তিস্তা ব্যারাজ। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। দেশের কৃষি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি এবং কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নদীকেন্দ্রিক। কিন্তু উজানের পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যার কারণে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।
যে কারণে তিস্তা ব্যারাজের কার্যকর উন্নয়ন ও নদী ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এমন বাস্তবতায়, যেকোনো মূল্যে তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। এরই মধ্যে সরকারের পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগের কথাও তিনি জানান। সোমবার জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্য দেশের উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘদিনের পানি সংকট নিরসন ও তিস্তাপাড়ের মানুষের দুঃখ দূর করা। সহজ করে বললে ভারত-নির্ভরতা কমিয়ে স্থায়ী পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। উল্লেখ প্রয়োজন, আশির দশকের শুরুতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা নদীর ওপর গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মূলত ভারতের ফারাক্কা বাঁধের দীর্ঘমেয়াদি ও নেতিবাচক প্রভাব থেকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্দেশ্যেই ছিল তার এই দূরদর্শী উদ্যোগ। উল্লেখ্য, ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, সাতক্ষীরা ও বরিশাল অঞ্চলে যে মরুময়তা এবং তীব্র লবণাক্ততার অভিশাপ নেমে এসেছিল, তা রুখতে পেরেছিল গঙ্গা ব্যারাজ। আরও উল্লেখ্য, দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ডালিয়া বা তিস্তা সেচ প্রকল্পের নির্মাণ কাজও আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৯ সালে শুরু হয় এবং দীর্ঘ নির্মাণ শেষে ১৯৯০ সালে কাজ শেষ হয়।
তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতির প্রাণ। এই নদীর ওপর নির্ভরশীল লাখো কৃষক বছরের পর বছর পর্যাপ্ত পানির অভাবে ক্ষতির মুখে পড়ছেন। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ এতটাই কমে যায় যেÑ সেচব্যবস্থা ব্যাহত হয়, ফসল উৎপাদন কমে যায় এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানিপ্রবাহ বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই একটি আধুনিক ও কার্যকর তিস্তা ব্যারাজ এবং সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা এই দুই ধরনের সমস্যাই মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বলা প্রয়োজন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি অনুযায়ী আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি ব্যবহার হওয়া উচিত ন্যায্যতা, যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে। দুই দেশের জনগণের কল্যাণই হওয়া উচিত ছিল সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু বাংলাদেশ সব ধরনের সহনশীলতা দেখালেও ভারত সুপ্রতিবেশী সুলভ আচরণ কখনও দেখায়নি। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত না হওয়ায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যে কারণে আজ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী, ঐতিহাসিকভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অংশীদার এবং বহু ক্ষেত্রে সহযোগী। আমরা মনে করি, সেই সম্পর্কের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা এবং সহযোগিতার মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশের বৈধ প্রয়োজন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নদী ব্যবস্থাপনার নীতিকে বিবেচনায় রেখে সমাধান খোঁজা হলে তা দুই দেশের জনগণের জন্যই ইতিবাচক হতো। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কারিগরি সংস্থাগুলোরও গঠনমূলক ভূমিকা জরুরি। তারা যৌথ গবেষণা, তথ্য বিনিময়, নদী পুনরুদ্ধার, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন এবং আধুনিক প্রকৌশল সহায়তার মাধ্যমে দুই দেশকে কার্যকর সমাধানের পথে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করতে পারে। তবে যেকোনো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, পারস্পরিক সম্মতি এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান রেখে হওয়া উচিত।
তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন, কৃষি, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একই সঙ্গে ৫৪টি অভিন্ন নদীর ন্যায্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক আস্থা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করতে পারে। তাই এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংলাপ, সুপ্রতিবেশী মনোভাব, পারস্পরিক স্বার্থের প্রতি সম্মান এবং বাস্তবসম্মত সহযোগিতার মাধ্যমে এমন সমাধান নিশ্চিত করা, যা দুই দেশের জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কল্যাণকর হবে।
দীর্ঘ সময় পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঐতিহাসিক ও সাহসী উদ্যোগ নিয়েছেন, যা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমরা মনে করি, দেশপ্রেম সমুন্নত রেখে এই কাজটি আগেই বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। সবিশেষ হলেও দেশের নদীমাতৃক অস্তিত্বের জন্য এক বিরাট স্বস্তি। অস্তিত্ব রক্ষায় তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা দ্রুত ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়িত হবেÑ এটাই প্রত্যাশা।
সম্পাদকীয়