× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সরকার বনাম জনপ্রত্যাশা

ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

রাষ্ট্র কখনও কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামোর নাম নয়; রাষ্ট্র আসলে মানুষের বিশ্বাস, ভাঙা-গড়া স্বপ্ন, দীর্ঘদিনের জমে থাকা বঞ্চনা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে একসঙ্গে দেখার সাহসের নাম।

একটি জাতি যখন দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসের ভেতর দিয়ে পথ চলে, তখন নতুন শুরুর প্রতি তার প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশও ছিল এমনই এক সন্ধিক্ষণেÑ যেখানে মানুষ কেবল সরকার বদল নয়, রাষ্ট্রের চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তনের আশা করেছিল।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপড়েন, বঞ্চনা ও অচলাবস্থার পর মানুষের মনে একটি নতুন বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিলÑ হয়তো এবার রাষ্ট্র সত্যিই নাগরিকের দিকে নতুনভাবে তাকাবে। হয়তো ক্ষমতার ভাষা আর কেবল নির্দেশের ভাষা হয়ে থাকবে না; সেখানে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, না-পাওয়া, ক্ষোভ এবং প্রত্যাশারও জায়গা তৈরি হবে। এই আশা-আকাঙ্ক্ষার ভেতর থেকেই অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন নোবেলজয়ীর নেতৃত্ব অনেকের মনে নতুন আস্থার আলো জ্বালিয়েছিল। মনে হয়েছিল, রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র হয়তো এবার নৈতিকতার ভিত্তিতে নতুন পথ খুঁজে পাবে।

কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা খুব দ্রুতই একটি নির্মম সত্য সামনে নিয়ে আসেÑ সদিচ্ছা যতই শক্তিশালী হোক, তা একা যথেষ্ট নয়। উদ্দেশ্য মহৎ হতে পারে, পরিকল্পনাও সুন্দর হতে পারে; কিন্তু প্রশাসনিক দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বাস্তবতার সঙ্গে খাপখাইয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছাড়া পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি প্রায়ই বাস্তবতার দেয়ালে এসে থেমে যায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, উচ্চারিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষায় এসে ভেঙে পড়েছে। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা শুধু নীতিগত বক্তব্য বা রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয় নয়; এটি এক জটিল সমন্বয়ের প্রক্রিয়াÑ যেখানে দক্ষ জনবল, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং নেতৃত্বের দেশপ্রেম একসঙ্গে কাজ করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠেÑ রাষ্ট্রের ভেতরে দৃশ্যমান সরকারের পাশাপাশি অদৃশ্য প্রভাবের একটি জটিল জাল সক্রিয় থাকে। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় কিছু গোষ্ঠী খুব দ্রুত নিজেদের অবস্থান বদলে নতুন ক্ষমতার কাছাকাছি চলে আসে। তারা আদর্শের কারণে নয়, বরং সুবিধার হিসাবনিকাশে চালিত হয়। প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ, অর্থনীতি কিংবা জনমত তৈরির ক্ষেত্রÑ সব জায়গাতেই তারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।

বাংলাদেশও এই বাস্তবতার বাইরে নয়। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক পালাবদলের সময় সবচেয়ে দ্রুত রূপান্তর ঘটে সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর। যারা গতকাল এক পক্ষের ঘনিষ্ঠ ছিল, তারা আজ অন্য পক্ষের প্রতি আনুগত্য দেখাতে দ্বিধা করে না। এই প্রবণতা শুধু রাজনীতিকে দুর্বল করে না; এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

অন্তর্বর্তী সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, যারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে, তারা কতটা বাস্তব স্বীকৃতি বা পরিবর্তনের অংশীদার হতে পেরেছে? বিশেষ করে তরুণ সমাজ, শিক্ষার্থী এবং আন্দোলনের সামনের সারির মানুষের একাংশের মধ্যে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইতিহাসের প্রতিটি বড় গণ-আন্দোলনের পরই এই প্রশ্ন ফিরে আসেÑ পরিবর্তনের শক্তি কি শেষ পর্যন্ত পরিবর্তনের সুফল পায়?

এরপর গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ আন্দোলন, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হয় নতুন নেতৃত্ব। ‘প্ল্যান’, ‘৩১ দফা’, নির্বাচনী ইশতেহার এবং ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকারÑ সব মিলিয়ে মানুষের সামনে এক বিস্তৃত প্রত্যাশার ক্ষেত্র তৈরি হয়।

নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনগণের আস্থা; আর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও ছিল সেই আস্থাকে ধরে রাখা। সরকারপ্রধানের দৃষ্টিভঙ্গি, উন্নয়ন-ভাবনা এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনা অনেকের কাছেই সময়োপযোগী বলে মনে হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক বাস্তবতা হলোÑ একজন নেতার দৃষ্টিভঙ্গি যতই শক্তিশালী হোক, তার বাস্তবায়ন নির্ভর করে একটি কার্যকর দলীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর। সমন্বিত, দক্ষ এবং দায়বদ্ধ টিম ছাড়া কোনো রাজনৈতিক স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায় না। এই জায়গাতেই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি দাঁড়ায়Ñ নীতিগত সদিচ্ছা কি বাস্তবায়ন সক্ষমতায় রূপ নিতে পারছে?

প্রাথমিক ১০০ দিনকে তাই অনেকেই একটি পরীক্ষামূলক সময় হিসেবে দেখেন। যেকোনো বড় প্রকল্পের মতোই রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই সময়টি গুরুত্বপূর্ণÑ যেখানে বোঝা যায় পরিকল্পনা কতটা কাজ করছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং কোথায় দ্রুত সংশোধন দরকার।

বিশেষ করে মন্ত্রিসভা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও নীতিগত বিভাজন, কোথাও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, আবার কোথাও প্রশাসনিক জটিলতাÑ এসব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় গতিশীলতা ব্যাহত হতে পারে। আর রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত 

ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ জনগণের প্রত্যাশা সময়ের সঙ্গে কমে না; বরং আরও বেড়ে যায়।

অন্যদিকে প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে পুরনো প্রভাববলয়, ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি এবং সুবিধাবাদী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। যদি সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তারা নিরাপদ পরিবেশ না পান, তাহলে কোনো নীতিগত পরিবর্তনই বাস্তব ফল দিতে পারে না।

একটি রাষ্ট্র শুধু মন্ত্রিসভা দিয়ে চলে না; এটি চলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতার ওপরÑ দপ্তর, অধিদপ্তর এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে। তাই রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার না হলে পরিবর্তন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তবে সমালোচনার পাশাপাশি একটি বাস্তব সত্যও স্বীকার করা জরুরিÑ আজকের বিশ্বব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি রাষ্ট্র পরিচালনাকে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে। অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য, আঞ্চলিক অস্থিরতাÑ সব মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশের জন্য পথ সহজ নয়।

তবুও জনগণের প্রত্যাশা থেমে থাকে না। কারণ তারা প্রতিদিনের জীবনে পরিবর্তন চায়Ñ দ্রব্যমূল্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তার মতো মৌলিক ক্ষেত্রে বাস্তব উন্নতি দেখতে চায়।

এই বাস্তবতায় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো প্রতিশ্রুত পরিকল্পনাগুলোকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ভাগ করে সময় মতো জনগণের সামনে অগ্রগতি তুলে ধরা। আধুনিক রাষ্ট্রে শুধু কাজ করাই যথেষ্ট নয়; কাজের স্বচ্ছ উপস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি বাস্তবতা হলোÑ দলীয় সংগঠন দুর্বল রেখে কোনো সরকার দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারে না। রাজনৈতিক কর্মীরা কেবল নির্বাচনের সময় নয়; তারা রাষ্ট্রের বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়, মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরে এবং সংকটের মুহূর্তে সরকারের পাশে দাঁড়ায়। তাই তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়লে সেই শূন্যতা ধীরে ধীরে অবিশ্বাসে রূপ নেয়।

সবশেষে বলা যায়, পরিবর্তনের রাজনীতি সবচেয়ে কঠিন রাজনীতি। কারণ এখানে মানুষ শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন চায়না; তারা চায় রাষ্ট্রের চরিত্র পরিবর্তন হোক। তারা চায় প্রতিশ্রুতি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনে দৃশ্যমান হয়ে উঠুক।

ইতিহাস নির্মমভাবে সরলÑ সে কাউকে শুধু প্রতিশ্রুতির জন্য মনে রাখে না; মনে রাখে বাস্তব অর্জনের জন্য। তাই নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন একটাইÑ প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার ব্যবধান ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা। কারণ জনগণ অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু অনির্দিষ্টকাল নয়। জনগণ বিশ্বাস করতে পারে, কিন্তু সেই বিশ্বাসও চিরস্থায়ী নয়। আর রাষ্ট্র যখন জনগণের আস্থা হারায়, তখন সংকট শুরু হয় ঠিক সেখান থেকেই।


লেখক: ড. মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক (গবেষক ও শিক্ষক)



শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা