ইমেইল থেকে
তানজিদ শুভ্র
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
বর্ষা এলেই দেশে শুরু হয় বৃক্ষরোপণের উৎসব। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, এমনকি ব্যক্তি উদ্যোগেও হাজার হাজার চারা রোপণ করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভরে ওঠে সবুজের বার্তায়। কোথাও এক লাখ, কোথাও ১০ লাখ গাছ লাগানোর ঘোষণা আসে। কিন্তু কয়েক মাস পর সেই চারাগুলোর কতটি বেঁচে থাকে? আরও বড় প্রশ্ন, এত গাছ লাগানোর পরও কি আমরা সত্যিই নতুন বন তৈরি করতে পারছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বোঝা যায়, বৃক্ষরোপণ আর বনায়ন এক বিষয় নয়। বৃক্ষরোপণ হলো একটি বা একাধিক গাছের চারা লাগানোর কাজ। অন্যদিকে বনায়ন হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিচর্যা এবং প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ বনজ বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলা। একটি বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; সেখানে থাকে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, কীটপতঙ্গ, ছত্রাক ও অণুজীব। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কই একটি বনকে জীবন্ত করে তোলে।
বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেনটরির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট ভৌগোলিক এলাকার মাত্র ১২.৮ শতাংশ বনাঞ্চল। নদী বাদ দিয়ে শুধু স্থলভাগ বিবেচনায় নিলে এই হার ১৪.১ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি মানুষের জন্য বনভূমির পরিমাণ মাত্র ০.০৩ একর। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় এটি অত্যন্ত কম। একই জরিপে আরও দেখা যায়, দেশে ৩৯০টি বৃক্ষ প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ বিদেশি প্রজাতি। দেশের মোট ভূমিস্থ বৃক্ষজৈব ভর প্রায় ৩৮৭ মিলিয়ন টন, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ কার্বন ভান্ডার হিসেবে কাজ করছে। অথচ ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষ আচ্ছাদন ৩.৪ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শালবনে, যেখানে বৃক্ষ আচ্ছাদন কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। পাহাড়ি বনেও কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ।
বাস্তবতায় দেখা যায়, অধিকাংশ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো রক্ষণাবেক্ষণ। অনুষ্ঠান শেষে অনেক চারাই পরিচর্যার অভাবে মারা যায়। কোথাও পানি দেওয়া হয় না, কোথাও গবাদিপশুর আক্রমণে নষ্ট হয়, আবার কোথাও দখল বা উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে চারাগুলো টিকে থাকতে পারে না। ফলে কাগজে-কলমে যে সংখ্যাটি দেখা যায়, মাঠের বাস্তবতা তার সঙ্গে মেলে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বনভূমির গুরুত্ব আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সুস্থ বন কার্বন শোষণ করে, বন্যা ও ভূমিক্ষয় কমায়, পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হাজারো প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করে। তাই বনায়নকে শুধু পরিবেশগত কর্মসূচি নয়, জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
বর্ষায় একটি চারা লাগানো অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু সেই চারাটি যদি একদিন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়, পাখির আশ্রয় হয়, মাটিকে ধরে রাখে, কার্বন শোষণ করে এবং জীববৈচিত্র্যের অংশ হয়ে ওঠে, তবেই বৃক্ষরোপণ তার পূর্ণতা পায়।
তাই সময় এসেছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। গাছ লাগানোর সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়, বরং কতটা নতুন বন তৈরি হলো, কতটা বন টিকে থাকল এবং কতটা জীববৈচিত্র্য রক্ষা পেল, সেটিই হোক সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড। কারণ বৃক্ষরোপণ একটি দিনের কর্মসূচি হতে পারে, কিন্তু বনায়ন একটি প্রজন্মের অঙ্গীকার।
লেখক: তানজিদ শুভ্র (শিক্ষার্থী (উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ), ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ, গাজীপুর)