× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মিথ্যার সামনে সত্য যখন অসহায়

মতিলাল দেব রায়

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

একসময় সংবাদপত্র, রেডিও কিংবা টেলিভিশনের মাধ্যমে তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছত। কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে যে কেউ মুহূর্তের মধ্যে তথ্য পেতে পারে, আবার তা প্রকাশও করতে পারেন।

এই সুযোগ তথ্যপ্রবাহকে সর্বজনীন করেছে। আবার ভুয়া তথ্য বা মিথ্যা তথ্যের বিস্তারের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছে এক ভয়াবহ সংকটও। অবাধ তথ্য প্রবাহের এ সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অনেক ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে পড়ে, যা সত্যের চেয়ে দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে অনেক সময় সত্য অসহায় হয়ে পড়ে মিথ্যার স্রোতের সামনে।

ভুয়া তথ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটি মানুষের চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে দ্রুত। যখন কোনো মিথ্যা তথ্য বারবার মানুষের সামনে আসে, তখন অনেকেই সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ এমন তথ্য সহজে বিশ্বাস করে, যা তাদের পূর্বধারণার সঙ্গে মিলে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যালগরিদমও অনেক সময় ব্যবহারকারীদের একই ধরনের কনটেন্ট বারবার দেখায়। ফলে ভিন্নমত বা সত্য তথ্যের তুলনায় ভুয়া তথ্য আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

উদাহরণ হিসেবে করোনাভাইরাস মহামারির সময়কার ঘটনা উল্লেখ করা যায়। ২০২০ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যে গরম পানি পান করলে বা নির্দিষ্ট ভেষজ উপাদান খেলে করোনা ভাইরাস ধ্বংস হয়ে যাবে। কোথাও কোথাও এমনও প্রচার করা হয় যে নির্দিষ্ট রাসায়নিক পদার্থ পান করলে মানুষ করোনা থেকে মুক্তি পাবে। এসব মিথ্যা তথ্য বিশ্বাস করে অনেক মানুষ চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষা করে ভুল পদক্ষেপ নিয়েছিল। ফলে কেউ কেউ অসুস্থ হয়েছে, আবার কেউ জীবনও হারিয়েছে। অথচ বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ তখন সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য গুজবের ভিড়ে চাপা পড়ে গিয়েছিল। 

উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাগুলো উল্লেখ করা যায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া পোস্ট, বিকৃত ছবি বা জাল স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দিয়ে ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির নামে ভুয়া ফেসবুক পোস্ট তৈরি করে তা ভাইরাল করা হয়েছে। পরে সেই তথ্যকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং নিরীহ মানুষের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে প্রচারিত তথ্যগুলো ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা বা বিকৃত। 

উদাহরণ রয়েছে নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রচারণার ক্ষেত্রে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া সংবাদ, বিকৃত ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কখনও কোনো প্রার্থীর বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার করা হয়, আবার কখনও সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা ‘ডিপফেইক’ ভিডিওও মানুষের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এসব ভিডিও দেখে অনেকেই মনে করেন যে, কোনো ব্যক্তি সত্যিই সেই কথা বলেছেন বা কাজটি করেছেন। পরে সত্য উদঘাটিত হলেও ভুল তথ্যের প্রভাব পুরোপুরি দূর করা কঠিন হয়ে পড়ে। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, অনেক মানুষ তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়। দ্বিতীয়ত, কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক স্বার্থে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেল অনেক ক্ষেত্রে বেশি আলোচিত ও উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়।  ফলে সত্যের তুলনায় চাঞ্চল্যকর মিথ্যা তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

এই সংকট মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা উচিত। সংবাদটি কোনো বিশ্বস্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে কিনা, ছবিটি পুরনো কিনা, তথ্যটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আছে কিনাÑ এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গণমাধ্যম ও তথ্যসচেতনতা বিষয়ে শিক্ষা বাড়াতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা, বিভ্রান্তিকর কনটেন্টে সতর্কবার্তা যুক্ত করা এবং ইচ্ছাকৃত গুজব ছড়ানো অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকার ও নাগরিক সমাজকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখে ভুয়া তথ্যের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয়।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির ধরন বদলে দিয়েছে। কিন্তু এর অপব্যবহার সত্যকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। আজকের পৃথিবীতে সত্য অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ে। কারণ মিথ্যা দ্রুত ছুটে যায়, আর সত্যকে নিজেকে প্রমাণ করতে সময় নিতে হয়। তাই ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল প্রযুক্তির নয়, এটি সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকারের লড়াই। 


লেখক: মতিলাল দেব রায় (কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা