× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নব পর্যায়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

রিয়াজুল ইসলাম

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১২:৫২ পিএম

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১২:৫৩ পিএম

গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

চীনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ-সম্পৃক্ততা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সরকারি সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সংবাদ শিরোনামে প্রাধান্য পেয়েছে, বাস্তবে এই সফরটি কেবলমাত্র একটি সাধারণ কূটনৈতিক আয়োজন ছিল না। এই সফর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বকে তুলে ধরেছে এবং একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক উপস্থিতি আরও সুসংহত করার আগ্রহকে স্পষ্ট করেছে। বর্তমান বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলার পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক শক্তি প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরকে সংযুক্তকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূকৌশলগত অবস্থানে অবস্থান করছে।

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ ও চীন তাদের সম্পর্ককে একটি পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে উন্নীত করেছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তার অন্যতম প্রধান উৎস। চীনের জন্য বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য চীন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও বৃহৎ বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করছে, যা শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে পারে।

সফরে স্বাক্ষরিত ১৩টি সমঝোতা স্মারকের প্রধান ক্ষেত্রসমূহ হলোÑ- বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতাÑ, আনোয়ারা ও  মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন, সবুজ উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দীর্ঘমেয়াদি যৌথ কর্মপরিকল্পনা, চীনের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানি, ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, গণমাধ্যম তথ্য বিনিময়, সম্প্রচার প্রযুক্তি ও সহযোগিতা, গবেষণা ও মিডিয়া পার্টনারশিপ

এই চুক্তিগুলো মূলত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং প্রযুক্তি সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে, সামরিক বা নিরাপত্তা খাতে নয়।

এই চুক্তিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারে। চীনা বিনিয়োগ শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। আনোয়ারা ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়াবে এবং বৈশ্বিক উৎপাদন নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের সংযোগ আরও গভীর করবে। একই সঙ্গে চীনা বাজারে কৃষিপণ্যের প্রবেশাধিকার এবং প্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানিতে সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, ঋণ ব্যবস্থাপনার সতর্কতা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতার বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত আলোচ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর। এই প্রস্তাবিত করিডোর চীনের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি নতুন অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে। তবে এর বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মিয়ানমারের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিশেষ করে রাখাইন অঞ্চলের সংঘাত। চলমান গৃহযুদ্ধ, নিয়ন্ত্রণহীন নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি এই করিডোর বাস্তবায়নকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে এটি দীর্ঘমেয়াদে সম্ভাবনাময় হলেও স্বল্পমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য নয়।

ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এই সফরকে কৌশলগত সতর্কতার দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছে। বিশেষ করে মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, তিস্তা নদী প্রকল্পে সহযোগিতা এবং প্রস্তাবিত করিডোর নিয়ে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের মধ্যে মনোযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই করিডোর চীনের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে পারে এবং বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। তবে একই সঙ্গে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, প্রতিযোগিতার পরিবর্তে ভারতের উচিত বাংলাদেশের সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ সহযোগিতা জোরদার করা।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ কোনো একক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। চীনের বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে হবে, তবে তা হতে হবে স্বচ্ছতা, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, আসিয়ান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে হবে।

বাংলাদেশ-চীন সাম্প্রতিক শীর্ষ বৈঠক কেবল ১৩টি সমঝোতা স্বাক্ষরের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূকৌশলগত গুরুত্বের প্রতিফলন। সঠিক নীতি, স্বচ্ছ বাস্তবায়ন এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির মাধ্যমে এই উদ্যোগগুলো বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন, লজিস্টিকস এবং সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তবে এই অগ্রযাত্রার সাফল্য নির্ভর করবে সুদৃঢ় শাসনব্যবস্থা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের ওপর।


লেখক: রিয়াজুল ইসলাম (সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও কূটনীতিক)


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা