ড. শাহজাহান মন্ডল
প্রকাশ : ৪ ঘণ্টা আগে
ড. শাহজাহান মন্ডল। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাক স্বাধীনতার অধিকার তথা মুক্তভাবে কথা বলার অধিকার হলো বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত ২৭টি মানবাধিকারের একটি। ২৭-এর মধ্যে ২৩টি আমাদের দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে স্বীকৃত।
৬টি দ্বিতীয় ভাগে সমাজতান্ত্রিক বা নীতি-অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, যেমনÑ অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান ও সংস্কৃতির অধিকার (অনুচ্ছেদ ১৫ক, ২৩ ও ২৩ক)। বাকিগুলো স্বীকৃত তৃতীয় ভাগে পুঁজিবাদী বা মৌলিক অধিকার হিসেবে, যেমন আইনের দৃষ্টিতে সমতা পাওয়ার অধিকার, বৈষম্যের শিকার না হওয়ার, আইনের আশ্রয় লাভের, জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার, আন্দোলন-সমাবেশ-সংগঠনের স্বাধীনতা লাভের, ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভের, হাইকোর্টে রিট মামলা করার অধিকার প্রভৃতি (অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮, ৩১, ৩২, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৪১, ৪৪)। নাগরিকের বাক্-ভাব প্রকাশের ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার অধিকার ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত। জাতিসংঘ প্রণীত ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার অনুচ্ছেদ ১৯-এ এটি মানবাধিকার হিসেবে ঘোষিত ও স্বীকৃত। এটি লঙ্ঘিত হলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট মামলা করে প্রতিকার পাওয়ার বিধান রয়েছে। গণতন্ত্র বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ মানবাধিকারটি বাংলাদেশ পার্লামেন্টে ২০০০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত ‘নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি’ ১৯৬৬-এর ১৯ অনুচ্ছেদেও গ্যারান্টিপ্রাপ্ত। বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার অধিকারটি মানবাধিকার দলিলগুলো থেকে সংগৃহীত হয়ে বাহাত্তরের সংবিধানে এমন মর্যাদাপূর্ণ স্থান পেয়েছে। এ অধিকারের বলে বলীয়ান হয়ে কোনো নাগরিক যেমন ব্যক্তিগত মতপ্রকাশ করতে পারে, তেমনি সংবাদক্ষেত্র তথা প্রিন্ট মিডিয়া ও সফ্ট মিডিয়ায় (ছাপানো পত্রিকা, টিভি, ইউটিউব, অনলাইন পত্রিকা প্রভৃতিতে) নির্বিঘ্নে-নিশ্চিন্তে সংবাদ ও তথ্য ছাপাতে পারে, পরিবেশন করতে পারে, প্রচার করতে পারে।
তবে মনে রাখা ভালো, পৃথিবীতে কোনো অধিকার বা স্বাধীনতাই সীমানাবিহীন নয়। হওয়া উচিতও নয়। সীমানা না থাকলে কোনো অধিকার বা স্বাধীনতা আনন্দময় হয় না, যথার্থ হয় না। ক্ষুধা না থাকলে খাওয়ার কোনো আনন্দ হয় না, অর্থও হয় না। বাক্স্বাধীনতার অধিকার চর্চা করতে গিয়ে কোনো নাগরিক অন্যকে গালি দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না। তেমনি কোনো গণমাধ্যম সবকিছু লেখার বা বলার এখতিয়ার রাখে না, অসত্য, ভিত্তিহীন ও ভুল তথ্যনির্ভর কোনো সংবাদ বানানোর বা পরিবেশনের তথা হলুদ বা কালো সাংবাদিকতা করার এখতিয়ার রাখে না, এমনকি সত্য তথ্য হলেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নস্যাৎ করার মানসে তা ছাপতে, পরিবেশন করতে বা প্রচার করতে আইন তাকে অনুমোদন দেয় না। উল্লিখিত সংবিধান, সর্বজনীন ঘোষণা ও আন্তর্জাতিক চুক্তিসহ আমাদের কিছু আইন এ অধিকারের সীমানা চিহ্নিত করে দিয়েছে। যেমন ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ১২৪ক ও ৪৯৯-৫০৫ ধারা, ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইনের ১২৩ ও ১২৪ ধারা, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ১৪৪ ধারা, ১৯২৩ সালের অফিশ্যল্ সিক্রেটস অ্যাক্টের ৩-ক ধারা, ১৯৭৩ সালের প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স (ডেক্ল্যারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট-এর ২০ ধারা, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২ ও ৩ ধারা, ১৯৭৪ সালের প্রেস কাউন্সিল অ্যাক্টের ১২ ধারা, ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইনের ৭ ধারা, ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের ৪ ধারা, ২০১৩ সালের আদালত অবমাননা আইনের ৪ ধারা প্রভৃতি।
ব্যক্তির বাক স্বাধীনতার অধিকার ও সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার অধিকারের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ শুধু বাংলাদেশের নয়, পৃথিবীর সকল দেশের চিত্র। সকল সভ্য রাষ্ট্রের নাগরিক ও গণমাধ্যম এ অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে এরূপ সীমাবদ্ধতার অধীন। চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে তো এ অধিকারের অস্তিত্বের কথা চিন্তা করা দুঃসাধ্য। তবে বাংলাদেশে সহজ। সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে সীমানাগুলোর কথা বলা হয়েছে এভাবে : ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা গণমাধ্যম অধিকারটি চর্চা করতে চাইলে তাকে ৩৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ৮টি সীমানা মানতে হবে, যথা : সে তা করতে গিয়ে অবশ্যই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারবে না, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করার প্রয়াস করতে পারবে না, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারবে না, কারও শালীনতা নষ্ট করতে পারবে না, বাংলাদেশি সমাজে বিদ্যমান নৈতিকতা নষ্ট করতে পারবে না, আদালত অবমাননা করতে পারবে না, কারও মানহানি করতে পারবে না, এবং অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা দিতে পারবে না। যদি সে এগুলো করে তাহলে তার দ্বারাই বরঞ্চ সংবিধান লঙ্ঘিত হবে। তার বিরুদ্ধেই তখন আদালতে মামলা করে রাষ্ট্র কিংবা নাগরিক প্রতিকার চাইতে পারবে।
এ মানবাধিকারটির আরেকটি স্বরূপ আছে। তা বলা আছে উপর্যুক্ত UDHR -নামক জাতিসংঘ ঘোষণায় ও ICCPR -নামক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে। উভয়ের অনুচ্ছেদ ১৯-এ বর্ণিত স্বরূপটি হলো, গণমাধ্যম মারফত তথ্য ও চিন্তা তল্লাশ, গ্রহণ ও প্রদান (seek, receive and impart) এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। এক ধাপ এগিয়ে এ-ও বলে যে, তথ্য ও চিন্তাগুলো মৌখিক হতে পারে, লিখিত হতে পারে, ছাপানো হতে পারে আবার শিল্পের মাধ্যমেও হতে পারে। খুব সতর্কভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, এ আন্তর্জাতিক চুক্তিতে কোনো ব্যক্তিকে কোনো মত তৈরি ও প্রকাশের অধিকার দেওয়া হয়েছে, কোনো অপমত তৈরি ও প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়নি। একইভাবে অপতথ্য ও অপচিন্তা তল্লাশ, গ্রহণ ও প্রদানের কথা বলা হয়নি। মত, তথ্য ও চিন্তা তখনই অপমত, অপতথ্য ও অপচিন্তায় পরিণত হয় যখন তা ওপরে উল্লিখিত ৮টি সীমানার যেকোনোটি লঙ্ঘন করে। সহজ ভাষায় বলতে হয়, যখন কোনো ব্যক্তি বা সংবাদক্ষেত্র কোনো অপমত তৈরি ও প্রকাশ করে কিংবা হলুদ বা কালো সাংবাদিকতা করে তখন তা বরং অন্য ব্যক্তির সঠিক তথ্য ও চিন্তা তল্লাশ, গ্রহণ ও প্রদানের মানবাধিকার খর্ব করে। তখন ঐ অন্য ব্যক্তি আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার পাওয়ার হকদার হয়ে যায়।
আর সেজন্যই বস্তুনিষ্ঠতা সব মিডিয়ার ব্রত হওয়া উচিত। তবে দুঃখের ও শঙ্কার কথা হলো এখনও এদেশে নিরপেক্ষতার স্লোগানধারী কিছু ব্যক্তি ও গণমাধ্যম আছে, যারা অসত্য-ভিত্তিহীন এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিঘ্নকারী কথা বলতে, ছাপতে ও প্রচার করতে পছন্দ করে। উল্লিখিত ঐ সীমানার কথা এরা বেমালুম ভুলে যায়। গণমাধ্যমগুলোর রিপোর্ট-লেখনীর মনোগতি দেখলে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। সরকারের নজরেও বোধ হয় অনেক সময় এগুলো পড়ে না। ‘গ্লাসে অর্ধেক পানি’Ñ বিষয়টিকে একজন যদি বলে ‘গ্লাসটি অর্ধেক ভর্তি’ তবে তাকে পজিটিভ মনোগতির লোক বলা যায়। কিন্তু যদি সে বলে ‘গ্লাসটি অর্ধেক খালি’ তবে তাকে নেগেটিভ মনোগতির লোক বলা যায়। এখানে সত্যবাদী দুজনেই। কিন্তু কার ভাবনা কোন দিকে তা স্পষ্ট হয় বৈকি। গণমাধ্যমের মনোগতিও এরকম হতে পারে। বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম আছে, যারা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমনভাবে কোনো ঘটনার উপস্থাপনা করে, যাতে সত্যতার পরিমাণ কম থাকে, অনেক সময় থাকেই না। কিন্তু কম থাকলে মানুষ তা পড়ে কম, পত্রিকা বিক্রি হয় কম বিধায় উপার্জন হয় কম। তাই উপার্জন বৃদ্ধির আশায় রংচং লাগিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। এরকম হলুদ সংবাদক্ষেত্র তৈরি করা সমাজের জন্য মঙ্গলজনক নয়।
১৮৮৩ সালে জোসেফ পুলিৎজারের পত্রিকা নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ও উইলিয়াম হিয়ার্টজের পত্রিকা নিউইয়র্ক জার্নাল অসৎ ও অসত্য সংবাদ ছাপানোর প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বেশি অর্থ উপার্জনে ব্রতী হয়। পুলিৎজারের পত্রিকায় কার্টুনিস্ট রিচার্ড ফেন্টো আউটকল্ট ‘হোগানস আ্যালি’ নামে কমিক স্ট্রিপ আঁকতেন, যার মুখ্য চরিত্র হিসেবে থাকত হলুদ বর্ণের এক শিশু। হিয়ার্টজের পত্রিকাও তাই করে। উভয় পত্রিকা চটকদার গালগপ্পো ও মিথ্যা সংবাদ বিক্রিতে সিদ্ধহস্ত হয়ে পড়ে। নেতিবাচক সংবাদ লুফে নিতে পাঠককুলও উৎসুক হয়। পত্রিকাগুলোর আয় বেড়ে যায়। তখন থেকে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র শুরু। এক পর্যায়ে কিউবার হাভানাতে আমেরিকার জাহাজডুবির জন্য নির্দোষ স্পেনের ওপর মিথ্যা দায় চাপায় ঐ দুই পত্রিকা। যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। প্রাণ যায় সৈনিকদের আর হাজারো বেসামরিক মানুষের। পত্রিকা দুটোর বিক্রি যায় বহুগুণ বেড়ে। হলুদ সাংবাদিকতা প্রাণ কেড়ে নেয় বহু মানুষের। এ জাতীয় স্বাধীনতা ভোগ করার অধিকার রাখে না কোনো গণমাধ্যম। কারণ তা মানবাধিকার নয়, সাংবিধানিক অধিকার নয়, আইনগত অধিকারও নয়। বরং এসব অধিকারের লঙ্ঘন। উল্লিখিত দেশীয় আইন, সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনি দলিলসমূহ চিন্তায় রেখে কোনো ব্যক্তি বা সংবাদক্ষেত্র মত ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার চর্চা করলে তাদেরও মঙ্গল, দেশেরও মঙ্গল।
লেখক: ড. শাহজাহান মন্ডল (সাবেক চেয়ারম্যান, আইন বিভাগ; সাবেক ডিন, আইন অনুষদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া)