মহিউদ্দিন খান মোহন। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গেল বছরের আগস্ট মাসে সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর নিয়ে হইচই পড়ে গিয়েছিল। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি ঝরনা থেকে সৃষ্ট ধলাই নদে ভেসে আসা এসব পাথর ভোলাগঞ্জকে দিয়েছে অপার সৌন্দর্য।
ধারণা করা হয়, ধলা (সাদা) পাথরের প্রাচুর্য থেকেই ‘ধলাই নদ’ নামের উৎপত্তি। রাশি রাশি সাদা পাথর পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম উপাদান। কিন্তু হঠাৎ করেই নিখোঁজ হতে থাকে সে পাথর। রাতের অন্ধকারে একদল দুর্বৃত্ত প্রাকৃতিক এই সম্পদকে লুট করে নিয়ে যেতে থাকে। স্থানীয় সংবাদকর্মীদের সুবাদে তা উঠে আসে দেশের মূলধারার সংবাদ মাধ্যমে। এক পর্যায়ে দেখা গেল ধলাই নদে আর কোনো সাদা পাথর নেই। নদীর তীর এবং তলদেশে কাদা আর কাদা। রাতেই শুধু নয়, দিনের বেলায়ও ট্রাক-লরি ভর্তি করে লুট হতে থাকে সাদা পাথর। অনেক সংবাদ মাধ্যম সে ঘটনাকে আখ্যায়িত করেছিলÑ ‘পাথর লুটের মচ্ছব’। অভিযোগ ওঠে সরকারি প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে পাথর লুটেরাদের যোগসাজশের। ক্ষমতায় তখন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান স্বয়ং গেলেন সিলেটে। সম্মুখীন হলেন পাথরখেকোদের সম্মিলিত প্রতিরোধের। সংবাদ মাধ্যমে উঠে এলো সাদা পাথর লুটের ভেতর-বাইরের জানা-অজানা কাহিনী। মানুষ বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল এটা জেনে যে, রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় ইস্যুতে একমত হতে না পারলেও সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর লুটের ব্যাপারে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছে। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ক্ষমতাপ্রত্যাশী (সে সময়) বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারা এই পাথর হরিলুটের পেছনের কুশীলব। কেউ নেপথ্যে, কেউ প্রকাশ্যে মদদ দিয়েছেন এই প্রকৃতি-বিধ্বংসী অপকর্মে। আর পাথর লুট থেকে প্রাপ্ত অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে স্থানীয় সরকারি সিভিল প্রশাসন, পুলিশ এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে।
পত্রপত্রিকায় যখন পাথর লুটের এই ঘটনা নিয়ে তোলপাড়, চারদিকে বইছিল নিন্দার ঝড়, তখন সরকারের টনক নড়ে। সিলেটের ডিসিসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। পরিবর্তে সারওয়ার আলমকে পাঠানো হয় সেখানে। সারওয়ার আলম এর আগেও কয়েকটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চালিয়ে দেশবাসীর ভূয়সী প্রশংসা কুড়ান। প্রকৃতপক্ষে সেটা ছিল এক দুঃসাহসী অভিযান। কেননা, মতিঝিলের অরামবাগ ক্লাব পাড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের উদ্যোক্তা, পৃষ্ঠপোষক ও বেনিফিশিয়ারি ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একাধিক মন্ত্রী, এমপি ও নেতা। সারওয়ার আলমের অভিযানের পর ক্যাসিনো কারবার বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনি পড়েন ক্ষমতাসীনদের রোষানলে। ২০২০ সালে ঘটে আরেক ঘটনা। আওয়ামী লীগের তৎকালীন এমপি হাজী সেলিমের ছেলে নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে হেনস্থা করলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয় হাজী সেলিমের বাড়িতে। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ মাদবদ্রব্য ও অবৈধ অস্ত্র। গ্রেপ্তার হয় এমপিপুত্র। এমনিভাবে তিন শতাধিক ভেজালবিরোধী অভিযান, করোনাকালীন মহামারির সময়ে ভুয়া করোনা টেস্টের বিরুদ্ধে অভিযান ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সারওয়ার আলম দেশব্যাপী পারিচিতি পান সৎ, কর্তব্যনিষ্ঠ ও নির্ভীক কর্মকর্তা হিসেবে।
তবে বাংলাদেশে সততা, নিষ্ঠা বা দেশপ্রেমের যে ধরনের পুরস্কার দেওয়া হয়, তা থেকে বঞ্চিত হননি সারওয়ার আলম। বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের শাসনামলে পদোন্নতি বঞ্চনা, বিভাগীয় মামলা, দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার, বদলি ইত্যাদি তাকে পিছু ছাড়েনি। হাসিনা সরকারের আমলে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে সারওয়ার আলম ছিলেন অন্যতম। ওই সময়ে সব ধরনের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অন্তত তিনবার তাকে পদোন্নতি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর ১৩ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি উপ-সচিব পদে পদোন্নতি পান।
উল্লেখ্য, সারওয়ার আলম প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন ২০০৮ সালে। তার পরের বছরই ক্ষমতায় বসে আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও পরবর্তী ১২ বছর ন্যায্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত ছিলেন। সারওয়ার আলম যখন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ভেজালবিরোধী অভিযান চালাচ্ছিলেন, তখন সরকারের একটি অংশ তার প্রতি রুষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি পরিণত হন প্রভাবশালী মহলের চোখের বালিতে। সে বালি ধুয়ে ফেলতে তারা ‘দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার’ নামক পানি ব্যবহার করেন। ২০২০ সালে ৯ নভেম্বর তাকে র্যাব থেকে প্রত্যাহার করে সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়। এ সময় তিনি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি মন্তব্য করে ক্ষমতাসীনদের কোপানলে পড়েন। তিনি লিখেছিলেন, ‘চাকরি জীবনে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়েছেন, তাদের বেশির ভাগই পদে পদে বঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছেন। এদেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই অন্যায়।’ এ মন্তব্যকে সরকারি চাকরির ‘শৃঙ্খলাবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। অভিযোগ আনা হয় অসদাচরণের। তদন্ত কর্মকর্তাদের সামনে মন্তব্যটি তার নিজের বলে অকপটে স্বীকার করেন। ফলে অভিযোগ ‘সন্দহাতীতভাবে প্রমাণিত’ হওয়ায় শাস্তি স্বরূপ তাকে ‘তিরস্কার’ করা হয়।
অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকা সারওয়ার আলম সিলেটের ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর লুণ্ঠিত সাদা পাথর উদ্ধারে অভিযান শুরু করেন। সে অভিযান এতটাই কঠোর ছিল যে, লুটেরারা রাতের অন্ধকারে লুণ্ঠিত পাথর ভোলাগঞ্জের ধলাই নদে এনে জমা দিতে শুরু করে। কথিত আছে আগে-পরে শখ করে যারা দু’চারটি পাথর সংগ্রহ করে ‘শো-পিস’ হিসেবে ঘরে সাজিয়ে রেখেছিলেন, ভয়ে তারাও সেগুলো শোকেস থেকে বের করে সন্তপর্ণে ধলাই নদে রেখে এসেছিলেন। এর ফলে ডিসি সারওয়ার আলম বনে গিয়েছিলেন হিরো। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গিয়েছিল। অনেকেই মন্তব্য করেছিলেন, রাজনৈতিক চাপমুক্ত পরিবেশে সরকারি কর্মকর্তারা যদি তাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা নির্বিঘ্নে প্রয়োগ করতে পারেন, তাহলে দুর্নীতির বংশ নির্বংশ হতে বাধ্য।
কিন্তু হঠাৎ করেই যেন নক্ষত্রের পতন ঘটল। ডিসি সারওয়ার আলমকে সিলেটে থেকে প্রত্যাহার করা হলো। প্রজ্ঞাপনে যদিও বলা হয়েছে, ‘জনস্বার্থে’ এ পদক্ষেপ, তবে এর পেছনের অন্তর্নিহিত কারণটি অনুমান করতে কাউকে বেশি চিন্তা করতে হয়নি। সাদা পাথর উদ্ধার যে সারওয়ার আলমের চাকরি জীবনে আবার কালোছায়া ফেলতে পারে, এমন একটি আশঙ্কা অনেকেরই ছিল। দরকার ছিল শুধু একটি উছিলার। সেটাই এনে দিয়েছে হজরত শাহজালালের মাজারের দানের ডেগ ও বাক্স। খবর যেটুকু সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে, তাতে জানা যায়, হজরত শাহ্জালাল (রহ.)-এর মাজারে ভক্ত ও মানতকারীদের দেওয়া টাকাপয়সার হিসাব শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে গিয়ে তিনি প্রভাবশালী মহলের রোষের শিকার হয়েছেন। যদিও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপনে তা উল্লেখ করেনি। তবে কারও বুঝতে বাকি থাকেনি যে, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী হজরত শাহ্জালাল (রহ.)-এর মাজারের তহবিল যথেচ্ছ তছরুপে জড়িত মহলটি এর পেছনে রয়েছে। জানা গেছে, মাজারটির উন্নয়নে সরকার ও সিলেট সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে একটি মাস্টার প্ল্যান নেওয়া হয়েছে। সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাজার কর্তৃপক্ষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু মাজারের আয়-ব্যয় যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা এ উদ্যোগকে দেখছেন তাদের স্বার্থহানিকর পরিকল্পনা হিসেবে। কেননা, এতকাল মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা না থাকলেও সরকার ও সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আর্থিক জবাবদিহিতার বিষয়ট অত্যাবশ্যক হয়ে পড়বে। সিলেট জেলা প্রশাসন মাজারের দানবাক্স ও ডেগ সিলগালা করে নতুন দানবাক্স বসায়। যাতে মাজারটির আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা থাকে। মাজার পরিচালনায় জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে এই আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের সমাধি ঘিরে চলমান অনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যাবে এবং বিশেষ একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ বিঘ্নিত হবে, এ আশঙ্কায় চক্রটি ডিসির বিরুদ্ধে মাঠে নামে। তারা সরকারের উচ্চমহলে ডিসির কার্যকলাপে ‘জনমনে ক্ষোভ’ সৃষ্টির বায়বীয় অভিযোগ তুলে তাকে সরিয়ে দিতে তৎপরতা চালায়। আর সরকারের ওপর মহল তা বিশ্বাস করে ডিসি সারওয়ারকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করে নেয়।
লুট হওয়া সাদা পাথর উদ্ধার এবং শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের অনিয়ম দূর করে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ডিসি সারওয়ার আলমের পরিণতির পরে দেশের আর কোনো সরকারি কর্মকর্তা সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী হবেন কি না সন্দেহ। অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, ২০১৯ সালে পণ্যের অযৌক্তিক মূল্য রাখার অভিযোগে আড়ং নামের বিপণিবিতানে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করে দিয়েছিলেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। সে ‘অপরাধে’ তাকে প্রত্যাহার ও বদলি করে দেওয়া হয়েছিল অন্যত্র। সে সময় সংস্থাটির মহাপরিচালক ছিলেন আমার স্কুলজীবনের বন্ধু শফিকুল ইসলাম লস্কর। পরে তার কাছে ঘটনার ইতিবৃত্ত শুনেছি। অবাক হয়েছি এটা জেনে যে, একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাকে বিনা অপরাধে সে ‘শাস্তি’ দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী। ভেজাল ও পণ্যের মজুদদারির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে দেশজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছিলেন আরেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রুকনউদ্দৌলা। তার পুরস্কারপ্রাপ্তিও আমরা দেখেছি। তাকেও প্রত্যাহারসহ নানা ধরনের হয়রানিমূলক বদলির দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
আমরা, মানে এদেশের জনসাধারণ দেশে দুর্নীতি-অনিয়মের প্রকোপ বৃদ্ধিতে সব সময় ক্ষোভ-হতাশা ব্যক্ত করে থাকি। কেন দুর্নীতি-অনিয়ম দূর হয় না, সে প্রশ্নও করি। কিন্তু এটা ভুলে যাই, যে শর্ষে দিয়ে ভূত তাড়ানোর কথা, সে শর্ষেতেই ভূত স্থায়ী আবাস গেড়ে বসে আছে। ফলে যা বলা হচ্ছে, তা হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে। আর নির্মম সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সারওয়ার আলমের কথাÑ ‘এদেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটাই অন্যায়’।
লেখক: মহিউদ্দিন খান মোহন (সহকারী সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ)