× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক রেল

আবদুল মুকতাদির মামুন

প্রকাশ : ৮ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: আবদুল মুকতাদির মামুন

গ্রাফিক্স: আবদুল মুকতাদির মামুন

মেট্রোরেলের হাত ধরে, আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে বাংলাদেশ বৈদ্যুতিক রেলের যুগে প্রবেশ করেছিল। তবে ঢাকা শহরে স্বল্প দূরত্বে বিদ্যুচ্চালিত মেট্রোরেল চালু করা সম্ভব হলেও, দেশব্যাপী বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৩,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথকে বৈদ্যুতিক রেল নেটওয়ার্কে রূপান্তর করা সম্ভব কি নাÑ এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা আগেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে।

আমরা ইতঃপূর্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে বুলেট ট্রেনের কথা শুনেছি। তবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ১১৩ কোটি টাকা খরচ হওয়ার পর জানা গিয়েছিল, অর্থায়ন জটিলতা ও বিনিয়োগ ফেরত না আসার সম্ভাবনায়, বুলেট ট্রেনের চিন্তা বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশে ‘বৈদ্যুতিক রেল চালু করা সম্ভব নয়’Ñ এমন কথা এখন পর্যন্ত শোনা যায়নি। বর্তমানে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, শ্র্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান ছাড়া এশিয়ার কোনো দেশে ডিজেল ইঞ্জিনচালিত রেল নেই। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তানও খুব কম সময়ের মধ্যেই বৈদ্যুতিক রেলের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে! এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে যখন বৈদ্যুতিক রেল আছে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত মাত্র চার মাস বয়সী সরকার ইতোমধ্যে রেলপথের উন্নয়নে একাধিক যুগান্তকারী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। দেশের সকল রেলপথকে ক্রমান্বয়ে বৈদ্যুতিক রেল নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা এই পরিকল্পনার অংশ। সুতরাং বাংলাদেশ রেলওয়ের বিদ্যমান রেলপথ এবং আগামীতে নির্মিতব্য সকল রেলপথ একদিন বৈদ্যুতিক রেল নেটওয়ার্কে রূপান্তর হবে বলে দেশবাসী আশা করে! কিন্তু সারা দেশের রেলপথকে বৈদ্যুতিক রেল চলাচলের উপযোগী করতে হলে আগে দেশের সবগুলো রেলপথকে ব্রডগেজে রূপান্তর করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে যেসব ডুয়েলগেজ ও ব্রডগেজ রেলপথ বিগত ২০০৩-২০২৫ সময়কালে তৈরি হয়েছে, সেসব রেলপথকে দ্রুততম সময়ে কীভাবে বৈদ্যুতিক রেলপথে রূপান্তর করা যায়, তার আর্থিক ও কারিগরি দিকসহ একটি ‍সংক্ষিপ্ত প্রস্তাবনা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো। 

বৈদ্যুতিক রেল আর ডিজেলচালিত রেলের মূল পার্থক্যটি এর লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনে। বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভ হলো এমন একটি রেল ইঞ্জিন, যা ডিজেল বা পেট্রোল ব্যবহার না করে সাধারণত ২৫ কেভি ভোল্টের ওভারহেড তার বা ক্যাটেনারি থেকে প্যান্টোগ্রাফের মাধ্যমে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে এবং এই বিদ্যুৎ, ইঞ্জিনের মধ্যে থাকা ট্রান্সফর্মারের মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে ভোল্টেজ কমিয়ে আনে। তারপর এই শক্তিকে একটি ইনভার্টারে পাঠানো হয়, যা চাকার এক্সেলের সাথে যুক্ত ট্রাকশন মোটরগুলোতে পাঠানো ভোল্টেজকে নিয়ন্ত্রণ করে। ট্রাকশন মোটরের সাথে সংযুক্ত গিয়ার এবং এক্সেল, লোকোমোটিভের চাকা ঘোরায়, যার ফলে লোকোমোটিভটি চলতে থাকে। একটি সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে লোকোমাস্টার বিদ্যুৎ প্রবাহকে প্রয়োজনমতো পরিচালনা করে ট্রেনের গতি, এক্সেলারেশন বা ত্বরণ এবং রিজেনারেটিভ ব্রেকিংকে সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। 

বাংলাদেশে আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে বৈদ্যুতিক রেল চালু করতে হলে নতুন ব্রডগেজ/ডুয়েলগেজ রেলপথের পাশে বিদ্যুতের খুঁটি বসিয়ে, ওভারহেড বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভ ও কোচ কিনতে হবে, বিদ্যমান রেল ও লোকোমোটিভ কারখানাগুলোকে বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভ কারখানায় উন্নীত করতে হবে এবং রেলকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও বৈদ্যুতিক রেল পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে হবে। রেলপথের পাশে ওভারহেড বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ ও রেল স্টেশনের একাধিক লুপ লাইনের জন্য মাল্টিপল বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ ব্যয়, ভোল্টেজ ভেদে ভিন্ন হয়। তবে ২২-৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ৪৫-৫০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে! ভারত ও চীনের বিভিন্ন ওয়ার্কশপে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভের প্রতি ইউনিটের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় গড়ে প্রায় ৩০-৩৫ কোটি টাকা হতে পারে! আর মালবাহী রেল বা ফ্রেইট ট্রেনের লোকোমোটিভের প্রতি ইউনিটের মূল্য হতে পারে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫-৩০ কোটি টাকা! 

ডিজেল লোকোমোটিভের তুলনায় বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভের পরিচালন ব্যয় অনেক কম। ৪ থেকে ৫ হাজার হর্স পাওয়ারের ডিজেলচালিত যাত্রীবাহী ট্রেনের লোকোমোটিভে প্রতি কিলোমিটার পথ চলার জন্য গড়ে ৪ থেকে ৬ লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। ডিজেলের বর্তমান বাজার মূল্য হিসেবে প্রতি কিলোমিটারে এর সম্ভাব্য খরচ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। পক্ষান্তরে, ৬ হাজার হর্স পাওয়ারের বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভে প্রতি কিলোমিটারে ১৫ থেকে ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হতে পারে। বিদ্যুতের বর্তমান মূল্য হিসেবে প্রতি কিলোমিটারে এর সম্ভাব্য খরচ দাঁড়াবে ২০০ থেকে ২৬০ টাকা।

বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভ রিজেনারেটিভ ব্রেকিং ব্যবহার করে, যা ট্রেন থামানোর সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে গ্রিডে ফেরত পাঠায়, এর ফলে ১৫-২০% শক্তি সাশ্রয় হয়। বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভে যন্ত্রাংশের পরিমাণ কম থাকার ফলে এর রক্ষণাবেক্ষণেও ডিজেল ইঞ্জিনের চেয়ে ৪০-৫০% খরচ কম হয়। বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভে ফুয়েল এফিসিয়েন্সি বা জ্বালানি সাশ্রয়, ডিজেল লোকোমোটিভের চেয়ে ৮০-৯০% বেশি। বৈদ্যুতিক লোকোমোটিভ, ওজনে হালকা, কারণ এতে বিশাল আকারের ইঞ্জিন নেই এবং হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল বহন করতে হয় না। ফলে এর গতি বেশি এবং তেল ব্যবহার হয় না বিধায় এটি পরিবেশবান্ধব। 

ওপরের আলোচনা থেকে বোঝা যায়, লোকোমোটিভের দাম এবং বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণে এককালীন স্থাপন ব্যয় বেশি হলেও, বৈদ্যুতিক রেলের পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ তুলানামূলকভাবে অনেক কম। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক রেল দ্রুতগতির হওয়ায় এটি সময় সাশ্রয়ী এবং পরিবেশ বিবেচনায় এটি একটি উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। সুতরাং, বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক রেল চালু করা হবে বর্তমান সময়ে একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। বর্তমানে ঢাকা থেকে খুলনা এবং যশোর পর্যন্ত যেহেতু উন্নত মানের রেলপথ ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে, সেহেতু বাংলাদেশ রেলওয়ে চাইলে দেশব্যাপী বৈদ্যুতিক রেল চালুর মহাপরিকল্পনার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে এই রেলপথগুলোতে বৈদ্যুতিক রেল চালুর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে।


লেখক: আবদুল মুকতাদির মামুন (কলাম লেখক ও উন্নয়ন গবেষক)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা