ফিরোজ আলম মিলন
প্রকাশ : ৯ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা। কমপক্ষে দশ বছর সাধনার পর জীবনের প্রথম সনদপ্রাপ্তির পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনের প্রথম বড় মাইলফলক হিসেবে এ পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
দীর্ঘদিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়ে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষা ক্যালেন্ডারে পরিবর্তনের অংশ হিসেবে জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বলা চলে, নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে আমাদের শিক্ষাকার্যক্রমকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং শিক্ষাবর্ষকে নিয়মিত করাই এর লক্ষ্য। তবে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজন করা হলে নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতার দিক থেকে বিশেষ একটি সময়। বছরের শেষ এবং নতুন বছরের শুরুতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক পরীক্ষা, ফলাফল প্রস্তুতি, ভর্তি, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কার্যক্রম চলে। এ সময় এসএসসি পরীক্ষার মতো বৃহৎ আয়োজন যুক্ত হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের জন্যও এটি একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে আমাদের দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে শীতকাল বিরাজ করে। উত্তরাঞ্চল, হাওর এলাকা এবং নদীবেষ্টিত অঞ্চলে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীত শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অনেক শিক্ষার্থীকে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হয়। ভোরবেলায় ঘন কুয়াশার কারণে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং পরিবহন চলাচলও ব্যাহত হয়। ফলে পরীক্ষার্থীরা সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছতে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন হয়। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পরীক্ষা নেওয়া হলে পাঠ্যক্রম শেষ করা, পুনরাবৃত্তি ক্লাস, মডেল টেস্ট এবং প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম পরিচালনার সময় কমে যেতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা কারণে পাঠদান কার্যক্রম নির্ধারিত গতিতে সম্পন্ন হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে বিভিন্ন জাতীয় দিবস, বিজয় দিবস উদযাপন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক কার্যক্রম থাকে। এসব কর্মসূচির সঙ্গে পরীক্ষার সময়সূচির সমন্বয় করা কঠিন হতে পারে। একই সময়ে প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি কার্যক্রম। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে পরীক্ষা হলে ফলাফল প্রকাশ, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি এবং নতুন শিক্ষা কার্যক্রমের সময়সূচি নতুনভাবে সাজাতে হবে। পরিকল্পনায় সামান্য ত্রুটি থাকলেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে কলেজে ভর্তিপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হলে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষের ওপরও এর প্রভাব পড়বে। শিক্ষকদের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বছরের শেষ সময়ে বিদ্যালয়ের একাডেমিক মূল্যায়ন, প্রশাসনিক প্রতিবেদন প্রস্তুত, বিভিন্ন সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং নতুন বছরের পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ থাকে। এর সঙ্গে পাবলিক পরীক্ষার দায়িত্ব যুক্ত হলে তাদের ওপর অতিরিক্ত কর্মচাপ সৃষ্টি হবে। এতে শিক্ষাকার্যক্রমের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিভাবকদের জন্যও ডিসেম্বর-জানুয়ারির সময়টি আর্থিকভাবে সংবেদনশীল। বছরের শেষ এবং নতুন বছরের শুরুতে অনেক পরিবারকে বিভিন্ন ব্যয় বহন করতে হয়। নতুন বই, পোশাক, শিক্ষা উপকরণ এবং অন্যান্য পারিবারিক খরচের সঙ্গে পরীক্ষা সংক্রান্ত ব্যয় যুক্ত হলে অনেক পরিবার অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ, বিতরণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়। বছরের শেষ সময়ে সরকারি অফিসগুলোতে বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম ও আর্থিক হিসাবনিকাশ চলে। ফলে পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
তবে এটিও সত্য যে, ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজনের কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষাবর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি, ফলাফল দ্রুত প্রকাশ এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাবর্ষে যে অনিয়ম ও সেশনজট তৈরি হয়েছে, তা দূর করার ক্ষেত্রেও এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এসব সম্ভাব্য সুফল অর্জনের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সক্ষমতা।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সময় পরিবর্তন করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। শিক্ষাবর্ষের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, পাঠ্যক্রম যথাসময়ে সম্পন্ন করা, শিক্ষক সংকট দূর করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পরীক্ষাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় সময়সূচি পরিবর্তনের সুফলের চেয়ে সমস্যাই বেশি প্রকট হতে পারে।
ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে শিক্ষাবর্ষকে নিয়মিত করার সুযোগ সৃষ্টি হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রশাসনের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সহায়ক, কার্যকর এবং মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা। তাই এসএসসি পরীক্ষার সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাস্তবতা, সক্ষমতা, মানসিক উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করাই যক্তিযুক্ত।
লেখক: ফিরোজ আলম মিলন (সাংবাদিক ও কলাম লেখক)