পরবর্তীতে ষাটের দশক, সত্তরের দশক, আশির দশক, নব্বইয়ের দশক, শূন্য ও একবিংশ শতক। সময়ের আবর্তে এদেশের চলচ্চিত্র নানা রূপ পরিগ্রহ করেছে এবং যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সার্বিক মান নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন থেকে গেছে।
আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে অত্যরবাদের প্রসঙ্গ আলোচনা করলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি মেধাবী নির্মাতা জহির রায়হান। অবশ্য নির্মাতা আলমগীর কবির, আমজাদ হোসেন, সুভাষ দত্ত, তারেক মাসুদ তাদের কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে নিজস্বতা তৈরি করতে পেরেছেন। বিভিন্ন অনুরণের সৃষ্টি করবে, ততদিন পর্যন্ত একই যুগে একই শিল্পী বিভিন্ন ভাষায়, বিভিন্ন পোশাকে আত্মপ্রকাশ করতে বাধ্য। চলচ্চিত্র অধ্যয়নে অত্যর তত্ত্ব শিল্পীর মনে বিভিন্ন অনুরণের প্রতিফলিত হওয়ার কথাই বলে।
লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস ঝুমা (জনসংযোগ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট)