নূরুদ্দীন দরজী
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
ফাইল ফটো
কল্পনার রঙিন রথে চড়ে প্রযুক্তির উন্নয়ন করে চীন এখন আকাশছোঁয়া। প্রযুক্তি তথা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চীনকে সামরিক শক্তিতেও বলিয়ান করে তুলেছে। সবকিছুতেই চীন এখন বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তি।
অনেক আগে নেপোলিয়ন বলেছিলেন, ‘চীন একটি ঘুমন্ত দৈত্য! তারা যখন ঘুম থেকে জেগে উঠবে গোটা পৃথিবী নাড়িয়ে দিবে।’ চীন এখন আর ঘুমিয়ে নেই। জেগে উঠেছে উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে এবং বিশ্বজুড়ে। তারা বাড়ি বাড়ি উৎপাদনের কারখানা গড়ে তুলেছে।
মাত্র ৮০/৯০ বছর আগে যে জাপান চীন দখল কর মেরুদণ্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল, লাখ লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছিল, সেই চীন আজ জাপানের মতো অনেক দেশকে নিয়ে ভ্রুক্রুটি করে। চীনারা জাপান, জার্মানির মতো দেশের প্রযুক্তিগুলোকে নিজেদের আয়ত্তে এনে কৌশলে নবতর রূপ দিয়ে বিশ্বের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁডিয়েছে। এখন চীনকে বলা হয়, ‘ওয়াল্ড ফ্যাক্টরি’।
চীনাদের বিস্ময়কর উন্নয়নের পিছনে আদর্শ শিক্ষা, পরিশুদ্ধ সাধনা ও একাগ্ৰতা ছিল। তারা তাদের মনীষীদের দেখানো পথে চলা পথিক। এ প্রসঙ্গে দার্শনিক কনফুসিয়াসের দর্শন ও শিক্ষার কথা স্মরণীয়। চীনা সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি রচিত রয়েছে কনফুসিয়াসকে কেন্দ্র করে। তার দর্শন চীনের মানুষকে বহুগুণে প্রভাবিত করেছে। অন্যদিকে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ভিত্তি রচনা করেছেন সর্বোচ্চ নেতা দেং জিয়াওপিং। বিগত সত্তর দশকের শেষ দিকে দেং জিয়াওপিং-এর ‘সংস্কার এ উন্মুক্তকরণ নীতির পথে হেঁটে চরম শিখরে আরোহণ করে তারা।
বর্তমান সময়ে সেই একই পথে চলার দায়িত্ব নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তার মহাকাশ গবেষণা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও সুপার কম্পিউটারের মতো আধুনিক প্রযুক্তি বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রকেট প্রযুক্তি ও হুয়াওয়ে টেলিকমের অগ্ৰযাত্রা চমক দেখিয়ে চলছে। চীনাদের প্রযুক্তিগত ব্যাপক উন্নয়নের আরও একটি সুকৌশলী বড় দিক হচ্ছে, একটি সময় বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার জন্য বিদেশি কোম্পানির ট্যাক্স ফ্রি করা হয়েছিল। এ সুবিধা পেয়ে প্রযুক্তিতে উন্নত বহু দেশ চীনে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে।
বিদেশি ফ্যাক্টরিগুলো অতি উন্নত মানের প্রোডাকশন করতে থাকে। আর চীনা নেতৃত্ব নিজেদের জনশক্তি কাজে লাগিয়ে বিদেশি স্পেশিফিকেশন নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ করে কাজের মতো কাজ করে। অর্থাৎ বিদেশি মালামালের মতো চীনারা নিজেদের শ্রমিক দিয়ে কম খরচে ওই সমস্ত মালামাল তৈরি করে বাজারে কম মূল্যে ছেড়ে দেয়। তাদের কম মূল্যের দ্রব্য সামগ্ৰীর সাথে বিদেশি সামগ্ৰী প্রতিযোগিতায় হেরে যায়। আর চীনে উৎপাদিত মালে বিশ্ববাজার সয়লাব হয়ে যায়, যা এখনও টিকে আছে। বড় বড় দেশগুলোও পাল্লা দিয়ে উঠতে পারছে না।
১৯৭৫ সাল থেকে চীনাদের সাথে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। চীন আমাদের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও শিল্পে সহযোগিতা করে আসছে। তাদের সাথে রোলওভারে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন চলছে। অতি সম্প্রতি আমাদের প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করে আরও অনেক চীনা সহযোগিতার দ্বার উন্মোচন করেছেন।
যে চীনের কৃষিই ছিল একমাত্র প্রধান ভরসা, সে চীন আজ প্রযুক্তির ওপর ভর করে পৃথিবীর প্রায় এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিতেও পরিণত হয়েছে। তাদের মডিউলার প্রযুক্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশাল বিশাল অবকাঠামো তৈরি করে ফেলছে। এ পদ্ধতির ১৪টি প্রকল্প বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করে নিত্য নতুনভাবে সফলতা এনে দিচ্ছে। চীনারা এখন মাত্র ১৯/২০ দিনে ৫০/৬০ তলা ভবন নির্মাণ করতে পারে। মডিউলার পদ্ধতিতে কারখানায় নির্মাণ সামগ্ৰী তৈরি করে হাইড্রোলিক ক্রেনের সাহায্যে টেনে টেনে বড় করে ফেলে। লজিস্ট্রিক চেইনে পরিবহন করে ওপরে তুলে যথাস্থানে বসিয়ে দেয়। তাদের প্রধান স্ট্রাকচারাল মডিউলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র রয়েছে। অনুরূপ বহুবিধ পদ্ধতি এখন তাদের আয়ত্তাধীন।
চীন বিশ্বের সুপ্রাচীন সভ্যতার দেশ। মানব সভ্যতায় তাদের অবদান ৪টি মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। চীনারাই প্রথম কাগজ, মুদ্রণশিল্প, কম্পাস ও বারুদের মতো অতি প্রয়োজনীয় জিনিস আবিষ্কার করেছে। বিশ্ব প্রযুক্তির প্রধান সূতিকাগার চীন। অন্যদিকে প্রকৃতির উদার ও অবারিত দান, হোয়াংহো ও ইয়াংজে নদীর অববাহিকা চীনাদের সমৃদ্ধ করেছে সেই অতীতকাল থেকেই। বিশ্বের অনেক সভ্যতা যেখানে ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে রেশ মাত্র নেই সেখানে চীনা সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ভাষা এখনও একই ধারায় টিকে রয়েছে। মহাপ্রাচীর, লিখিত ইতিহাস গ্ৰন্থ, দার্শনিক ভিত, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যে বিশ্বাস তাদেরকে সভ্যতা ও উন্নয়নের পথে বহুদূর এগিয়ে নিয়েছে। চীনা মাটির পাত্র, চা, রেশম ফেং শুই ইত্যাদি পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। আলো ও অন্ধকার বিপরীতমুখী হলেও তাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিপূরক শক্তি।
এমন সভ্যতা ও উন্নত সংস্কৃতির দেশ হয়েও পৃথিবী নামক গ্ৰহে একমাত্র চীনকে ঐতিহাসিক ‘আফিম যুদ্ধ’ করতে হয়েছে। একসময়ে কৌশলে আফিম খাইয়ে বুঁদ বানিয়ে চীনের উন্নয়ন এ অগ্ৰগতিকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের দেশে জোর করে আফিম রপ্তানি করা হতো। আর এ কাজটি প্রধানত করত ব্রিটিশরা।
উল্লেখ্য যে, ব্রিটিশদের কলোনি ভারতের কৃষকদের জোর জবরদস্তি করে নীল চাষের মতো আফিম চাষ করার জন্যও বাধ্য করা হতো। আর সেই আফিম চীনে রপ্তানি করে তারা প্রচুর অর্থ কামিয়ে নিত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে উন্নত ও টেকসই চায়না সামগ্ৰী ব্রিটেনে খুবই জনপ্রিয়তা পায়। দ্রব্যের গুণগত মানের কারণে চীনারা ব্রিটেন থেকে কিছু বাড়তি অর্থনৈতিক সুবিধা পেত। কিন্তু সম্রাজ্যবাদী ও সুবিধাবাদী ব্রিটিশ বণিকদের তা সহ্য হচ্ছিল না। তারা চীনে আফিম সরবরাহের মতো অন্যায় ব্যবসা শুরু করে।
আফিমে আফিমে চীন ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে একটি সময়ে যুদ্ধের ডাক পড়ে। ওই যুদ্ধের নামই ঐতিহাসিক আফিম যুদ্ধ। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এমন দুইটি যুদ্ধ করেছে তারা। প্রথমটি বেধেছিল ১৮৩৯ সালে, যা প্রায় চার বছর স্থায়ী হয়। সেই যুদ্ধের সময় প্রায় বারো লাখ কেজি আফিম জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। ইতিহাসের প্রথম ওই আফিম যুদ্ধে চীনারা হেরে যায়। কিন্তু তারা সম্পূর্ণ রূপে দমে যায়নি।
১৮৫৬ সালে আবার দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের ডাক আসে। এ যুদ্ধে ব্রিটেনের সাথে ফ্রান্সও যোগ দেয়। দুর্ভাগ্য ক্রমে, এ যুদ্ধেও চীনারা পরাজিত হয়ে মারাত্মক লজ্জাজনক অবস্থায় পড়ে যায়। সর্বশেষ বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মাও সেতুং-এর আবির্ভাব হলে কঠোর অভিযানের মাধ্যমে তা চিরতরে নির্মূল হয়।
আবার দুই দুইটি আফিম যুদ্ধের পর চীনে গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। অধিকাংশ দেশবাসী তখনকার কিং রাজবংশের প্রতি মারাত্মকভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। গৃহযুদ্ধে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ নিহত হয়। মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘সংস্কৃতি বিপ্লব’। সবকিছু ভুলে গিয়ে মানুষ উন্নয়ন ও উৎপাদনে বিশেষ জোর দেয় । মাও সেতুংও কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি জোর দেন। বন্ধ করে দেওয়া হয় আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। সব স্কুল,কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়ে সকলকে হাতে-কলমে পারদর্শী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। উৎপাদন বৃদ্ধি ও ফসল রক্ষার জন্যে ক্ষতিকারক পোকামাকড় বিনষ্টের ওপর জোর দেওয়া হয়। এক আদেশে দেশের সব চড়ই পাখি, ইঁদুর, মশা ও মাছি নিধন করা হয়। অবশ্য এমন কাজের ফলে প্রকৃতি ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। অতর্কিত পঙ্গপালের সৃষ্টি হয়ে জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে। আবার পঙ্গপাল নিধন করতে হয়।
বর্তমানে চীনে ঈর্ষান্বিত অর্থনৈতিক সংস্কার, বিশাল কর্মীবাহিনী, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা ও বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ করে তারা সুপার পাওয়ার হিসেবে উদীয়মান। তাদের সামরিক সেক্টর বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী। সামরিক সৈন্য সংখ্যায় বিশ্বে প্রথম স্থান অধিকার করে আছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান, নৌবাহিনীর অত্যাধুনিকতা, প্রযুক্তি ও পারমাণবিক শক্তিতে চীন এখন বিশ্বের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। চীন মহাকাশ গবেষণায়ও পরাশক্তি।
চন্দ্রাভিযানেও কয়েকটি সাফল্য পেয়েছে। ভুপৃষ্ঠ থেকে চারশ কিলোমিটার ওপরে তারা নিজস্ব ‘তিয়াংগং মহাকাশ স্টেশন’ নির্মাণ করেছে। সবকিছুর বিবেচনায় বর্তমানে আমেরিকার পর দ্বিতীয় পরাশক্তির দেশ চীন। অনেকের ধারণায় সেদিন আর তেমন বাকি নেই যে, অচিরেই তারা এক নম্বর বিশ্বশক্তিতে পরিণত হবে। তাদের ক্রমবর্ধমান উন্নতিতে আতঙ্কিত হয়ে হোক কিংবা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে হোক আমেরিকাসহ অনেক দেশ উৎপাদন বৃদ্ধি করে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে চায়। এ প্রতিযোগিতা যদি বাস্তবসম্মত, বৈধভাবে ও হানাহানি মুক্ত হয় তা হবে বিশ্বমানবতারই উন্নয়ন। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের এমনি প্রত্যাশা।
লেখক: নূরুদ্দীন দরজী, কলাম লেখক ও সাবেক শিক্ষা অফিসার