বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। ফাইল ছবি
বর্তমান বিশ্বে নানাবিধ সমস্যার মধ্যে অন্যতম পরিবেশ ও জলবায়ু সমস্যা। প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশ দূষণের ফলে পৃথিবী নামের এই গ্রহটি দিন দিন ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আর সে ধ্বংসযজ্ঞে প্রধান ভূমিকা পালন করছে গ্রহের বাসিন্দারাই, অর্থাৎ মানুষ। মানুষের অসচেতনতা এবং প্রাপ্ত সুবিধার অপব্যবহার পৃথিবীকে ক্রমশ বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। শিল্পায়ন, আবাসনসহ নানা কাজে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে পৃথিবীতে অক্সিজেন সরবরাহ প্রতিনিয়ত কমছেÑ এ তথ্য দিয়েছেন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে যানবাহনের কালো ধোঁয়া থেকে বাতাসে মিশছে বিষাক্ত সিসা। এর ফলে দূষিত হয়ে পড়ছে পরিবেশ।
পৃথিবীর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাংলাদেশও এ সমস্যার বাইরে নয়। বরং বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় সমস্যাটি এখানে প্রকট। মূলত অসচেতনতা এবং অনিয়ম এর প্রধান কারণ। জলবায়ু সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে চলমান উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে স্বস্তিদায়ক খবর হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কমিটি’ (এনসিইসিসি) গঠিত হয়েছে। ৪০ সদস্য বিশিষ্ট এ কমিটিতে স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, পরিকল্পনা, পরিবেশ, ভূমি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষি, পানিসম্পদ, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিবগণ সদস্য হিসেবে রয়েছেন। এ ছাড়া বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু ব্ষিয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণকে এ কমিটিতে রাখা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, কমিটি প্রয়োজনে আরও সদস্য ‘কো-অপ্ট’ করতে পারবে এবং বছরে একবার সভায় মিলিত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এনসিইসিসি গঠন আশাব্যঞ্জকÑ সন্দেহ নেই। অনুমান করা যায়, জলবায়ু সুরক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগ্রহের কারণেই এ কমিটি গঠন হলো। তবে কমিটির আকৃতির বিশালত্ব ও তা বছরে মাত্র একবার সভা করবেÑ এ খবর সচেতন ব্যক্তিদের হতাশ করেছে। একটি জাতীয় ও জনগুরুত্বসম্পন্ন সমস্যা বিষয়ে এমন ঢাউস কমিটির আদৌ কোনো প্রয়োজন ছিল কি না, সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তা ছাড়া সমস্যা যেখানে নিত্যদিনের সেখানে সমাধানকল্পে গঠিত কমিটি বছরে একবারমাত্র সভা করে কতটা সফলতা লাভ করতে পারবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কেননা, আমাদের দেশের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। তা হলো, কোনো একটি বিষয়ে কাজ শুরু করা হয় মহাসমারোহে, ঢাকঢোল পিটিয়ে। কিন্তু কাজকর্ম সেভাবে এগোয় না। কখনও কখনও তার ফলাফল হয় পর্বতের মূষিক প্রসবসম। তবে যেহেতু, প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এ কমিটিতে সম্পৃক্ত রয়েছেন, তাই এ ক্ষেত্রে ভালো একটা কিছু হবে বলে আশা করা যায়।
পরিবেশ ও জলবায়ুজনিত সমস্যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে মারাত্মকÑ সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। এখানে পরিবেশ রক্ষাকল্পে যেসব আইন বিদ্যমান রয়েছে, বিভিন্ন মহল তার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে যে যার মতো তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট নিষিদ্ধ থাকলেও তা অবলীলায় চলছে। ইটের ভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও তা থেমে নেই। আর সেজন্য নির্বিচারে নিধন করা হচ্ছে বৃক্ষ, উজাড় হচ্ছে বন। চলছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। তার ফলে কমে যাচ্ছে কৃষিজমি। জলাশয় ভরাটের ফলে কমছে মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্র। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, একটি দেশের মোট আয়তনের অন্তত ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে এর পরিমাণ মাত্র ১৫ শতাংশ। অবশ্য সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় প্রতিবছর বৃক্ষরোপণ অভিযানের ফলে তা দাঁড়িয়েছে ২২ শতাংশে। তবে এ হিসাব সরকারি দপ্তরের খাতাকলমে। বাস্তবে প্রকৃত বনাঞ্চল বা বনভূমির পরিমাণ কত তা বলা কঠিন। খোদ রাজধানী ঢাকা-ই পরিণত হয়েছে বৃক্ষশূন্য রুক্ষ শহরে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর প্রধান সড়কসমূহ রূপ নেয় জলাশয়ের। প্রায় পাঁচশ বছরের পুরনো শহর ঢাকায় আগে ছিল অসংখ্য পুকুর। ছিল ছোটবড় অনেক খাল। সেসব পুকুর ভরাট করে তৈরি হয়েছে সরকারি-বেসরকারি সুউচ্চ ভবন। খাল ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। একই অবস্থা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও ব্যস্ত নগরী চট্টগ্রামেরও। সারা দেশের চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানে পরিবেশ বিধ্বংসী তৎপরতা চলছে নির্বিঘ্নে। যত্রতত্র স্থাপিত শিল্পকারখানার বর্জ্য নদী-খালে মিশে দূষিত করছে পানি। ধ্বংস হচ্ছে প্রাকৃতিক মৎস্য উৎপাদন প্রক্রিয়া। রাজধানী সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি পরিণত হয়েছে বর্জ্য মিশ্রিত ধ্বংসাত্মক রাসায়নিক তরলে।
এসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি এতটুকু। বরং অবনতি হচ্ছে ক্রমাগত। ঠিক এ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষা বিষয়ক জাতীয় কমিটি গঠনের খবর সঙ্গত কারণেই দেশবাসীকে আশ্বস্ত করবে। তা ছাড়া আগামী পাঁচ বছরে পঁচিশ কোটি বৃক্ষরোপণের ঘোষণা, খাল খনন-পুনঃখনন কর্মসূচির মাধ্যমে জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্ব দেওয়ারই প্রমাণ বহন করে। ফলে দেশবাসীর মতো আমাদেরও প্রত্যাশা, পরিবেশ বিধ্বংসী সব তৎপরতা বন্ধ করার মাধ্যমে সরকার জলবায়ু সুরক্ষায় সফলতার পথে এগিয়ে যাবে।
সম্পাদকীয়