× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ইমেইল থেকে

সাঁওতাল বিদ্রোহ: এক জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম

সংগ্রাম দত্ত

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

ঐতিহাসিক সাঁওতাল দিবস শুধু সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মৃতি নয়, এটি সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আত্মমর্যাদার ইতিহাসও স্মরণ করার দিন। ছবি: সংগৃহীত

ঐতিহাসিক সাঁওতাল দিবস শুধু সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মৃতি নয়, এটি সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আত্মমর্যাদার ইতিহাসও স্মরণ করার দিন। ছবি: সংগৃহীত

ঐতিহাসিক সাঁওতাল দিবস শুধু সাঁওতাল বিদ্রোহের স্মৃতি নয়, এটি সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আত্মমর্যাদার ইতিহাসও স্মরণ করার দিন। সেই ইতিহাসেরই এক উজ্জ্বল কিন্তু আজ প্রায় বিস্মৃত অধ্যায় জীবন সাঁওতাল।

শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ অঞ্চলের এই সাঁওতাল নেতা ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রাদেশিক পরিষদে (এমএলএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন। চা-বাগানের লেবার সরদার থেকে আইনপ্রণেতা হয়ে ওঠা তার জীবনগাথা আজও বাংলাদেশের চা-শ্রমিক আন্দোলন ও সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার পূর্বাশা আবাসিক এলাকার একটি শান্ত কোণে দাঁড়িয়ে আছে একটি সাধারণ বাড়ি। চারপাশে নতুন বসতি গড়ে উঠলেও বাড়িটি যেন এখনও বহন করে এক বিস্মৃত ইতিহাসের স্মৃতি। এই বাড়ির মালিক ছিলেন জীবন সাঁওতালÑ একসময়কার চা-বাগানের শ্রমিক, মাজডিহি চা-বাগানের সরদার, শ্রমিকনেতা এবং ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্য (এমএলএ)।

বাংলার চা-শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে তার নাম একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নাম হারিয়ে গেছে প্রায় বিস্মৃতির আড়ালে। জীবন সাঁওতালের জন্ম দক্ষিণ শ্রীহট্টের (বর্তমান মৌলভীবাজার) মাজডিহি চা-বাগানে। তিনি সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সন্তান। ব্রিটিশ আমলে বিহার ও ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে আনা হাজারো শ্রমিক পরিবারের মতো তার পরিবারও দারিদ্র্য, কঠোর শ্রম ও সামাজিক বঞ্চনার মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছে। চা-বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে খুব অল্প বয়স থেকেই জীবন সাঁওতাল নেতৃত্বের গুণাবলি দেখাতে শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি মাজডিহি চা-বাগানের সরদার হন। সাহস, সততা ও শ্রমিকদের প্রতি দায়বদ্ধতার কারণে তিনি দ্রুত শ্রমিকদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।

শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সরব হওয়ায় বাগান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার বিরোধ তৈরি হয়। শেষপর্যন্ত তাকে চাকরি হারাতে হয়। তবে চাকরি হারানো তার সংগ্রামকে থামাতে পারেনি। চাকরি হারানোর পর জীবন সাঁওতাল শ্রীমঙ্গলের পূর্বাশা এলাকায় জমি কিনে পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীকালে এই জমিই তার পরিবারের প্রধান আশ্রয় হয়ে ওঠে। তার একমাত্র ছেলে কৃষ্ণ সাঁওতাল বাবার মৃত্যুর পর জমিজমার দেখভাল করেন। সময়ের সঙ্গে কিছু অংশ বিক্রি হলেও কয়েক শতক জমি পরিবার ধরে রাখে। কৃষ্ণ সাঁওতাল ২০০৭ সালে এবং তার স্ত্রী ২০১৭ সালে মারা যান। বর্তমানে তাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিরা ওই বাড়িতেই বসবাস করছেন।

ভারত বিভাগের আগে চা-শ্রমিকদের সংগঠিত করার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জীবন সাঁওতাল। তৎকালীন কংগ্রেস নেতা পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত ও নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরীর সঙ্গে তিনি শ্রীহট্ট চা শ্রমিক ইউনিয়ন গঠনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।

১৯৪৮ সালের ৩ জুন কুলাউড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীহট্ট চা শ্রমিক ইউনিয়ন। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন সর্বভারতীয় কংগ্রেস ও শ্রমিকনেতা পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত। সহসভাপতি ছিলেন জীবন সাঁওতাল। সাধারণ সম্পাদক নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন দুর্গেশ দেব। এই সংগঠনই পরবর্তীকালে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন নামে পরিচিতি পায়। বর্তমানে দেশের কয়েক লাখ চা-শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করছে সংগঠনটি।

শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, মানবিক কর্মঘণ্টা, উন্নত আবাসন ও শ্রমিক সন্তানদের শিক্ষার দাবিতে সংগঠনটি আন্দোলন শুরু করে। জীবন সাঁওতাল ছিলেন সেই আন্দোলনের সামনের সারির অন্যতম নেতা।

১৯৪৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে আসাম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে অংশ নেন জীবন সাঁওতাল। শ্রীমঙ্গল আসন থেকে তিনি বিজয়ী হয়ে এমএলএ নির্বাচিত হন। চা-বাগানের শ্রমিক থেকে আইনপ্রণেতা হয়ে ওঠা সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় ছিল বিরল ঘটনা। আইনসভায় গিয়েও তিনি শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং প্রজন্মগত শ্রমদাসত্বের অবসানের দাবি তিনি ধারাবাহিকভাবে উত্থাপন করেন।

ভারত বিভাগের পর ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে আবারও নির্বাচিত হন। এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টে তিনি ছিলেন চা-শ্রমিক, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রতিনিধি।

১৯৬০ সালে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করলে চা-শ্রমিক আন্দোলনও বড় ধাক্কা খায়। জীবন সাঁওতাল ধীরে ধীরে জনজীবনের আড়ালে চলে যান। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অবদানও হারিয়ে যেতে থাকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কাছেও তার ছবি, ব্যক্তিগত দলিল বা পারিবারিক তথ্য সংরক্ষিত হয়নি বলে জানা যায়। বর্তমান নেতৃত্বের অনেকেই তার উত্তরসূরিদের অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত নন। জীবন সাঁওতালের জীবন শুধু একজন শ্রমিকনেতার গল্প নয়। এটি চা-বাগানের প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাস।

ঐতিহাসিক সাঁওতাল দিবসে জীবন সাঁওতালকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন নেতাকে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলাদেশের চা-শ্রমিক আন্দোলন, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। আজ তার নাম হয়তো খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের চা-শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে জীবন সাঁওতাল এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নামÑ যে অধ্যায় নতুন করে স্মরণ ও সংরক্ষণের দাবি রাখে।


লেখক: সংগ্রাম দত্ত (কলাম লেখক, সিলেট)


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা