× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দেউলিয়াত্বের পথে দেউলিয়া আদালত

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

দেশের আর্থিক খাতে অনিয়ম, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি এবং করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতার কারণে দেউলিয়া আদালতগুলোতে মামলার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা যে হারে বাড়ছে, তেমনি ব্যাংক জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, সম্পদ গোপন এবং প্রতারণাজনিত আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনার সংখ্যাও কম নয়। ফলে দেউলিয়া আদালতগুলোতে মামলার পাহাড় জমে থাকলেও সেগুলোর নিষ্পত্তি হচ্ছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। এই পরিস্থিতি বিচারব্যবস্থার ওপর চাপই সৃষ্টি করছে না, দেশের আর্থিক শৃঙ্খলা ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অবস্থা এমন, যেন দেউলিয়া আদালতই দেউলিয়া হতে চলেছে।

উল্লেখ্য, একসময় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দেউলিয়াত্ব, ঋণখেলাপি, অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত মামলায় জড়িত। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে বা সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচার এখনও চলমান। জানা গেছে, বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আদালত নিয়মিত শুনানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আইনজীবীরা বলছেন, আর্থিক খাতে অনিয়ম রোধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

গতকাল প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিচারাধীন ১৭৮টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১২টি। দেশের আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলমার্ক কেলেঙ্কারি। সোনালী ব্যাংক থেকে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে ঋণগ্রহণের অভিযোগে ২০১২ সালে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। দীর্ঘ বিচার শেষে ২০২৪ সালে ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং চেয়ারম্যানসহ কয়েকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এ-সংক্রান্ত আরও কয়েকটি মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে। ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও প্রতারণার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারও দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এই মামলাগুলোর নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছেন বহু বিনিয়োগকারী। বিসমিল্লাহ গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক মামলা করে। পরে অর্থপাচার মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা দণ্ডিত হন। একইভাবে ক্রিসেন্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখনও চলমান। একইভাবে এস আলম গ্রুপকে ঘিরে ব্যাংকের মালিকানা, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক লেনদেন-সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগে তদন্ত ও আইনি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, দেউলিয়া আইন মূলত ব্যবসা ও অর্থনীতিকে সচল রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এর উদ্দেশ্য কেবল দেনাদারের শাস্তি নিশ্চিত করা নয়; পাওনাদারের স্বার্থ রক্ষা, আর্থিকভাবে সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠনের সুযোগ করে দেওয়া এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল রাখা।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মামলার দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে আদালতগুলো এই লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকায় ঋণ আদায় বিলম্বিত হচ্ছে, ব্যাংকের মূলধন আটকে যাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অপরাধীরা সময়ের সুবিধা পেলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্র ও আমানতকারীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলার রায় হলেও অর্থ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, সম্পদ বিক্রি হয়ে যাওয়া অথবা মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে পাওনাদাররা বাস্তবে ক্ষতির মুখে পড়েন।

সৃষ্ট এই সমস্যা নিরসনে প্রথমেই দেউলিয়া আদালতের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। প্রয়োজন সাপেক্ষে বিশেষায়িত বেঞ্চ গঠন, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক ও আর্থিক আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল নিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট চালু করে মামলার প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। এই অবস্থায় বিচার ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি দেউলিয়া আইনকে আরও আধুনিক, গতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। শুধু সম্পদ নিলামে বিক্রি নয়, ব্যবসা পুনর্গঠন, ঋণ পুনঃতফসিল এবং আদালতের বাইরে সমঝোতার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বের বহু দেশে এই ধরনের পদ্ধতি সফলভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, যা ব্যবসা ও কর্মসংস্থান রক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিয়মিত নিরীক্ষা, খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে দেউলিয়া আদালতের ওপর চাপ কমানো কঠিন হবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। বিগত সময়ে বিভিন্ন তদন্ত ও আলোচিত ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দুর্বল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আর্থিক অপরাধকে উৎসাহিত করে।

দেউলিয়া আদালতে মামলার পাহাড় কেবল বিচারিক সমস্যাই নয়Ñ এটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সংকটের উৎস হয়ে উঠতে পারে। সমস্যা যাতে সংকটে রূপ না নেয়, সেজন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণই সর্বোত্তম। বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, আইনি সংস্কার, পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল নিয়োগ, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ভিত্তি দিতে এবং গতিশীল করতে এর বিকল্প কিছু আছে বলে মনে হয় না। 


সম্পাদকীয় 


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা