গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে পরিচয় দিতে নিকট প্রতিবেশী ভারতের ব্যর্থতা নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন সময়ে দেশটি সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের অনভিপ্রেত আচরণ ও কর্মকাণ্ডে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও এর জনগণের চেয়ে একটি বিশেষ দলের সঙ্গে বন্ধুত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।
আর সেজন্য যখনই সেই বিশেষ দলটি রাজনৈতিক কারণে বেকায়দায় পড়েছে কিংবা গদিচ্যুত হয়েছে, ভারত কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সমস্ত সীমানা লঙ্ঘন করে দলটিকে সমর্থন ও আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। এমনকি দলটি যাতে গদি না হারায় সেজন্য এদেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতেও দ্বিধা করেনি। দলটির প্রতি ভারতের প্রেম এতটাই কঠিন যে, তাদেরকে ক্ষমতায় রাখতে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি চোখ বুজে উপেক্ষা করে সে দেশের পররাষ্ট্র সচিব চলে এসেছিলেন বাংলাদেশে। সমস্ত রাজনৈতিক দলের বর্জনের মুখে জাতীয় পার্টিকে সে নির্বাচনে অংশ নিতে দলটির প্রধান এইচ এম এরশাদকে নজিরবিহীন চাপ দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে।
শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে নাক গলানো নয়, বাংলাদেশে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনাকারী অপশক্তিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও অস্ত্র সহায়তা দেওয়ার নজিরও রয়েছে ভারতের। ১৯৭৫ সালে সেনা অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান নিহত ও তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কথিত ‘কাদেরিয়া বাহিনী’কে সর্বতোভাবে সহায়তা দিয়েছিল বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে। তবে বাংলাদেশ সরকারের দৃঢ়তা ও শক্তিশালী সীমান্তরক্ষা ব্যবস্থার কারণে দুর্বৃত্ত বাহিনী বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। একইভাবে পার্বত্যাঞ্চলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী তথাকথিত শান্তিবাহিনীকে ট্রেনিং, অস্ত্রশস্ত্র, রসদ সরবরাহ করেছে ভারতÑ এ অভিযোগ এখন প্রতিষ্ঠিত।
তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে লীগ সরকারের পতন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে সেদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে ভারত পুনরায় একই আচরণ করছে। গতকাল একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসিনা সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত তিনজন বাংলাদেশি সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে ভারত সরকার অত্যন্ত যত্ন সহকারে সেদেশে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। এই সেনা কর্মকর্তারা হলেনÑ লে. জেনারেল মো. মুজিবুর রহমান (বরখাস্ত), লে. জেনারেল মো. আকবর হোসেন (অব.) এবং মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ। এই তিন সেনা কর্মকর্তা শেখ হাসিনার দুঃশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিলেন। তারা কর্মরত থাকা অবস্থায় গুম, খুন ও নির্যাতনের দ্বারা জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছেন। চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের পর এরা ভারতে আশ্রয় নেয়। এতদিন তারা পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার সল্টলেক ও নিউ টাউনের মতো অভিজাত এলাকায় শানশওকতের সঙ্গেই বাস করছিলেন। সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, সম্প্রতি ভারত সরকার বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া এই তিন মানবতাবিরোধী অপরাধীকে বেসামরিক এলাকা থেকে সরিয়ে হুগলি ব্রিজ সংলগ্ন সুরক্ষিত সেনা আবাসিক এলাকায় থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পত্রিকাটি আরও জানিয়েছে, এই সাবেক তিন সেনা কর্মকর্তা পলাতক ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। শুধু তাই নয়, এরা ভারতে পালিয়ে থাকা পতিত লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি ও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করার ছক কষছেন। খবরটি সঙ্গত কারণেই দেশবাসীকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
কেননা, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বৈরী আচরণের বিষয়টি কারও অজানা নেই। পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে যখন বিশ্বের কোনো রাষ্ট্র আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি, তখন ভারত তাকে সাদরে গ্রহণ করে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। একই সঙ্গে কোনোরকম পূর্বঘোষণা ছাড়াই ভারত সেদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদান বন্ধ করে দেয়। ভারতের এই অমানবিক সিদ্ধান্ত সেদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যেতে আগ্রহী ও চিকিৎসা গ্রহণরত রোগীদের মারাত্মক বিপাকে ফেলে। একজন মানবতাবিরোধী দুঃশাসককে বিতাড়নের ‘অপরাধে’ বাংলাদেশের অসুস্থ মানুষদের প্রতি ভারতের এই নিষ্ঠুর আচরণ কোনো বিচারেই গ্রহণীয় হতে পারে না। যদিও প্রায় দুই বছর পরে অতি সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া পুনরায় শুরু করেছে।
গত মাসে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার নিযুক্ত হয়ে এসে দীনেশ ত্রিবেদী ‘এক আকাশ, এক জল, এক বাতাস’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় উন্নীত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। আমরাও আমাদের সম্পাদকীয় স্তম্ভে তার সে আশাবাদকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। আমরা মন্তব্য করেছিলাম, বাংলাদেশের জন্মলগ্নের বন্ধু ভারত এমন কোনো আচরণ বা কর্মকাণ্ড যেন না করে, যাতে পুরনো এই বন্ধুরাষ্ট্রটিকে বিশ্বাস করতে বাংলাদেশের জনগণের কষ্ট হয়। কিন্তু পলাতক ও ওয়ারেন্টভুক্ত দুষ্কৃতকারীদের ভারত সরকার কর্তৃক জামাই আদরে রাখার খবর আমাদেরকে হতাশ ও উদ্বিগ্ন না করে পারে না। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্ব তখনই স্থায়ী হতে পারে, যখন একে অপরের বিশ্বস্ততা অর্জন করতে পারে। কেননা, মুখে মধু আর অন্তরে বিষ নিয়ে কখনও বন্ধুত্ব করা যায় না।
আমরা ঢাকাস্থ হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাতে চাই, এদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করার জন্য। একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনা ও তার সব সঙ্গীকে অবিলম্বে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি জানাই।