আমিরুল ইসলাম কাগজী
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আমিরুল ইসলাম কাগজী। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
‘বাবা, আজ তুমি কারাগারে চার দেয়ালে বন্দি হয়েছ একজন ছিনতাইকারী হিসেবে। ওরা তোমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে মোবাইল ফোন আর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাইয়ের অভিযোগে। বাবা, কোর্টের জজ সাহেবরাও কি বিশ্বাস করছেন এই অভিযোগ?
কেন তোমাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করলেন বিচারক? দেশে কি বিচার বলতে কিছু নেই?’ তানজিদা খুব আবেগ দিয়ে লিখেছে কথাগুলো। বাবার উদ্দেশে লেখা কন্যার চিঠিটির মধ্যে আবেগ যেমন ছিল, তেমনি ছিল রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে নানা অসন্তোষ। ২০১০ সালের মধ্য জুনে ‘বাবার কাছে খোলা চিঠি’ শিরোনামে একটি শীর্ষ দৈনিক পত্রিকায় কলম ধরেছিল তানজিদা নাহার হক। ওই সময়ে সে ছিল স্কুলছাত্রী। তার পরিচয়, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একমাত্র কন্যা।
এহছানুল হক মিলন। বিএনপি সরকারের সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, বর্মানে শিক্ষামন্ত্রী। নকল বন্ধে তার তৎপরতা আলোড়ন তুলেছিল দেশব্যাপী। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে এহছানুল হক মিলন চাঁদপুরের কচুয়া থেকে ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে হারিয়ে নির্বাচনে চমক দিয়েছিলেন। বেগম জিয়া তার পুরস্কার দেন মিলনকে প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে।
১১ অক্টোবরের ২০০১ থেকে ২৮ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ছিলেন মিডিয়ায় সরব। তার প্রতিটি কর্মকাণ্ডের প্রচারণা ছিল ব্যাপক। নকল বন্ধে প্রতিমন্ত্রীর এসব কাজকর্ম সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়। পড়ার টেবিলে ফিরে আসে শিক্ষার্থীরা। সবাই বেশ উৎসাহী হয়ে ওঠেন প্রতিমন্ত্রীর এ কাজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাথলেট মিলন, আমেরিকার নাগরিকত্ব ছাড়তে বাধ্য হন রাজনীতি ও মন্ত্রিত্ব বজায় রাখতে।
২০০১-২০০৬ বিএনপি সরকারের আমলের সবচেয়ে সরব প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে মোবাইল ছিনতাইয়ের মামলা, ঘড়ি চুরির মামলাÑ সব মিলিয়ে ৩ ডজন মানে ৩৬টি মামলার পুরস্কার জুটেছে মিলনের ভাগ্যে। পুরস্কারই বটে! কেননা একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ৩৬টি মামলা! ৩৬টি মামলার মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, লুটতরাজ এবং ধর্ষণ বিষয়ে। ছিনতাইয়ের বিষয়গুলোও কৌতূহলোদ্দীপক। ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাই, স্বর্ণের নেকলেস, মোবাইল সেট, স্বর্ণের চেইন, সিকোফাইভ ঘড়ি ছিনতাই, মোটরসাইকেল, নগদ টাকা, ২১ ইঞ্চি টেলিভিশন, আংটি ইত্যাদি ছিনতাইয়ের অভিযোগে মিলনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৭০ বছর বয়সী এক মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগে। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, পৌর ও ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি থেকে সদস্যরা এ মামলার বাদী।
শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মিলন। হেয়প্রতিপন্ন করার নিরন্তর চেষ্টা করা হয়েছে তার পরিবারকে। এমনিভাবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী মিলন যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের কবলে আটকা পড়ছেন, তখন বিষয়টি নিশ্চিত হয়েই হয়তো উচ্চ আদালতের বিচারকগণ তার প্রতি সদয় হয়েছেন। বারবার জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়েছেন। আদালতের বারবার জামিন আদেশের পরও মিলন যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছেন না, বন্দিত্বের শেকল খুলছে না, তখন ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েই হয়তো হাইকোর্টের বিচারকগণ ২৪তম মামলায় ২০১০ সালের ২৫ জুন এক আদেশে বলেছিলেন, ‘নতুন আর কোনো মামলায় মিলনকে গ্রেপ্তার, শ্যোনএরেস্ট ও রিমান্ডে নেওয়া যাবে না’। এ আদেশের পরই কারা প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তিলাভ করেন মিলন।
১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বহুল আলোচিত-সমালোচিত যৌথ বাহিনী পরিচালিত দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার হয়ে দেশের প্রধান দুটি দলের শীর্ষ সারির অনেক নেতা কারাবরণ করেছেন। গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকে আত্মগোপন করেছেন, অনেকে পালিয়ে গেছেন বিদেশ। গণতন্ত্রের ওই ক্রান্তিকালেও এহছানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনোরকম অভিযোগ ওঠেনি। তবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতাগ্রহণের পর মিলনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং তাকে মানসিকভাবে নাজেহাল করতে উঠেপড়ে লাগে শাসক দলের বিতর্কিত নেতা আমলা মখা আলমগীর। পাতানো ষড়যন্ত্রের নীলনকশা অনুযায়ী মিলনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আজগুবি ও লজ্জাকর অভিযোগে মামলা। অনেক মামলার অভিযোগ থেকে তার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবীকেও বাদ দেওয়া হয়নি। গত জোট সরকারের সময়ের ঘটনা দেখিয়ে একে একে ৩৬টি মামলা দায়ের করা হয় মিলনের বিরুদ্ধে। আর এভাবেই পরিকল্পিত মামলার জালে আটকা পড়ে কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ’লীগ মনোনীত প্রার্থী মখা আলমগীর ১ লাখ ৭ হাজার ৪৬১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এহছানুল হক মিলন ৮০ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়েছিলেন। পরের বছর অর্থাৎ ২০০৯ সালের ১৫ জুলাই উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ থেকে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। ওই রায়ের প্রেক্ষিতে ২২ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন চাঁদপুর-১ সংসদীয় আসনটি শূন্য ঘোষণায় গেজেট প্রকাশ করে। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মহীউদ্দীন খান আলমগীর হাইকোর্টে রিট করেন। ফলে নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত গেজেটের কার্যকারিতা ২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে স্থগিত হয়ে যায়। আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে মখা আলমগীর সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন পুরো পাঁচ বছর।
শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে এহছানুল হক মিলন এবার স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলে দেওয়ার। তার সেই স্বপ্নের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে তার যে মিশন এবং ভিশন সেটা প্রত্যক্ষ করার জন্য সফরসঙ্গী হয়েছিলাম বরিশাল, খুলনা এবং দিনাজপুর বোর্ডের মতবিনিময় সভায়। প্রতিটি সভায় তিনি শিক্ষকদের স্বপ্ন দেখিয়েছেনÑ বলেছেন, শিক্ষার মান উন্নত করতে হবে, শিক্ষার্থীদের আনতে হবে পড়ার টেবিলে। শতভাগ শিশুকে নিয়ে আসতে হবে শিক্ষার স্বপ্নজালে। একটি শিশুও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকবে না। বিদ্যালয়গুলোকে পরিণত করতে হবে শিশুদের বাগানে। যেখানে একটি শিশু প্রবেশ করলে আর বাড়ি ফেরার কথা মনে করবে না। বিদ্যালয় হয়ে উঠবে তার আপন ঘর। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের কথা মাথায় রেখে তিনি বারবার উচ্চারণ করেছেন একটি দক্ষ জনশক্তির দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় পদার্পণ করে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ আ প্লান’। তার সেই প্লান সবার আগে বাংলাদেশ। গড়তে হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। তার সেই দেশ গড়ার সহযাত্রী হিসেবে, সঙ্গে আছেন শিক্ষামন্ত্রী মিলন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি বলেন, ‘Our progress as a nation can be no swifter than our progress in education.’ অর্থাৎ শিক্ষায় অগ্রগতির চেয়ে দ্রুত কোনো জাতির অগ্রগতি হতে পারে না।
সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে বাজেট। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম জিডিপির দুই শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা খাতে। এর সুষ্ঠু ব্যবহার করতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে, আমরা পাব একটি সুসংগঠিত, সুদক্ষ, সুশিক্ষিত জাতি।
লেখক: আমিরুল ইসলাম কাগজী (সিনিয়র সাংবাদিক)