এ কে এম ফজলুল হক
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
প্রতীকী ছবি
পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত পর্বতমালা হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত আমাদের এই ভূখণ্ড।
হিমাচল থেকে অরুণাচল, একদিকে গঙ্গা আর অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্রÑ মাঝামাঝি দুই হাজার কিলোমিটারেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত নেপাল, ভুটান, দার্জিলিং, সিকিম ও তিব্বতের বরফগলা স্রোত এবং পাহাড়ি ঝরনাধারার পানি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী প্রণালীর মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর দিয়েই বঙ্গোপসাগরে প্রবাহিত হয়, যা সমগ্র পৃথিবীর সাগরসমূহে প্রবাহিত মোট জলরাশির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এত বিপুল জলরাশি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও, আজ পানির অভাবে বিপন্ন আমাদের প্রকৃতি, বিপন্ন জনজীবন। তাই প্রকৃতির এই অবারিত দানের মাঝেও আজ এক বুক হাহাকার নিয়ে প্রশ্ন করতে হচ্ছেÑ আমাদের পানি কই?
ব্রহ্মপুত্র নদ
ব্রহ্মপুত্র এশিয়া মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃদেশীয় নদ। নদটির উৎপত্তি হিমালয় পর্বতের চীনের তিব্বত অঞ্চলে। তিব্বতে এই নদটির নাম ‘সাংপো’। সেখান থেকে নিম্নমুখী হয়ে ভারতের অরুণাচল, আসাম রাজ্য অতিক্রম করে কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর ব্রহ্মপুত্র গাইবান্ধার বালাসী ঘাট অতিক্রম করে যমুনা নামে সোজা দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে গোয়ালন্দের কাছে দৌলতিয়া ঘাটের উজানে গঙ্গার (পদ্মা) সাথে মিলিত হয়। এটিই বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদের মূল প্রবাহ। তবে বালাসী ঘাটের পর ব্রহ্মপুত্রের পুরাতন খাতটি বাহাদুরাবাদ হয়ে পূর্ব-দক্ষিণে জামালপুর, ময়মনসিংহ অতিক্রম করে ভৈরবে মেঘনা নদীর সাথে মিলিত আছে। ভারতের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে তিস্তা, করতোয়া ও মহানন্দা ব্যারাজসহ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদী ও উপনদীগুলোতে ভারতের মোট ২৩টি বড় ও মাঝারি ধরনের সেচ প্রকল্প রয়েছে।
গঙ্গা নদী
গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশে প্রবাহিত একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। উৎসস্থল পশ্চিম হিমালয়ে, ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে। এরপর নদীটি ভারতের উত্তরাখণ্ড, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যগুলো অতিক্রম করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। অতঃপর ‘পদ্মা’ নামে প্রবাহিত হয়ে দৌলতিয়া ঘাটের নিকট ব্রহ্মপুত্রকে (যমুনা) সাথে নিয়ে চাঁদপুরে মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়। গঙ্গা নদীর অববাহিকা ভারতের সবচেয়ে বড় অববাহিকা, যার আয়তন ৮,৬১,৪৫২ বর্গকিলোমিটার। এই অববাহিকাটি ভারতের ১১টি রাজ্যে ছড়িয়ে আছে। ভারতের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এই অববাহিকায় ফারাক্কা বাঁধসহ ভারতের বড় ও মাঝারি ৪১৯টি সেচ প্রকল্প আছে। নদী তিনটির (গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা) সম্মিলিত প্রবাহ চাঁদপুর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। এই নদী তিনটি মোহনায় বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপÑ গাঙ্গেয় বদ্বীপ গঠন করেছে, যার বেশিরভাগ অংশই বাংলাদেশে অবস্থিত। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদী ব্যবস্থাটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি, কৃষি এবং বাস্তুতন্ত্রের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে।
পানি সংকটে উত্তর-দক্ষিণের জনপদ
আজ কংক্রিটের শিকলে আবদ্ধ তিস্তা, করতোয়া, মহানন্দা ও গঙ্গা! ভারত বাংলাদেশের প্রবেশদ্বারে নদীগুলোতে বাঁধ নির্মাণ করে পানি নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের পানির জোগানদাতা এই নদীগুলো শুষ্ক মৌসুমে আর পানি সরবরাহ করে না। এর ফলশ্রুতিতে মারাত্মক নাব্য সংকটে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী ও তাদের শাখা-প্রশাখাগুলো। নদীর বুক ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বর্ষায় পানি উপচে লোকালয় প্লাবিত হয়, আবার খরায় আমাদের চারপাশের খাল-বিল ও নদী শুকিয়ে হয়ে যায় রুক্ষ। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় অচল হয়ে পড়ে অগভীর ও হস্তচালিত নলকূপ।
পানির এই সংকটের প্রভাব কেবল উত্তরেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ফলে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলের বাসিন্দারাও। নদ-নদীগুলোয় পর্যাপ্ত প্রবাহ না থাকায় বাড়ছে কৃষিজমির লবণাক্ততা, কমছে ফসলি জমি। অগভীর নলকূপের পাশাপাশি লবণাক্ততা এখন ছড়িয়ে পড়েছে গভীর নলকূপগুলোতেও। মানবসৃষ্ট কারণেও দূষিত হচ্ছে নদীনালাসহ ভূগর্ভস্থ পানি। এই পরিস্থিতি অত্যন্ত হতাশাজনক ও আশঙ্কাজনক। ভবিষ্যতে জীবন নির্বাহকারী এই পানিই হতে পারে জীবনের জন্য বড় হুমকি। তথ্য মতে, বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠের পানির উৎসের ৮১.০৮% আন্তঃসীমান্ত নদী প্রবাহ থেকে পাই। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে উজানে ভারত যখন সেচ প্রকল্পগুলো চালু করে তখন অববাহিকার নদী, উপ-নদীগুলোর পানি অনেক কমে যায়। ফলে বেশিরভাগ সীমান্ত নদীর পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। অপর দিকে ১৮.৯২% পানি আসে বৃষ্টিপাত থেকে। আমাদের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণেরও তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। বর্ষায় উজানের পলি এসে নদ-নদীগুলোর বুক ভরাট হয়ে পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে গেছে। দেশের বিল, হাওর ও জলাভূমিগুলোর অবস্থাও আজ করুণ। পলি জমে ভরাট হওয়ার পাশাপাশি অনেক জলাভূমি শুকিয়ে সেখানে চাষাবাদ করা হচ্ছে, যা প্রকৃতির জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
এমন পরিস্থিতিতে ভারত যদি ‘আন্তঃনদী সংযোগ’-এর মাধ্যমে উজানেই পানি আটকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়, তবে ভারত থেকে আসা বাংলাদেশের সব নদ-নদীর প্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। যদি তাই হয়, সে ক্ষেত্রে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে মরুকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (যেমন সুন্দরবন এলাকায়) সমুদ্রের লোনা পানি আরও ভেতরে ঢুকে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি ও পরিবেশ নষ্ট করবে। কৃত্রিমভাবে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করলে নদীগুলোর মোহনার বাস্তুতন্ত্রও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এই প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়গুলোকে পরিকল্পিত খননের মাধ্যমে স্থায়ী জলাধারে পরিণত করা জরুরি। যাতে বর্ষাকালের পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যায়। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে খাল, বিল ও নদী খনন কাজে এমনভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার, যাতে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাওয়া যায়। প্রয়োজনে কিছু ছোট নদীর ক্ষেত্রে জমি সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে।
প্রয়োজন আন্তর্জাতিক কূটনীতি
নিয়ম অনুযায়ী, অভিন্ন নদীর পানি কোনো দেশই একতরফা নিয়ন্ত্রণ বা সরিয়ে নিতে পারে না। যৌথ নদীর পানি ব্যবহারের ফলে কোনো দেশের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে পারস্পরিক প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময় এবং আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করতে হবে। ১৯৭২ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঠিত ‘যৌথ নদী কমিশন’-এর মাধ্যমে এই ধরনের সমস্যা সমাধানসহ পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং যৌথভাবে নদীর পানি ব্যবহার করে দুই দেশেরই সর্বোচ্চ লাভ নিশ্চিত করা সম্ভব। আমরা কারও কাছে দয়া-দাক্ষিণ্য চাই না। আমরা আমাদের হিসাবের পাওনাটাই চাই।
আন্তঃসীমান্ত প্রবাহী নদী সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনসমূহের প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রত্যেকটি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তিতে বাংলাদেশের অধিকার আছে। ঠিক তেমনি, উজানের দেশ হিসেবে ভারতের দায়িত্ব হলো বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দেওয়া। আর সেটিই হতো এই সংকট সমাধানের সবচেয়ে ভালো উপায়। নতুবা, বাংলাদেশের টেকসই পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো :
১. গঙ্গা নদীর পানি চুক্তির সফল নবায়ন করা।
২. তিস্তা, মহানন্দা ও করতোয়া নদীর পানিবণ্টন চুক্তি দ্রুত সম্পাদন করা।
৩. আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিসম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করা।
এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে নদীগুলোর অববাহিকায় নির্মিত বাঁধ বা ব্যারাজে পানি ব্যবহারের আন্তর্জাতিক নিয়মাবলি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, তবেই বাংলাদেশের ন্যায্য পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এজন্য যেমন দ্বিপাক্ষিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তেমনি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণও অপরিহার্য।
লেখক: এ কে এম ফজলুল হক (প্রকৌশলী ও নদীকর্মী, রংপুর)