শাহাব উদ্দিন মাহমুদ। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভঙ্গুর মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে ইরান ও পাকিস্তানের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক সর্বদাই এক জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সংঘটিত একটি সুপরিকল্পিত ও ব্যর্থ গুপ্তহত্যা মিশন এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন করে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়েছে।
মার্কিন সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা ভেস্তে দিতে ইরানের উচ্চপর্যায়ের দুই প্রধান আলোচকÑ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে লক্ষ্য করে এই হামলাটি পরিচালনা করতে চেয়েছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। মিশনটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হলেও এটি তেহরান ও ইসলামাবাদের সম্পর্কে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তা কেবল আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই বিঘ্নিত করছে না, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা ও দায়বদ্ধতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে ইরানের শীর্ষ আলোচক দলের একটি অতি সংবেদনশীল ও গোপন শান্তি সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ১২ দিনের যুদ্ধ ও তীব্র আঞ্চলিক উত্তেজনার পর এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল, যার মূল চালিকাশক্তি ছিলেন ইরানের এই দুই শীর্ষ কূটনীতিবিদ।
বৈঠক শেষে ইরানি প্রতিনিধিদলটি যখন উড্ডয়ন করে তেহরানের উদ্দেশে ফিরছিল, ঠিক তখনই ইসরায়েলি বিমান হামলার সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হয়। ইরানি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানতে পারে যে, ইসরায়েলের দুটি যুদ্ধবিমান ইরাক সীমান্ত সংলগ্ন পশ্চিম দিক দিয়ে ইরানের আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করেছে এবং তাদের লক্ষ্যবস্তু মূলত স্পিকার গালিবাফকে বহনকারী বিমানটি। মাঝ-আকাশে এই মৃত্যু ফাঁদের কথা জানতে পেরে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে বিমানটিকে জরুরি ভিত্তিতে পাক-ইরান সীমান্তের সবচেয়ে কাছাকাছি শহর ইরানের মাশহাদে জরুরি অবতরণ করানো হয়। এরপর প্রতিনিধিদলের সদস্যরা অলৌকিকভাবে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে ফিরে সড়কপথে দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা ভ্রমণ করে তেহরানে পৌঁছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অপারেশনের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন ব্ল্যাক সিসন’। মোসাদের লক্ষ্য ছিল এমন একসময়ে ইরানের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের হত্যা করা, যখন তারা একটি সফল শান্তিচুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
মোসাদ এই অভিযানের জন্য একটি ত্রিমুখী কৌশল অবলম্বন করেছিল। প্রথমত, তারা ইসলামাবাদে ইরানি প্রতিনিধিদের হোটেলের ভেতরে এবং যাতায়াতের রুটে নিজস্ব লোকাল এজেন্ট বা ‘লজিস্টিক স্লিপার সেল’ সক্রিয় করেছিল। দ্বিতীয়ত, ইরানি বিমানটি আকাশে ওড়ার পর সেটিকে জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের বিমান নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়। তৃতীয়ত, পশ্চিম সীমান্তে যুদ্ধবিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল, যাতে বিমানটি ইরানের আকাশসীমায় ঢোকামাত্রই সেটিকে ভূপাতিত করে ঘটনাটিকে ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ বা ‘অজ্ঞাত হামলা’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। মোসাদ নিশ্চিত ছিল যে, এই দুই ব্যক্তিত্বের বিদায়ের পর ইরানের শাসনব্যবস্থা এবং পরমাণু কূটনীতি পঙ্গু হয়ে পড়বে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ইরানের নিজস্ব কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স এবং ব্যাক-চ্যানেল তথ্যের কাছে মোসাদের এই নিখুঁত চালটি মার খেয়ে যায়।
এই ব্যর্থ অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত চতুর এবং দ্বিপাক্ষিক স্বার্থের চূড়ান্ত প্রতিফলন। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রশাসন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের এই বৈঠক আয়োজন করেছিল। তারা চাইছিল ইরানের সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং জেডি ভ্যান্সের এই মিশন সফল হলে তা হতো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বিশাল কূটনৈতিক বিজয়।
কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বলয় এবং পেন্টাগনের একটি অংশ মোসাদের এই পরিকল্পনার কথা আগেই টের পেয়েছিল। সিআইএ জানতে পারে যে, মোসাদ মার্কিন প্রশাসনকে অন্ধকারে রেখেই এই হামলাটি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে, কারণ ইসরায়েল কোনোভাবেই ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তি চাচ্ছিল না। মার্কিন প্রশাসন আশঙ্কা করেছিল, তাদের মধ্যস্থতায় চলা বৈঠকের পর যদি ইরানি আলোচকরা নিহত হন, তবে আমেরিকার আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা চিরতরে ধ্বংস হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে এক অনিয়ন্ত্রিত মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা একটি মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে ব্যাক-চ্যানেলে ইরানকে এই আসন্ন হামলার সুনির্দিষ্ট সময় ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের মুভমেন্টের তথ্য দিয়ে সতর্ক করে দেয়। অর্থাৎ, মার্কিন প্রশাসন একাধারে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র হিসেবে ভূমিকা রাখলেও, নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও বিশ্বস্ততা বাঁচাতে শেষ মুহূর্তে মোসাদের মিশনটি নস্যাৎ করতে পরোক্ষ ভূমিকা পালন করে।
এই স্পর্শকাতর ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছেÑ ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত একটি হাই-প্রোফাইল মিশনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই হত্যা ছকের পেছনে পাকিস্তানের দায় কতটুকু? প্রথমত, উড্ডয়নের সময় চরম নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে ইরানের অনুরোধে পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ইরানি কনভয়ের বিমানগুলোকে সীমান্ত পর্যন্ত এসকর্ট বা নিরাপত্তা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। তা সত্ত্বেও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কীভাবে এই উড্ডয়নের নিখুঁত রিয়েল-টাইম ডেটা এবং প্রতিনিধিদলের ফেরার সময়সূচি ও গতিপথ ট্র্যাক করতে পারল, তা নিয়ে গভীর রহস্য ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের উচ্চ-নিরাপত্তা বলয় বা গোয়েন্দা বিভাগের ভেতরের কোনো অংশ থেকে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস না হলে মোসাদের পক্ষে এত নিখুঁত ট্র্যাকিং সম্ভব হতো না। পাকিস্তান তার আকাশসীমা এবং মাটিতে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকদের তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সক্রিয় সুন্নি চরমপন্থী গোষ্ঠী বা ডিপ স্টেইটের একটি অংশের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-বিরোধী শক্তির দীর্ঘদিনের প্রক্সি যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত পাকিস্তান অনেক সময়ই আন্তর্জাতিক মিত্রদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে নিজের সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে না। পাকিস্তানের মাটিতে বসেই এই কূটনৈতিক গতিবিধির ওপর নজরদারি করা হয়েছিল এবং সেই তথ্য বহিরাগত গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মোসাদের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়েছে, যা ইসলামাবাদের চরম অবহেলা ও দায়বদ্ধতার অভাবকে স্পষ্ট করে।
এই ব্যর্থ মিশনটিকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক দাবার চালের একটি অংশ। ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কা ছিল, এই আলোচনার মাধ্যমে ইরান যদি নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পায় তবে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ সুন্নি রাজতন্ত্রগুলোর আর্থিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এমতাবস্থায়, বহিরাগত শক্তির চাপ বা প্রলোভনে পড়ে পাকিস্তান নিজের অজান্তেই কিংবা পরোক্ষভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একটি ‘তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রে’ পরিণত হয়েছে। এই ঘটনার পর তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এক অভূতপূর্ব শীতলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেহরান এখন ইসলামাবাদকে আর কেবল একটি ‘অক্ষম প্রতিবেশী’ হিসেবে দেখছে না, বরং তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি সম্ভাব্য ‘তথ্য ফাঁসের উৎস’ হিসেবে বিবেচনা করছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত বাণিজ্য, চাবাহার ও গোয়াদর বন্দরের মধ্যকার কৌশলগত সহযোগিতা এবং প্রস্তাবিত গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প চিরতরে হিমাগারে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইরানের আলোচকদের হত্যার এই ব্যর্থ মিশনটি একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ বা সংঘাতের স্ফুলিঙ্গ হতে পারত। ইরানের নিজস্ব গোয়েন্দা তৎপরতা এবং মার্কিন প্রশাসনের সময়োপযোগী সতর্কবার্তার কারণে এই যাত্রা এক ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো গেছে। তবে এই শান্তি সাময়িক। পরবর্তীতে জুনে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন-ইরান ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এপ্রিলের এই ব্যর্থ হামলার ক্ষত দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কে রয়েই গেছে।
পাকিস্তানের উচিত ব্লেম-গেম বা দায় এড়ানোর চেনা কৌশল বাদ দিয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া। ইরানের সঙ্গে যৌথ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধি, নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মোসাদের স্থানীয় নেটওয়ার্ককে যারা সহযোগিতা করেছে তাদের খুঁজে বের করার মাধ্যমেই কেবল পাকিস্তান তার দায় থেকে আংশিক মুক্তি পেতে পারে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যে একটি স্থায়ী ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা রোডম্যাপ এখন সময়ের দাবি।
লেখক: শাহাব উদ্দিন মাহমুদ (কলাম লেখক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক)