× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্দার অন্তরালের দুই মহীয়সী নারী

কাউসার মুমিন

প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে

মালয়েশিয়ার ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল এবং বাংলাদেশের ডা. জোবাইদা রহমান। ছবি: সংগৃহীত

মালয়েশিয়ার ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল এবং বাংলাদেশের ডা. জোবাইদা রহমান। ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক ইতিহাস সাধারণত ক্যারিশমাটিক নেতা, নির্বাচনী বিজয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার যুগান্তকারী ঘটনাগুলোকেই বেশি স্মরণ করে।

অথচ বহু রাজনৈতিক আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারিত হয়েছে এমন সব মানুষের অবদানে, যাঁরা কখনোই আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন না। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেনÑ রাজনৈতিক নেতাদের জীবনসঙ্গীরা; যারা সংকটময় সময়ে মানসিক দৃঢ়তা, সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা এবং নৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখেন। মালয়েশিয়ার ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল এবং বাংলাদেশের ডা. জোবাইদা রহমানের জীবন এই প্রায়শই উপেক্ষিত রাজনৈতিক বাস্তবতার এক অনন্য উদাহরণ। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেড়ে উঠলেও, তাঁদের জীবন দেখায় কীভাবে পেশাগত উৎকর্ষ, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত সাহস একটি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নেতৃত্ব প্রায়শই একটি সমষ্টিগত যাত্রা, যেখানে পর্দার আড়ালে থাকা মানুষের ভূমিকাও সমানভাবে অপরিহার্য।

এই দুই নারীর জীবনের মধ্যে সাদৃশ্য অত্যন্ত লক্ষণীয়। উভয়েই প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক, যাঁদের পেশাগত প্রশিক্ষণ তাঁদের মধ্যে গড়ে তুলেছে বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাশক্তি, মানবিক সহমর্মিতা এবং জনসেবার প্রতি অটল অঙ্গীকার। তাঁরা উভয়েই এমন রাজনৈতিক নেতার জীবনসঙ্গী, যাঁরা নিজ নিজ দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং রাজনৈতিক বৈধতার সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন তাঁদের স্বামীদের কারাবরণ, আইনি লড়াই, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার সময়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোতে তাঁরা কখনোই তাঁদের জীবনসঙ্গীর পাশ থেকে সরে যাননি।

ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলের রাজনৈতিক যাত্রা সমসাময়িক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে পেশাজীবী থেকে জাতীয় নেতায় রূপান্তরের অন্যতম অনন্য উদাহরণ। ১৯৯৮ সালের মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক সংকটের সময় তাঁর স্বামী আনোয়ার ইব্রাহিমকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ এবং পরবর্তীতে কারাবন্দি করা হলে, বিরোধী রাজনীতি ছিল বিভক্ত ও অনিশ্চিত। এমন পরিস্থিতিতে তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সরে না গিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পার্টি কেদাইলান ন্যাশনাল, যা পরবর্তীতে পিপলস জাস্টিস পার্টিতে রূপান্তরিত হয়। ন্যায়বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ধীরে ধীরে মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

ড. ওয়ান আজিজাহর মতো ডা. জোবাইদা রহমান কোনো রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেননি কিংবা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার পথও বেছে নেননি। তাঁর প্রভাব মূলত ছিল প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং অনানুষ্ঠানিক। তবে অনানুষ্ঠানিক নেতৃত্বকে কখনোই রাজনৈতিক গুরুত্বহীনতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বহু রাজনৈতিক সংগঠনে, বিশেষত দীর্ঘস্থায়ী দমন-পীড়ন বা বহুমুখী চাপের মুখে থাকা দলগুলোর ক্ষেত্রে, স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে এমন বিশ্বস্ত উপদেষ্টা ও পরিবারের সদস্যদের ওপর, যারা নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন, অভ্যন্তরীণ আস্থা অটুট রাখেন এবং কর্মীদের মনোবল ধরে রাখেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর অসংখ্য নেতাকর্মী ও সমর্থকের কাছে ড. জোবাইদা রহমান দীর্ঘদিন ধরে এমন এক শান্ত, বিচক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত, যিনি দলের বৃহত্তর নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ও মানসিক স্থিতি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যদিও তাঁর অবদান আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকেছে, তবুও তাঁর জীবন প্রমাণ করে রাজনৈতিক আন্দোলনের স্থায়িত্ব প্রায়ই এমন নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে, যা জনসমক্ষে খুব কমই স্বীকৃতি পায়।

এই দুই নারীর মধ্যে পার্থক্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তা তাঁদের সাদৃশ্যকেও আরও অর্থবহ করে তোলে। ড. ওয়ান আজিজাহ নিজেকে একজন জাতীয় রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন; তিনি নির্বাহী দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং সরাসরি রাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন। অন্যদিকে, জোবাইদা রহমান মূলত নেপথ্যের একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবেই থাকছেন। একজন বেছে নিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের পথ, অন্যজন হয়ে উঠেছেন নীরব অথচ দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীক। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার কূটনৈতিক যোগাযোগ এই দুই নারীর সমান্তরাল জীবনযাত্রাকে নতুন এক প্রতীকী তাৎপর্য দিয়েছে। ২২ জুন পুত্রজায়ার পারদানা পুত্রা ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানানোর সময় ডা. জোবাইদা রহমান তাঁর স্বামীর পাশে উপস্থিত ছিলেন, আর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম অতিথি প্রতিনিধিদলকে স্বাগত জানান। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইলও, যিনি আন্তরিকভাবে ড. জোবাইদা রহমানকে অভ্যর্থনা জানান। বিশেষ করে পুত্রজায়া হ্রদে নৌভ্রমণের সময় দুই চিকিৎসকের একসঙ্গে থাকা ছবিতে এবং নৈশভোজ পরবর্তী ঘরোয়া আড্ডায়, কেবল একটি কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং দুই মুসলিম নারীর জীবনের এক অসাধারণ ঐতিহাসিক মিল প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁদের জীবন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিগত আত্মত্যাগ এবং পরিবারের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের এক অনন্য সাক্ষ্য বহন করে।

এই সাক্ষাতের প্রতীকী গুরুত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রোটোকলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন দুই ব্যক্তিগত ইতিহাসের মিলন, যার মূল ভিত্তি রাজনৈতিক পদমর্যাদা নয়, বরং অসাধারণ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও অধ্যবসায়। স্বামীদের পাশে দাঁড়িয়ে এই দুই চিকিৎসক আমাদের মনে করিয়ে দেন যে গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত বাস্তবতা হলোÑ রাজনৈতিক আন্দোলনের স্থায়িত্ব শুধু জননেতাদের ওপর নির্ভর করে না; বরং তাঁদের পরিবারের সেই সদস্যদের ওপরও নির্ভর করে, যারা বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ এবং ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করে আন্দোলনের ভিত্তিকে অটুট রাখেন। তাই পুত্রজায়ায় চারজনকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা সেই দৃশ্যকে গণতান্ত্রিক অধ্যবসায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার এক জীবন্ত প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।

তাঁদের জীবন রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের একটি চিরন্তন সত্যকেও পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করেÑ কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক আন্দোলন কেবল ক্যারিশমাটিক নেতাদের দ্বারা নয়; বরং পারস্পরিক আস্থা, আনুগত্য এবং আত্মত্যাগের সামাজিক বন্ধনের মাধ্যমেও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইতিহাসে যেসব নেতার নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে, তাঁদের অনেকের পেছনেই রয়েছেন এমন জীবনসঙ্গীরা, যাঁদের মানসিক শ্রম, বিচক্ষণতা এবং অবিচল সমর্থন আনুষ্ঠানিক ইতিহাসে খুব কমই স্থান পায়। ড. ওয়ান আজিজাহ এবং ড. জোবাইদা রহমান আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে রাজনৈতিক আন্দোলনের দীর্ঘস্থায়িত্ব প্রায়শই এই নীরব অথচ গভীর নেতৃত্বের ওপরই নির্ভরশীল।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া যখন সমসাময়িক নেতৃত্বের অধীনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও গভীর করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই দুই বিশিষ্ট মুসলিম চিকিৎসকের জীবন জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে এক সার্বজনীন শিক্ষা প্রদান করে। তাঁরা দেখিয়েছেন, প্রকৃত দৃঢ়তা কেবল প্রতিকূলতা সহ্য করার ক্ষমতা নয়; বরং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যেও মর্যাদা, আদর্শ এবং আশাকে অটুট রাখার সামর্থ্য। তাঁদের জীবন আমাদের শেখায় যে ইতিহাস শুধু তাঁদের দ্বারাই নির্মিত হয় না, যারা রাজনৈতিক মঞ্চের কেন্দ্রে অবস্থান করেন; বরং তাঁদের দ্বারাও নির্মিত হয়, যাঁদের নীরব শক্তি সেই মঞ্চকে টিকিয়ে রাখে। সেই অর্থে, ড. ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল এবং ডা. জোবাইদা রহমান একই চিরন্তন সত্যের দুটি পরিপূরক রূপ। ঈমান, পেশাগত সততা এবং অবিচল অঙ্গীকার এমন এক শক্তি, যা রাজনৈতিক ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক স্থিতিস্থাপকতার ওপর স্থায়ী ও গভীর ছাপ ফেলতে পারে।


লেখক: কাউসার মুমিন (কলাম লেখক ও যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের লেজিসলেটিভ পলিসি ফেলো)

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা