সহিদুল আলম স্বপন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আজকের বিশ্ব আর একরৈখিক ব্যবস্থার মধ্যে নেই, যা ১৯৯১ সালে সোভিয়েত পতনের পর মার্কিন একাধিপত্যের ছায়ায় গড়ে উঠেছিল।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন শুধু বাণিজ্য বিরোধের গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তি আধিপত্য, সরবরাহ শৃঙ্খলের নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শাসনকাঠামোর লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলো ব্রিকস সম্প্রসারণ, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ এবং ডি-ডলারাইজেশনের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব হারাচ্ছে। এই বিভক্ত বিশ্বে যে সম্পদটির মূল্য সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, তার নাম কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনÑ অর্থাৎ কোনো একটি মহাশক্তির অধীনস্থ না হয়ে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে একই সাথে সম্পর্ক রক্ষার সক্ষমতা। ভারত দশকের পর দশক ধরে এই শিল্পের চর্চা করেছে। ভিয়েতনাম এটিকে অসাধারণ দক্ষতায় আয়ত্ত করেছে। উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, বিশেষত সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব, একে রাষ্ট্রশিল্পের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি সংকুচিত কৌশলগত অবস্থানে। ভারতের ভৌগোলিক আধিপত্য, চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক উপস্থিতি এবং পশ্চিমের বাণিজ্য সুবিধা ও উন্নয়ন সহায়তার শর্তাধীনতা এই তিনটি শক্তি মিলে একটি কৌশলগত ত্রিভুজ তৈরি করেছে, যার মধ্যে ঢাকা বহুকাল ধরে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায় আটকে রয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ৪,১৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত, অভিন্ন নদীর উজানের নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রানজিট নির্ভরতা এই সম্পর্ককে কাঠামোগতভাবে অসম করে রেখেছে। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রধান প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী হলেও শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে যে এই নির্ভরতার কী মূল্য চোকাতে হতে পারে। আর পশ্চিমা বিশ্ব বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির বাজার প্রবেশাধিকারকে শাসনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তুরস্কের সঙ্গে একটি মজবুত অংশীদারত্ব এই ত্রিভুজকে একটি জটিলতর এবং বাংলাদেশের জন্য অধিকতর অনুকূল জ্যামিতিক কাঠামোতে রূপান্তরিত করার সুযোগ দেয়। এটি শুধু একটি নতুন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়Ñ এটি বাংলাদেশের কৌশলগত পরিবেশের একটি কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস।
এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের একটি উপেক্ষিত কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের কথা না বললে বিশ্লেষণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ২০১৬ সালের মে মাসে শেখ হাসিনার সরকার যখন জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসি দেয়, তখন তুরস্ক এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকা থেকে তার রাষ্ট্রদূত দেভরিম ওজতুর্ককে আঙ্কারায় ফিরিয়ে নেয়। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ব্যক্তিগতভাবে এই ফাঁসির নিন্দা করেন। এই ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এক গভীর টানাপড়েনের জন্ম দেয়। তবে পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে যখন ২০১৬ সালেই তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ সেই অভ্যুত্থানের নিন্দা করে এরদোয়ান সরকারের পাশে দাঁড়ায়। এই সংকটকালীন সংহতি দুই দেশের সম্পর্কে একটি নতুন উষ্ণতার সূচনা করে এবং আঙ্কারা ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করে। এই ঘটনাক্রম একটি গভীর সত্যকে উন্মোচন করে : বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক কখনও নিছক আনুষ্ঠানিক কূটনীতির গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না। এতে রয়েছে আদর্শিক সংবেদনশীলতা, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং পারস্পরিক রাজনৈতিক স্বার্থের এক জটিল বুনন।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের সামনে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা কেবল বাণিজ্য পরিসংখ্যানের হিসাব নয়, এটি একটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, যা নিঃসন্দেহে একটি উন্নয়ন অর্জন একই সাথে সেই অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধাগুলো ক্রমশ বিলুপ্ত করে দেবে, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের রপ্তানি সাফল্য দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ প্রকল্পের সুবিধা ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসবে। ইথিওপিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনামসহ স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন কেন্দ্রগুলো তৈরি পোশাক বাজারে প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন বাজার, নতুন বিনিয়োগ উৎস এবং নতুন সরবরাহ শৃঙ্খলের সন্ধান করা নীতিগত পছন্দের বিষয় নয়Ñ এটি অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা। তুরস্কের ৮৫ মিলিয়ন ভোক্তার বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও মধ্য এশিয়ায় বিস্তৃত তার বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের জন্য এমন বাজারে প্রবেশের পথ খুলে দিতে পারে, যেখানে স্বাধীনভাবে প্রবেশ করতে হলে অসম্ভব ব্যয়বহুল কৌশল নিতে হতো। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো বিনিয়োগের শর্ত যে বিনিয়োগ প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় মূল্য সংযোজনকে কেন্দ্রে রাখে, তা বাংলাদেশের শিল্প উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে; আর যে বিনিয়োগ কেবল সস্তা শ্রম ব্যবহার করতে আসে, তা পুরনো নির্ভরতার চক্রকেই পুনরুৎপাদন করবে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রশ্নটি হয়তো সবচেয়ে রূপান্তরকারী, কিন্তু একই সাথে সবচেয়ে সংবেদনশীল। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প গত এক দশকে এমন একটি বিকাশ ঘটিয়েছে, যা বিশ বছর আগে অকল্পনীয় মনে হতো। বায়রাক্তার টিবি-২ ড্রোনের রণক্ষেত্রে প্রমাণিত সক্ষমতা দেখিয়ে দিয়েছে যে তুলনামূলকভাবে কম খরচে সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন করা সম্ভব। বাংলাদেশের ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ আধুনিকায়ন পরিকল্পনার প্রকৃত কৌশলগত মূল্য নির্দিষ্ট সরঞ্জাম সংগ্রহে নয়, বরং এই প্রশ্নে যে বাংলাদেশ তার সরবরাহকারীদের সঙ্গে কোন ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলবে। ঐতিহ্যগত মডেলে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনে এবং যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডের জন্য সরবরাহকারীর ওপর চিরস্থায়ী নির্ভরতায় আটকে যায়। তুরস্কের সঙ্গে একটি সুচিন্তিত অংশীদারত্ব যৌথ উৎপাদন, লাইসেন্সড ম্যানুফ্যাকচারিং, সহ-উন্নয়ন বাংলাদেশকে সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারত ও চীনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া অনুমানযোগ্য এবং তা কূটনৈতিক পরিকল্পনায় আগে থেকেই বিবেচনায় রাখা দরকার।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের সবচেয়ে তীব্র এবং সবচেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। প্রায় দশ লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার ভার বহন করতে গিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক অবকাঠামো, পরিবেশ এবং আর্থিক সক্ষমতা চরম চাপে পড়েছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ চীনের ভেটোর কারণে কার্যত অচল। পশ্চিমা সরকারগুলো নিন্দার বাণী দিয়েছে, কিন্তু মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। এই কূটনৈতিক শূন্যতায় তুরস্কের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হয়তো কূটনৈতিক নথিতে নয়, বরং মানবসম্পদে। তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করা হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে কূটনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা, গবেষক এবং সুশীল সমাজের কর্মী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্কের মানবিক ভিত্তি গড়ে তুলবেন। শীতল যুদ্ধের যুগে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করা ভারতীয় শিক্ষার্থীরা যেভাবে পরবর্তী দশকে ভারত-মার্কিন প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি করেছিলেন, বাংলাদেশও সেই পথ অনুসরণ করতে পারে।
বহুমেরু বিশ্বে যে রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকবে এবং এগিয়ে যাবে, তারা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকে না। তারা নিজেদের কৌশলগত মূল্য স্পষ্টভাবে বোঝে এবং সেই ব্যবস্থাকে নিজের অনুকূলে গড়ে তোলার সাহস রাখে। বাংলাদেশ দশকের পর দশকের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন অর্জনের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিনেতা হিসেবে নিজেকে ভাবার অধিকার অর্জন করেছে। তুরস্কের সঙ্গে এই অংশীদারত্ব কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নয়Ñ এটি একুশ শতকে বাংলাদেশ কী হতে পারে এবং বিশ্বমঞ্চে কী ভূমিকা পালন করতে পারে, সেই সম্পর্কে একটি আরও উচ্চাভিলাষী দৃষ্টিভঙ্গির আমন্ত্রণ। দরজা খোলা আছে। প্রশ্ন হলো, ঢাকা কি সেই কৌশলগত দূরদর্শিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংকল্প নিয়ে সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন (সুইজারল্যান্ড প্রবাসী কলাম লেখক ও কবি)