× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বনাম দায়িত্বশীলতা

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১৩:০৪ পিএম

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। আর টেলিভিশনের টক শো সেই গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে যুক্তি, তথ্য ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বক্তব্য উপস্থাপন করেন অংশগ্রহণকারী বিশিষ্টজনেরা। 

আর সঞ্চালকের দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠান পরিচালনা করা। কিন্তু যখন টকশো জনমত গঠনের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান প্রচারের মাধ্যমে পরিণত হয়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিকÑ এটি কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাকি জনমতকে প্রভাবিত করার সুপরিকল্পিত প্রয়াস?

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন টেলিভিশন টকশো পর্যবেক্ষণ করলে একটি প্রবণতা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে- নির্দিষ্ট কয়েকটি মুখ প্রায় প্রতিদিনই একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে উপস্থিত হয়ে প্রায় একই ধরনের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করছেন। তাদের ভাষা, বিশ্লেষণের ধরন এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক আক্রমণ দর্শকদের মনে প্রশ্ন তৈরি করছেÑ এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে কি না।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই একটি অভিযোগ শোনা যাচ্ছেÑ কিছু সঞ্চালক ও টকশো বিশ্লেষক নাকি বিশেষ রাজনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবের অধীনে কাজ করছেন। এমনকি তাদের আর্থিকভাবে প্রভাবিত করার অভিযোগও বিভিন্ন মহলে উচ্চারিত হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়, বরং জনপরিসরে আলোচিত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেইÑ যখন একই ধরনের বক্তব্য ধারাবাহিকভাবে একই ব্যক্তিদের মুখে শোনা যায় এবং নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুকে কেন্দ্র করেই আক্রমণ পরিচালিত হয়, তখন গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সন্দেহ তৈরি হওয়া অসংগত নয়।

বিশেষ করে জুলাই আন্দোলন ঘিরে কিছু টকশোতে যে ধরনের আলোচনা হচ্ছে, তা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের সংগঠকদের ভূমিকা কিংবা আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে তাদের ব্যক্তিগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা প্রকট। একইভাবে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নীতি বা সিদ্ধান্তের সমালোচনার পরিবর্তে কখনও কখনও ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণই আলোচনার মূল বিষয় হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমালোচনা আর অপপ্রচারের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে তা বিস্মৃত হওয়া ভালো লক্ষণ নয়। 

আরও একটি কৌশল প্রায়ই চোখে পড়ে। কিছু আলোচক নিজেদের নিরপেক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে দুয়েকটি ইতিবাচক মন্তব্য করেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে জুলাই আন্দোলন, আন্দোলনের নেতৃত্ব কিংবা বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনাকে সমালোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। এতে সাধারণ দর্শকের কাছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের আবরণ তৈরি করার চেষ্টা হয়। কিন্তু একটি বা দুটি প্রশংসাসূচক বাক্য কোনো বিশ্লেষককে নিরপেক্ষ প্রমাণ করে না। 

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের প্রাণ। এই অধিকার প্রশ্নাতীতভাবে রক্ষা করা উচিত। কিন্তু স্বাধীনতা কখনোই মিথ্যা তথ্য প্রচার, বিভ্রান্তি সৃষ্টি কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার লাইসেন্স হতে পারে না। মতামত ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু তথ্য কখনও ব্যক্তিগত হতে পারে না। তথ্যের একটি সত্যতা থাকে, যা যাচাইযোগ্য।

ইউরোপের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সেখানে সরকার, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপ্রধানকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা সম্পূর্ণ বৈধ। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে কারও সুনাম ক্ষুণ্ন করা, জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, নির্বাচন প্রভাবিত করার অপচেষ্টা চালানো কিংবা প্রতারণামূলক তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও একই সঙ্গে অন্যের অধিকার, জনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুরক্ষার জন্য আইনি সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি দিয়েছে।

জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাংবাদিকতার পেশাগত নৈতিকতা অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, একাধিক সূত্র নিশ্চিত করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং ভুল হলে দ্রুত সংশোধনী প্রকাশ করা সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করলে তারা শুধু দর্শকের আস্থা হারায়না, পরিস্থিতি অনুযায়ী মানহানি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত কিংবা আদালতের মুখোমুখিও হতে হয়। অর্থাৎ সেখানে বাক্‌স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতাÑ দুটিই পাশাপাশি চলে।

বাংলাদেশেও আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ঠিক সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। কারও মুখ বন্ধ করা নয়, বরং নিশ্চিত করা যে জনপরিসরে প্রচারিত তথ্য সত্যনিষ্ঠ, যাচাইযোগ্য এবং দায়িত্বশীল। কোনো মতের সঙ্গে দ্বিমত থাকতেই পারে। কিন্তু সেই দ্বিমত যদি মিথ্যা তথ্য, অর্ধসত্য কিংবা পরিকল্পিত বিভ্রান্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না; বরং দুর্বল করে।

টেলিভিশন কর্তৃপক্ষেরও আত্মসমালোচনার সময় এসেছে। একই কয়েকজন আলোচককে প্রতিদিন বিভিন্ন চ্যানেলে হাজির করে একঘেয়ে রাজনৈতিক বয়ান প্রচার করলে দর্শক বৈচিত্র্য থেকে বঞ্চিত হন। দেশে অসংখ্য শিক্ষক, গবেষক, আইনজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং তরুণ বিশ্লেষক রয়েছেন, যাদের অংশগ্রহণ আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে। মতের বৈচিত্র্যই গণতন্ত্রের শক্তি।

সঞ্চালকদের দায়িত্বও কম নয়। একজন দক্ষ সঞ্চালক কখনও আলোচনার পক্ষ হয়ে ওঠেন না। তিনি প্রশ্ন করেন, তথ্য যাচাই করেন, প্রয়োজন হলে অতিথির ভুল বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং দর্শকের পক্ষে দাঁড়িয়ে সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করেন। কিন্তু সঞ্চালক নিজেই যদি একটি নির্দিষ্ট বয়ানের অংশ হয়ে যান, তাহলে টক শো আর মুক্ত বিতর্কের মঞ্চ থাকে না; সেটি ধীরে ধীরে প্রচারণার প্লাটফর্মে পরিণত হয়।

আজ বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা নয়; বরং স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, সত্যনিষ্ঠা এবং পেশাগত নৈতিকতার সমন্বয় ঘটানো। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবে, কঠোর সমালোচনা থাকবে, তীব্র বিতর্কও থাকবে। কিন্তু সেই বিতর্কের ভিত্তি হতে হবে তথ্য, যুক্তি এবং সততা।

কারণ গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের মুখপাত্র হওয়ায় নয়; সত্যের প্রতি অবিচল থাকার মধ্যেই তার মর্যাদা। আর সেই মর্যাদা রক্ষা করতে না পারলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণ, দুর্বল হয় গণতন্ত্র এবং হারিয়ে যায় গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা।


লেখক: হাবিব বাবুল (জার্মানিভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা