কক্সবাজারে টানা ভারী বর্ষণে পাঁচটি স্থানে পাহাড়ধসে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কক্সবাজারে টানা ভারী বর্ষণে পাঁচটি স্থানে পাহাড়ধসে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনা আবারও আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। পাহাড়ধস আমাদের দেশে অনেকটা নিয়মিত দুর্যোগ। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই পাহাড়ধসের খবর আসে, প্রাণ ঝরে, অসংখ্য পরিবার স্বজনসহ সর্বস্ব হারায়।
সংবাদ মাধ্যমে খবর হয়, আলোচনা হয়। এমন করুণ মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় তা নিয়ে সরব হয় সবাই। কিন্তু বছর ঘুরে সে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগেÑ আর কত প্রাণহানি হলে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে?
গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এই পাহাড়ধসের খবরটি প্রকাশিত হয়। এটি শুধু দুর্ঘটনার খবরই নয়। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্বহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতার উদাহরণও বটে। দুঃখজনক সত্য হলো, পাহাড়ধসে অধিকাংশ মানুষ রাতে ঘুমের ঘোরেই মৃত্যুর মুখে পতিত হনÑ যখন তাদের আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ থাকে না। এই মর্মান্তিক ঘটনা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। বিপদের আঁচ আগে থেকে জানা গেলেÑ হয়তো এই মানবিক ক্ষতি এড়ানো যেত। উল্লেখ প্রয়োজন, প্রতিদিনের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যচিত্রের ভিত্তিতে ২০ জুন ‘পাহাড়ের বসতি ঘিরে ভয়’ শিরোনামে পাহাড়ধসের ভয়াল অতীত ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে একগুচ্ছ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সে সময় প্রতিবেদকের কাছে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, এবার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত পরশুর পাহাড়ধসের ভয়াবহতা বলছে ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্য মতে, যদি উদ্যোগই নেওয়া হয়, তা হলে পাহাড়ধসে প্রাণনাশ হলো কেন?
দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে, কক্সবাজারে পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় বসবাসকারী নিম্ন-আয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। জীবিকার তাগিদে এবং নিরাপদ আবাসনের অভাবে তারা বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাস করে। প্রশাসন প্রায় প্রতিবছরই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে মানুষকে সরে যেতে অনুরোধ করে। কোথাও কোথাও উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালিত হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই আবার সেই একই জায়গায় ফিরে আসে। ফলে সতর্কবার্তা কার্যকর হয় না। আমরা সম্পাদকীয় স্তম্ভে অনেকবার এ মানবিক সমস্যার কথা তুলে ধরে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এদিকে দৃষ্টি দেওয়ার মতো সময় সরকারের নেই। সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, শুধু মাইকিং বা নোটিস দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। একই সঙ্গে অবৈধভাবে পাহাড় কাটা এবং দখলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া জরুরি। প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় যারা পরিবেশ ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন অক্ষুণ্ন রাখা, বৃক্ষরোপণ বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
প্রতিটি প্রাণহানি কেবল একটি সংখ্যা নয়Ñ এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ। তাই পাহাড়ধসকে মৌসুমি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা, পরিবেশ ধ্বংস এবং দারিদ্র্যের সম্মিলিত বিষময় ফল। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবিদ, উন্নয়ন সংস্থা এবং সাধারণ মানুষÑ সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কেবল ত্রাণ ও সহায়তা প্রদান করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অবশ্য ঘটনার পর কক্সবাজার জেলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্টদের মাঠপর্যায়ে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের এই আপাত উদ্যোগ সাংবৎসরিক এই দুর্ঘটনার সমাধান হতে পারে না। আমরা মনে করি, দুর্ঘটনা-প্রাণহানির পর কেবল ত্রাণ তৎপরতা যথেষ্ট নয়, বরং এমন দুর্ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সরকারের উচিত সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া। ঝুঁকিপূর্ণ বসতি উচ্ছেদে এবং নিরাপদ পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবানুগ পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সমস্যা যে তিমিরে আছে, সে তিমিরেই থেকে যাবে।
যেহেতু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে, ফলে ভবিষ্যতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক করতে হবে। আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর, পাহাড় কাটা কঠোরভাবে বন্ধ করা এবং বন সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতন করতে হবে। মানুষের জীবন রক্ষা করাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
প্রতিবার পাহাড়ধস ও তাতে প্রাণহানির পর সেটাকে প্রকৃতির সতর্কবার্তা বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু সে সতর্কবার্তা যে সরকার কিংবা স্থানীয় বসবাসকারী কাউকে মোটেই সতর্ক করতে পারে না, ফি-বছরের দুর্ঘটনাই তার প্রমাণ। বলাটা অসমীচীন নয়, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী বর্ষায় আবারও একই ধরনের শোকাবহ ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যেমন দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্টদের পরিপূর্ণ আন্তরিকতা নিয়ে এগোনো প্রয়োজন।